কুয়াশাঘেরা ইস্টিশন ও অদৃশ্য যাত্রী

আপনি যদি আমাদের আগের গল্প নিশুতি রাতের কান্না পড়ে থাকেন, তবে জানেন গ্রামের অন্ধকারে কেমন আদিম ভয় লুকিয়ে থাকে। আজকের গল্পটি একটি ছোট রেল স্টেশনকে ঘিরে। রজত, পেশায় একজন রিপ্রেজেন্টেটিভ, শেষ ট্রেনটি ধরার জন্য হালুমপাহাড় স্টেশনে অপেক্ষা করছিল। ঘড়িতে রাত বারোটা। স্টেশনে রজত আর একজন ঝিমন্ত স্টেশন মাস্টার ছাড়া জনমানব নেই। কিন্তু রজত জানত না, এই স্টেশনে রাত বারোটার পর যে ট্রেনটি আসে, তার কোনো অস্তিত্ব রেলওয়ের টাইমটেবিলে নেই।
১. নিষিদ্ধ সময়ের অপেক্ষা
শীতের রাত। ঘন কুয়াশায় দশ হাত দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছে না। প্ল্যাটফর্মের টিমটিমে হলুদ আলোগুলো কেমন যেন ভৌতিক লাগছে। রজত বেঞ্চে বসে ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে অপেক্ষা করছে। তার মনে পড়ল গত সপ্তাহের কথা, যখন সে অভিশপ্ত কাকতাড়ুয়া নিয়ে গ্রামের লোকের মুখে অদ্ভুত সব কথা শুনেছিল। গ্রামের সব জায়গাতেই কি এমন অভিশাপ ছড়িয়ে আছে?
হঠাৎ স্টেশন মাস্টারের কেবিনের দরজা খুলে এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন। তার হাতে একটা পুরনো আমলের লণ্ঠন। তিনি রজতের কাছে এসে খসখসে গলায় বললেন, “বাবা, আজ আর ট্রেন আসবে না। তুমি ওয়েটিং রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ো।” রজত অবাক হয়ে বলল, “কেন দাদু? অ্যাপে তো দেখাচ্ছে রাত ১টায় ডাউন কাঞ্চনজঙ্ঘা আছে।” বৃদ্ধ অদ্ভুত হাসলেন, “ওটা কাঞ্চনজঙ্ঘা নয়। ওটা অন্য ট্রেন। ওই ট্রেনে যারা ওঠে, তারা আর ফেরে না।”
২. সিগন্যাল ও সাইরেন
বৃদ্ধ চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। নিস্তব্ধ রাত চিরে স্টেশনের সিগন্যালটা হঠাৎ লাল থেকে সবুজ হয়ে গেল। দূরে শোনা গেল ট্রেনের হুইসেল। কিন্তু সেই আওয়াজটা সাধারণ ডিজেল ইঞ্জিনের মতো নয়, বরং পুরনো আমলের স্টিম ইঞ্জিনের ‘কু-ঝিক-ঝিক’ শব্দের মতো।
কুয়াশা ফুঁড়ে ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াল। অদ্ভুত দর্শন ট্রেন। বগিগুলো সব কাঠের তৈরি, জানলাগুলো ভাঙা। ট্রেনের ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছিল না, একদম পিনপতন নিস্তব্ধতা। রজত জানলার কাছে এগিয়ে গেল। ভেতরে আবছা আলোয় সে দেখল, বগি ভর্তি যাত্রী বসে আছে। কিন্তু কেউ নড়ছে না, কেউ কথা বলছে না। সবার দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ। তাদের মুখগুলো ফ্যাকাসে, যেন রক্তশূন্য।
৩. টিকিট চেকারের ডাক
রজত সম্মোহিতের মতো ট্রেনের দরজার হাতল ধরল। ঠিক তখনই তার কাঁধে ঠান্ডা হাতের স্পর্শ। সে চমকে পেছনে তাকাল। কেউ নেই! কিন্তু কানে ভেসে এল এক ফিসফিসে আওয়াজ, “টিকিট… টিকিট দেখান।”
রজত দেখল ট্রেনের গেটে এক টিটিই (TTE) দাঁড়িয়ে। তার পরনে ব্রিটিশ আমলের কালো কোট। রজত যখন তার মুখের দিকে তাকাল, ভয়ে তার গলা শুকিয়ে গেল। লোকটার গলার নিচ থেকে ধড় আছে, কিন্তু মাথার অংশটা নেই! কাটা গলা দিয়ে গলগল করে কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। রজত চিৎকার করে পিছিয়ে এল। তখনই ট্রেনটা চলতে শুরু করল। আর জানলা দিয়ে ওই ফ্যাকাসে যাত্রীরা সবাই একসাথে রজতের দিকে তাকাল। তাদের সবার চোখগুলো গর্তের মতো অন্ধকার।
পরদিন সকালে স্থানীয়রা রজতকে রেললাইনের ধারে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করে। জ্ঞান ফেরার পর রজত যখন সেই বৃদ্ধ স্টেশন মাস্টারের কথা বলল, গ্রামবাসীরা অবাক হয়ে গেল। তারা জানাল, ওই স্টেশনে গত দশ বছর ধরে কোনো স্টেশন মাস্টার নেই। শেষ মাস্টারবাবু এক রাতে ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ে মারা গিয়েছিলেন—ঠিক রাত ১টা ১৫ মিনিটে।
রজত আজও ঘুমের মধ্যে ট্রেনের হুইসেল শুনতে পায়। আর সে বুঝতে পারে, সেই রাতে সে যদি ওই ট্রেনে পা দিত, তবে আজকের সকালটা তার জীবনে আর আসত না।