অভিশপ্ত যাত্রা ও শেষ অঙ্কের অভিনেতা

গ্রাম বাংলার মাটির গন্ধের সাথে মিশে আছে ‘যাত্রা’ বা লোকনাট্যের এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। একসময় হ্যাজাক লাইটের আলোয়, হাজারো দর্শকের করতালিতে মুখরিত হতো গ্রামের যাত্রামঞ্চ। কিন্তু কালের নিয়মে অনেক দলই হারিয়ে গেছে, পড়ে আছে শুধু তাদের স্মৃতি আর পরিত্যক্ত সাজঘর। আমাদের ভৌতিক সিরিজের ২১তম পর্বে আমরা প্রবেশ করব এমনই এক নিষিদ্ধ জগতে। আপনারা অভিশপ্ত পালকির গল্পে দেখেছেন জড়বস্তুর প্রাণ পাওয়ার ঘটনা, কিংবা জীবন্ত পুতুলের সেই হাড়হিম করা কাহিনী। কিন্তু যখন কোনো মৃত অভিনেতা তার অসমাপ্ত সংলাপ শেষ করতে কবর থেকে উঠে আসে, তখন কি পরিস্থিতি হয়? অয়ন, এক তরুণ নাট্য পরিচালক, পুরনো স্ক্রিপ্টের খোঁজে গিয়েছিল রাধানগরের পরিত্যক্ত রাজবাড়ির নাটমঞ্চে। সে জানত না, সেখানে প্রতি অমাবস্যায় বসে এক অদৃশ্য আসর, যেখানে দর্শকদের আসনে বসে থাকে শুধু অন্ধকার।
১. ধুলোমাখা সাজঘর ও রক্তমুকুট
রাধানগরের রাজবাড়ি আজ ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু বাড়ির পেছনের নাটমঞ্চটি আজও অদ্ভুতভাবে অক্ষত। স্থানীয়রা বলে, পঞ্চাশ বছর আগে এখানে ‘রক্তমুকুট’ নামে এক ঐতিহাসিক যাত্রাপালা চলার সময় এক ভয়ানক দুর্ঘটনা ঘটেছিল। প্রধান অভিনেতা, যিনি সেনাপতির চরিত্রে অভিনয় করছিলেন, মঞ্চেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কিন্তু তার মৃত্যুর ধরণ ছিল অস্বাভাবিক—মনে হয়েছিল কেউ অদৃশ্য তলোয়ার দিয়ে তার বুকে আঘাত করেছে। সেই থেকে এই মঞ্চ পরিত্যক্ত।
অয়ন যখন সাজঘরে ঢুকল, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। ঘরটিতে ঢুকতেই নাকে এল উগ্র আলতা আর সস্তা পাউডারের গন্ধ। যেন কিছুক্ষণ আগেই কেউ এখানে মেকআপ নিচ্ছিল। ঘরের এক কোণে পড়ে আছে একটা ভাঙা আয়না। অয়ন এগিয়ে গিয়ে দেখল, আয়নার সামনে রাখা একটি জরাজীর্ণ পাণ্ডুলিপি। মলাটের ওপর লাল কালিতে লেখা— ‘রক্তমুকুট: শেষ অঙ্ক’। অয়ন পাণ্ডুলিপিটা হাতে নিতেই অনুভব করল কাগজটা ভিজে ভিজে। ভালো করে দেখল, ওটা জল নয়, ওটা তাজা রক্তের দাগ। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল বাঁশবাগানের সেই লাল শাড়ির ক্ষেত্রে।
২. মধ্যরাতের কনসার্ট
রাত বাড়ার সাথে সাথে অয়নের ফেরার পথ বন্ধ হয়ে গেল। প্রবল ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাধ্য হয়ে সে সাজঘরেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিল। রাত যখন বারোটা, হঠাৎ বাইরে থেকে ভেসে এল এক অদ্ভুত শব্দ। ক্ল্যারিওনেট আর ট্রাম্পেটের আওয়াজ। যাত্রাপালার শুরুতে যেমন ‘কনসার্ট’ বাজে, ঠিক তেমনি। সুরটা চড়া, কিন্তু বড়ই করুণ।
অয়ন জানলা দিয়ে উঁকি দিল। তার চোখ কপালে উঠল। অন্ধকার নাটমঞ্চ এখন শত শত হ্যাজাক লাইটের আলোয় ঝলমল করছে। দর্শকাসন কানায় কানায় পূর্ণ। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, দর্শকদের কারো কোনো শব্দ নেই। তারা মূর্তির মতো স্থির হয়ে বসে আছে। আর তাদের সবার গায়ের রং ফ্যাকাশে সাদা, চোখগুলো গর্তের মতো অন্ধকার। অয়নের মনে পড়ে গেল কুয়াশাঘেরা স্টেশনের সেই মৃত যাত্রীদের কথা। এরাও কি তবে পরলৌকিক দর্শক?
৩. বিভীষিকাময় শেষ দৃশ্য
মঞ্চে প্রবেশ করলেন প্রধান অভিনেতা। তার পরনে সেনাপতির রাজকীয় পোশাক, মাথায় বিশাল পাগড়ি। কিন্তু তার মুখটা অদ্ভুত। তিনি এমনভাবে মেকআপ করেছেন যে মনে হচ্ছে তার মুখের চামড়া কেউ ছিলে নিয়েছে। লাল টকটকে মাংসপেশী দেখা যাচ্ছে।
অভিনেতা চিৎকার করে সংলাপ বলতে শুরু করলেন, “আমি ফিরে এসেছি… আমার অসমাপ্ত পাঠ শেষ করতে!” তার গলার স্বরে পুরো রাজবাড়ি কেঁপে উঠল। সেই স্বর কোনো মানুষের নয়, যেন পাতাল থেকে উঠে আসা কোনো দানবের গর্জন। নাটকের দৃশ্য অনুযায়ী, এখন সেনাপতির বুকে তলোয়ার বিঁধবে। অয়ন দেখল, শূন্য থেকেই একটা অদৃশ্য তলোয়ার এসে অভিনেতার বুকে বিঁধল। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। কিন্তু অভিনেতা পড়ে গেলেন না। তিনি অট্টহাসি হাসতে হাসতে সরাসরি অয়নের দিকে আঙুল তুললেন।
৪. আয়নার ভেতরের প্রতিবিম্ব
অয়ন ভয়ে পিছিয়ে এল। সে সাজঘরের দরজা খোলার চেষ্টা করল, কিন্তু দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। হঠাৎ তার নজর পড়ল সেই ভাঙা আয়নাটার দিকে। আয়নায় অয়ন নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল না। তার বদলে সে দেখল, ওই বীভৎস অভিনেতা তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
অভিনেতা অয়নের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “আমার মেকআপটা নষ্ট হয়ে গেছে ভাই… তোর চামড়াটা দিবি? ওটা দিয়ে নতুন মুখ বানাব।” অয়ন অনুভব করল একজোড়া ঠান্ডা, চটচটে হাত তার গলা টিপে ধরছে। ঘরের বাতাসে তখন পচা রক্ত আর পুরনো ফুলের তীব্র গন্ধ। অয়ন জ্ঞান হারানোর আগে শেষবারের মতো শুনল দর্শকদের তুমুল করতালির শব্দ।
পরদিন সকালে স্থানীয়রা অয়নকে রাজবাড়ির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে। তার জ্ঞান ফেরার পর সে কাউকেই চিনতে পারছিল না, শুধু বিড়বিড় করে বলছিল, “রক্তমুকুট… রক্তমুকুট…”।
সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, ডাক্তাররা পরীক্ষার পর জানালেন, অয়নের মুখের চামড়ায় এমন কিছু রাসায়নিকের খোঁজ পাওয়া গেছে, যা পঞ্চাশ বছর আগে যাত্রার মেকআপে ব্যবহৃত হতো এবং যা এখন নিষিদ্ধ। আর অয়নের ব্যাগে পাওয়া সেই পুরনো পাণ্ডুলিপিটিতে একটি নতুন লাইন যোগ হয়েছে— “একুশতম রজনীতে নতুন সেনাপতির অভিষেক হলো।” তবে কি অয়ন বেঁচে ফিরলেও তার আত্মা এখন ওই নাট্যদলের অংশ হয়ে গেছে?