পরিত্যক্ত কুয়ো ও শিকল বাঁধা আত্মা | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী

পরিত্যক্ত কুয়ো ও শিকল বাঁধা আত্মা | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ৯
গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ৯

পরিত্যক্ত কুয়ো ও শিকল বাঁধা আত্মা

লিখেছেন: সঙ্গীত দত্ত | স্থান: পলাশপুর গ্রাম, বীরভূম
অভিশপ্ত কুয়ো - কাল্পনিক চিত্র

জলের নিচে লুকিয়ে থাকা রহস্য আমাদের সবসময় টানে। আপনারা ইতিমধ্যেই শ্যাওলা ধরা দিঘির সেই ভয়ঙ্কর হাতের কথা জেনেছেন। কিন্তু দিঘি উন্মুক্ত, আর কুয়ো? কুয়ো হলো অন্ধকারের এক গভীর সুড়ঙ্গ। পলাশপুর গ্রামের মাঝখানে লাল ইটের তৈরি একটি পুরনো কুয়ো আছে। গ্রামবাসীরা বলে, ওটা ‘খুনি কুয়ো’। বিমল, গ্রামের নতুন পোস্টমাস্টার, জলকষ্টের কারণে এক দুপুরে সেই কুয়োর ঢাকনা খোলার সাহস দেখিয়েছিল। সে জানত না, কিছু দরজা একবার খুললে আর বন্ধ করা যায় না।

১. লোহার ঢাকনা ও অদ্ভুত প্রতিধ্বনি

কুয়োটার মুখটা ভারী লোহার ঢাকনা দিয়ে বন্ধ ছিল। বিমল যখন সেটা সরাল, তখন ভেতর থেকে ভ্যাপসা গরম হাওয়ার সাথে পচা গন্ধ বেরিয়ে এল। সে বালতি নামানোর জন্য ঝুঁকল। কুয়োটা এতটাই গভীর যে তলার জল দেখা যায় না, শুধু অন্ধকার।

বিমল একটা পাথর কুড়িয়ে কুয়োর ভেতর ফেলল গভীরতা মাপার জন্য। পাথরটা পড়ার অনেকক্ষণ পর শব্দ এল— ‘টুপ’। কিন্তু সেই শব্দের সাথে সাথে উঠে এল এক অদ্ভুত প্রতিধ্বনি। মনে হলো কুয়োর ভেতর থেকে কেউ ভারী গলায় বলল, “কে… এ… এ…”। বিমলের মনে পড়ল ডাকবাংলোর সেই সাহেব ভূতের কথা, কিন্তু এ গলার স্বর কোনো মানুষের নয়।

২. শিকল টানার শব্দ

সেদিন রাতে বিমলের কোয়ার্টারে জলের খুব প্রয়োজন ছিল। সে বালতি আর দড়ি নিয়ে কুয়োর পাড়ে গেল। আকাশে তখন অষ্টমীর চাঁদ। বিমল দড়ি বেঁধে বালতিটা নিচে নামাল। জল ভরার শব্দ হলো। কিন্তু বালতিটা যখন উপরে টানতে যাবে, তখন মনে হলো বালতিটা নিচে কেউ ধরে রেখেছে।

বিমল সর্বশক্তি দিয়ে টানল। হঠাৎ কুয়োর ভেতর থেকে ধাতব শব্দ ভেসে এল— ‘ঝন… ঝন… ঝন…’। মনে হলো জলের নিচে কেউ মোটা লোহার শিকল নাড়াচ্ছে। বিমল ভয়ে দড়ি ছেড়ে দিতে চাইল, কিন্তু দড়িটা তার হাতের সাথে আটকে গেছে। সে দেখল, কুয়োর অন্ধকার থেকে একটা কালো ছায়া দড়ি বেয়ে টিকটিকির মতো দ্রুতগতিতে উপরে উঠে আসছে। ছায়াটার গা থেকে টপ টপ করে জল ঝরছে।

৩. অতৃপ্ত চোর

ছায়াটা কুয়োর পাড়ে উঠে এল। চাঁদের আলোয় বিমল দেখল, ওটা কোনো মানুষ নয়, একটা কঙ্কালসার দেহ, যার হাত-পা লোহার ভারী শিকল দিয়ে বাঁধা। তার সারা শরীর ফুলে ঢোল হয়ে গেছে জলে ডুবে থাকার কারণে।

ছায়াটি বিমলের দিকে এগিয়ে এসে বলল, “পঞ্চাশ বছর ধরে এই শিকলে বাঁধা আছি… চুরি করতে এসেছিলাম, ওরা মেরে কুয়োয় ফেলে দিয়েছিল… আমাকে মুক্ত কর!” এই বলে সে তার শিকলবাঁধা ঠান্ডা হাত বিমলের গলার দিকে বাড়িয়ে দিল। বিমলের মনে হলো, সেই কাঠের পুতুলের মতো সেও যেন অবশ হয়ে যাচ্ছে।

পরদিন সকালে বিমলকে কুয়োর পাড়ে বেহুঁশ অবস্থায় পাওয়া যায়। তার গলায় ছিল কালশিটে দাগ, যেন কেউ লোহার শিকল দিয়ে গলা টিপে ধরেছিল। ডাক্তাররা বললেন, অক্সিজেনের অভাবে এমন হয়েছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, কুয়োর লোহার ঢাকনাটা আবার বন্ধ করা ছিল, যেটা বিমল খোলার যন্ত্র ছাড়া একা বন্ধ করতে পারত না। আর ঢাকনার ওপর লাল ইটের দিয়ে ঘঁষে লেখা ছিল— “মুক্তি নেই”। বিমল বদলি নিয়ে চলে গেলেও, পলাশপুরের ওই কুয়োর পাশ দিয়ে আজও কেউ রাতে হাঁটে না।

© ২০২৪ গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী সিরিজ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Scroll to Top