অমানিশার নিশির ডাক ও তৃতীয় বারের সংকেত | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী

অমানিশার নিশির ডাক ও তৃতীয় বারের সংকেত | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ১৯
গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ১৯

অমানিশার নিশির ডাক ও তৃতীয় বারের সংকেত

লিখেছেন: সঙ্গীত দত্ত | স্থান: হিজলতলী গ্রাম, সুন্দরবন সংলগ্ন
নিশি রাতের ছায়া - কাল্পনিক চিত্র

গ্রাম বাংলার প্রতিটি প্রাচীন গল্পের মোড়ে লুকিয়ে আছে এক অজানা আতঙ্ক। আমাদের এই সিরিজের দীর্ঘ পথচলায় আপনারা বাঁশবাগানের সেই রক্তমাখা শাড়ি দেখেছেন, অনুভব করেছেন শ্মশানের জ্বলন্ত চিতার তাপ। কিন্তু কিছু কিছু ভয় দৃশ্যমান নয়, তা মানসিক। ‘নিশি’—বাংলার লোককথার এক অদৃশ্য শিকারি। গ্রামের মুরুব্বিরা বলেন, নিশি কখনো সামনে আসে না, সে শুধু ডাকে। আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির গলার স্বর নকল করে সে আপনাকে গভীর রাতে ঘরের বাইরে ডেকে নিয়ে যায়। আর যারা সেই ডাকে সাড়া দিয়ে একবার চৌকাঠ পেরোয়, তারা আর কখনো ফিরে আসে না। পলাশ, শহরের যুক্তিবাদী ছেলে, গ্রামের বাড়িতে একলা রাতে সেই ডাক শুনেছিল। সে জানত না, দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সত্তাটি তার চেনা মানুষ নয়, বরং এক আদিম অন্ধকার।

১. ঝড়ের রাতে একলা বাড়ি

হিজলতলী গ্রামের শেষ প্রান্তে পলাশদের পুরনো দোতলা বাড়ি। বাড়ির চারপাশে বিশাল আম-কাঁঠালের বাগান, আর তার পরেই শুরু হয়েছে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ জঙ্গল। পলাশের বাবা-মা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গেছেন। পলাশকে রেখে গেছেন বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য।

অমাবস্যার রাত। সন্ধ্যা থেকেই আকাশ কালো করে মেঘ জমেছিল, রাত বাড়তেই শুরু হলো তুমুল ঝড়। জানলার শার্সিগুলো ঝনঝন করে কাঁপছে। লোডশেডিং হওয়ায় পুরো গ্রাম অন্ধকারে ডুবে গেছে। পলাশ হ্যারিকেন জ্বেলে ড্রইংরুমে বসে বই পড়ছিল। ঘড়িতে তখন রাত দেড়টা। চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু বৃষ্টির শব্দ আর মাঝে মাঝে বাজের কড়কড় আওয়াজ। এমন সময়, বাইরের সদর দরজায় একটা শব্দ হলো— ‘ঠক… ঠক… ঠক…’। খুব মৃদু, কিন্তু স্পষ্ট।

পলাশ কান খাড়া করল। এত রাতে কে আসবে? সে ভাবল হয়তো বাতাসের শব্দ। কিন্তু তখনই একটা পরিচিত গলার আওয়াজ ভেসে এল, “পলাশ… ও পলাশ… দরজাটা খোল। আমি ভিজে যাচ্ছি রে!” পলাশ চমকে উঠল। এ তো তার ছোটকাকা সুদীপ্তর গলা! কিন্তু কাকা তো শিলিগুড়িতে থাকেন, হঠাৎ এই দুর্যোগে এখানে কেন আসবেন?

২. মায়ার ফাঁদ ও দ্বিধা

পলাশ হ্যারিকেনটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। মন বলল, “কাকা হয়তো সারপ্রাইজ দিতে এসেছেন।” সে দরজার খিল খুলতে হাত বাড়াল। ঠিক তখনই তার কানে বাজল ঠাকুমার সেই পুরনো সাবধানবাণী— “নিশি রাতে চেনা গলার ডাক শুনলে ভুলেও দরজা খুলবি না। অপেক্ষা করবি। মানুষ হলে বারবার ডাকবে, বিরক্ত হবে। কিন্তু নিশি বা অপদেবতা হলে তারা দুবারের বেশি ডাকতে পারে না।”

পলাশ থমকে দাঁড়াল। বাইরে থেকে আবার সেই করুণ আর্তি ভেসে এল, “কী রে পলাশ? দরজাটা খুলছিস না কেন? আমি শীতে জমে যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি খোল!” গলাটা হুবহু কাকার, এমনকি কাকা যেভাবে ‘পলাশ’ বলে ডাকেন, সেই টানটাও অবিকল এক। পলাশের যুক্তিবাদী মন বলল, “ধুর! এসব কুসংস্কার। কাকা বাইরে কষ্ট পাচ্ছেন।” সে আবার হাত বাড়াল। কিন্তু তার বুকের ভেতরটা কেন জানি দুরুদুরু করে উঠল। মনে পড়ল সেই মাঝির গল্পের কথা, যেখানে পরিচিত পরিবেশই হয়ে উঠেছিল মরণফাঁদ।

৩. তৃতীয় বারের অপেক্ষা

পলাশ দরজার খুব কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে বলল, “কাকা, তুমি শিলিগুড়ি থেকে কখন এলে? গাড়ি কোথায়?” কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, বাইরের লোকটা কোনো উত্তর দিল না। শুধু যান্ত্রিকভাবে আবার বলল, “দরজাটা খোল… খোল…”। কোনো যুক্তিসঙ্গত উত্তর নেই, শুধু খোলার অনুরোধ।

পলাশ ঘামতে শুরু করল। সে অপেক্ষা করতে লাগল তৃতীয় ডাকের জন্য। গ্রামের নিয়ম অনুযায়ী, মানুষ হলে সে এবার রেগে গিয়ে দরজায় জোরে ধাক্কা দেবে বা গালাগাল করবে। কিন্তু মিনিট দুয়েক কেটে গেল, বাইরে পিনপতন নিস্তব্ধতা। বৃষ্টির শব্দও যেন কমে গেছে।

৪. জানলার ফাঁকের বিভীষিকা

কৌতূহল সামলাতে না পেরে পলাশ পাশের জানলার একটা কপাট সামান্য ফাঁক করল। বাইরে হ্যারিকেনের আবছা আলো গিয়ে পড়ল বারান্দায়। যা দেখল, তাতে পলাশের পায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল।

বারান্দায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই। তার উচ্চতা মানুষের চেয়েও অন্তত দুই ফুট বেশি। তার শরীরটা অদ্ভুতভাবে বাঁকানো, যেন কোনো হাড় নেই। আর সবচেয়ে ভয়ানক হলো তার মুখটা। মুখটা অবিকল পলাশের কাকার মতো দেখতে, কিন্তু সেটা কোনো চামড়ার মুখ নয়—যেন কেউ কাঁচা মাংস দিয়ে একটা মুখোশ বানিয়ে ওই লম্বা প্রাণীটার মুখে পরিয়ে দিয়েছে। মুখোশের নিচ দিয়ে কালো লালা গড়িয়ে পড়ছে। প্রাণীটা দরজার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে, আর তার গলা দিয়ে সেই পরিচিত স্বরে শব্দ বের হচ্ছে, কিন্তু ঠোঁট নড়ছে না। পলাশ বুঝল, এটা কোনো মানুষ নয়, এটা সেই নিশি, যে আজ তার প্রাণ নিতে এসেছে।

পলাশ সেই রাতে আর দরজা খোলেনি। সারা রাত সে জানলার নিচে গুটিসুটি মেরে বসে ভগবানের নাম জপ করেছে। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে সেই ছায়া অদৃশ্য হয়ে যায়।

পরদিন সকালে পলাশ বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দেখে দরজার কাঠের ওপর বড় বড় নখের আঁচড়, যেন কোনো বন্য জন্তু সারা রাত ধরে ঢোকার চেষ্টা করেছে। আর বারান্দার কাদায় যে পায়ের ছাপ ছিল, তা কোনো মানুষের নয়—সেগুলো ছিল উল্টো দিকে ঘোরানো। দুপুরে কলকাতা থেকে ফোন এল। পলাশ জানতে পারল, তার ছোটকাকা গত রাতে শিলিগুড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। ঠিক রাত দেড়টায়। তবে কি মৃত্যুর পর কাকার আত্মাকে ভর করে নিশি এসেছিল পলাশকে সঙ্গে নিয়ে যেতে?

© ২০২৬ গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী সিরিজ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Scroll to Top