অভিশপ্ত পালকি ও বেহারার গান

আপনি হয়তো আমাদের আগের গল্পে কুয়াশাঘেরা স্টেশনের ভৌতিক ট্রেনের কথা পড়েছেন, যা যাত্রীদের এক অজানার পথে নিয়ে যায়। কিন্তু গ্রামের ধুলোমাখা রাস্তায় পড়ে থাকা পুরনো পালকি কি ট্রেনের চেয়ে কম ভয়ের? রসুলপুরের ভাঙা জমিদার বাড়ির এক কোণে পড়ে ছিল একটি লাল সালু মোড়ানো পালকি। অনির্বাণ, শহুরে শৌখিন ছেলে, বন্ধুদের সাথে বাজি ধরেছিল যে সে ওই পালকিতে এক রাত কাটাবে। সে জানত না, কিছু বাহন আজও তাদের পুরনো মালিকের জন্য অপেক্ষা করে।
১. ধুলোমাখা লাল সালু
জমিদার বাড়িটা দেখলেই গা ছমছম করে। ছাদের কড়ি-বরগা ভেঙে ঝুলে আছে, দেওয়ালের পলেস্তারা খসে ইটের পাঁজর বেরিয়ে পড়েছে। ঠিক যেন কালিপুরের সেই অভিশপ্ত বাড়ির মতো। বাড়ির নাচমহলের এক কোণে পালকিটা রাখা। এককালে হয়তো এর জৌলুস ছিল, কিন্তু এখন মাকড়সার জাল আর ধুলোয় সেটা ঢাকা পড়ে গেছে।
বন্ধুরা অনির্বাণকে সেখানে রেখে চলে যাওয়ার সময় স্থানীয় চৌকিদার বারণ করেছিল। সে বলেছিল, “দাদাবাবু, ওটা ‘বউরাণীর পালকি’। উনি মারা যাওয়ার পর আর কেউ ওটায় চড়েনি। অমাবস্যার রাতে পালকির কাছে যাবেন না।” অনির্বাণ হেসে বলেছিল, “আমি তো আর কাকতাড়ুয়ার ভয়ে ভীতু নই যে পালিয়ে যাব!” রাত বারোটা পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। অনির্বাণ পালকির ভেতরে বসে মোবাইলে গেম খেলছিল।
২. ‘হুম না, হুম না’ ধ্বনি
হঠাৎ পালকির দরজাটা বাতাসের ঝাপটায় বন্ধ হয়ে গেল। অনির্বাণ খোলার চেষ্টা করল, কিন্তু পাল্লাটা যেন বাইরে থেকে কেউ চেপে ধরেছে। ঠিক তখনই তার কানে এল একটা ছন্দবদ্ধ আওয়াজ— ‘হুম না… হুম না… হুম না…’। পালকি কাঁধে নিয়ে বেহারারা যখন হাঁটে, তখন তারা এই বিশেষ ছন্দে আওয়াজ করে।
অনির্বাণ ভাবল বন্ধুরা হয়তো ভয় দেখাচ্ছে। কিন্তু পালকিটা হঠাৎ দুলে উঠল। মনে হলো চারজন মানুষ সেটাকে মাটি থেকে কাঁধে তুলে নিল। অনির্বাণের মোবাইলটা হাত থেকে পড়ে গেল। পালকিটা চলতে শুরু করেছে! বন্ধ জানলার খড়খড়ি দিয়ে সে দেখল, পালকিটা জমিদার বাড়ির ভাঙা তোরণ পেরিয়ে গ্রামের মেঠো রাস্তা দিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু তাকে বহন করছে কারা?
৩. কঙ্কালসার কাঁধ
ভয়ে অনির্বাণ চিৎকার করে উঠল, “কে তোরা? আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস?” কিন্তু কোনো উত্তর এল না, শুধু সেই একঘেয়ে যান্ত্রিক আওয়াজ— ‘হুম না… হুম না…’। পালকির গতির সাথে সাথে পাল্লাটা একটু ফাঁক হয়ে গেল। সেই ফাঁক দিয়ে অনির্বাণ যা দেখল, তাতে তার হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার উপক্রম হলো।
যারা পালকি বইছে, তাদের শরীরে কোনো চামড়া নেই। চাঁদের আলোয় তাদের পাঁজরের হাড়গুলো চকচক করছে। তাদের পরনে ছেঁড়া ধুতি, আর কাঁধের হাড়গুলো পালকির ডাণ্ডার ঘষায় ক্ষয়ে গেছে। পেছনের বেহারাটা হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে অনির্বাণের দিকে তাকাল। তার চোখের কোটরে নীলচে আগুন জ্বলছে। সে হিসহিসিয়ে বলল, “বউরাণী অপেক্ষা করছেন শ্মশানঘাটে… আমরা দেরি করতে পারব না।”
পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা অনির্বাণকে গ্রামের শ্মশানঘাটের পাশে একটি পুরনো বটগাছের নিচে অজ্ঞান অবস্থায় খুঁজে পায়। তার সারা গায়ে ছিল তীব্র জ্বর। জ্ঞান ফেরার পর থেকে সে আর পালকি শব্দটা সহ্য করতে পারে না।
সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, জমিদার বাড়ির সেই পালকিটা যেখানে ছিল, সেখানেই আছে। শুধু পালকির দরজার হাতলে অনির্বাণের হাতের ঘড়িটা ঝুলে থাকতে দেখা গিয়েছিল, যেটা সে কাল রাতে হারিয়েছিল। তবে কি পালকিটা সত্যিই বেরিয়েছিল, নাকি অনির্বাণের আত্মাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল অন্য কোনো জগতে?