নিষিদ্ধ বাঁশবাগান ও রক্তমাখা শাড়ি

আপনি যদি আমাদের আগের পর্বে শ্মশানের নিভে যাওয়া চিতার ভয়ঙ্কর গল্পটি পড়ে থাকেন, তবে জানেন আগুন কীভাবে মানুষের রূপ নিতে পারে। কিংবা পরিত্যক্ত কুয়োর সেই শিকল বাঁধা আত্মার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? আজকের গল্পটি গ্রামের এক কুখ্যাত বাঁশবাগান নিয়ে। শিমুল, গ্রামের মেলা দেখে ফেরার পথে দেরি হয়ে যাওয়ায় শর্টকাট নিতে কদমতলা বাঁশঝাড়ের রাস্তা ধরেছিল। সে জানত না, বাঁশবাগানের মাথায় চাঁদ উঠলে সেখানে ‘পেত্নী’রা শাড়ি শুকাতে দেয়।
১. ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ ও নূপুর
বাঁশবাগানটা এতটাই ঘন যে দিনের বেলাতেও সেখানে আলো ঢোকে না। রাতে চাঁদের আলো বাঁশপাতার ফাঁক দিয়ে এসে মাটিতে অদ্ভুত ডোরাকাটা ছায়া তৈরি করেছে। শিমুল সাইকেল চালিয়ে আসছিল। হঠাৎ বাতাসের বেগ বেড়ে গেল। বাঁশগাছগুলো একে অপরের সাথে ঘষা খেয়ে এক বিচ্ছিরি ‘ক্যাঁচ… ক্যাঁচ…’ শব্দ করতে লাগল।
হঠাৎ শিমুলের কানে এল নূপুরের শব্দ। ছম ছম করে কেউ যেন সাইকেলের পাশ দিয়ে দৌড়ে গেল। শিমুল ব্রেক কষল। সে ভাবল এটা হয়তো মনের ভুল, যেমনটা ঘটেছিল ডাকবাংলোর সেই অভিশপ্ত রাতে অনিকের সাথে। কিন্তু না, শব্দটা সত্যি। আর বাতাসের সাথে ভেসে আসছে এক পচা ফুলের গন্ধ।
২. ঝুলন্ত লাল বেনারসি
শিমুল টর্চ জ্বেলে এদিক ওদিক দেখল। হঠাৎ তার টর্চের আলো গিয়ে পড়ল মাথার ওপর। দুটো বাঁশগাছ ধনুকের মতো বেঁকে আছে, আর সেই দুই বাঁশের মাঝখানে হাওয়ায় দুলছে একটা টকটকে লাল বেনারসি শাড়ি।
শাড়িটা দেখেই শিমুলের গা শিউরে উঠল। এত রাতে জঙ্গলের ভেতর নতুন শাড়ি এল কোত্থেকে? সে ভালো করে লক্ষ্য করল, শাড়িটা শুধু ঝুলছে না, শাড়িটা ভিজে আছে, আর সেখান থেকে ফোঁটা ফোঁটা লাল তরল নিচে পড়ছে। বৃষ্টির জল নয়, ওটা তাজা রক্ত। রক্তগুলো মাটিতে পড়ে এক অদ্ভুত আল্পনা তৈরি করছে।
৩. উল্টো পা ও খিলখিল হাসি
শিমুল সাইকেল ঘুরিয়ে পালাতে চাইল। ঠিক তখনই শাড়িটা উপর থেকে ধপ করে তার সাইকেলের সামনে পড়ল। শিমুল চমকে উঠল। শাড়িটার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে একটা হাত বেরিয়ে এল। হাতটা পোড়া কাঠের মতো কালো, কিন্তু নখগুলো ধারালো।
শাড়ির আড়াল থেকে এক নারীমূর্তি উঠে দাঁড়াল। তার মুখটা সুন্দর, কপালে বড় সিঁদুর টিপ। কিন্তু শিমুল যখন তার পায়ের দিকে তাকাল, ভয়ে তার চিৎকার আটকে গেল। মেয়েটির পা দুটো উল্টো দিকে ঘোরানো। সে শিমুলের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল, “বিয়ে বাড়িতে যাবি না? আমি যে সেজে বসে আছি!” সেই হাসির শব্দে বাঁশবাগানের সব পাখি একসাথে ডেকে উঠল।
পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা শিমুলকে বাঁশবাগানের ধারের ডোবায় অচৈতন্য অবস্থায় পায়। তার সাইকেলটা দুমড়ে মুচড়ে গেছে, যেন কোনো দানব সেটাকে পিষে দিয়েছে। শিমুলের জ্ঞান ফেরার পর সে শুধু একটাই কথা বলত— “লাল শাড়ি… উল্টো পা…”।
গ্রামের ওঝা জানালেন, বহু বছর আগে এক নববধূর লাশ ওই বাঁশবাগানে ফেলা হয়েছিল ডাকাতদের হাতে খুন হওয়ার পর। আজও অমাবস্যায় সে নতুন বর খোঁজে। শিমুলের কপালে আজও সেই রাতের আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট।