অভিশপ্ত ডাকবাংলো ও সাহেব ভূতের চুরুট | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী

অভিশপ্ত ডাকবাংলো ও সাহেব ভূতের চুরুট | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ৮
গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ৮

অভিশপ্ত ডাকবাংলো ও সাহেব ভূতের চুরুট

লিখেছেন: সঙ্গীত দত্ত | স্থান: মুলুক পাহাড় ডাকবাংলো, পুরুলিয়া
ভৌতিক ডাকবাংলো - কাল্পনিক চিত্র

গ্রাম বাংলার প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে আছে রহস্য। আপনি আমাদের সাথে ঘুরেছেন শ্যাওলা ধরা দিঘির গভীরে, দেখেছেন কুয়াশাঘেরা স্টেশনের ভৌতিক ট্রেন। কিন্তু শহরের কোলাহল থেকে দূরে, পাহাড়ের নির্জন ডাকবাংলোয় রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা কেমন? অনিক, পেশায় সাংবাদিক, পুরুলিয়ায় এসেছিল একটি ডকুমেন্টারি শুট করতে। বৃষ্টির কারণে তাকে আশ্রয় নিতে হয় ব্রিটিশ আমলের এক জরাজীর্ণ ডাকবাংলোয়। সে জানত না, এই বাড়িতে অতিথি হিসেবে সে একা নয়।

১. তিন নম্বর ঘরের রহস্য

ডাকবাংলোটা পাহাড়ের একদম চুড়ায়। চারিদিকে শাল আর পলাশের জঙ্গল। কেয়ারটেকার রঘু কাকা অনিককে দোতলার ১ নম্বর ঘরে থাকতে দিল। অনিক যখন ৩ নম্বর ঘরটার দিকে ইশারা করল, রঘু কাকার মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “সাহেব, ওই ঘরে তালা দেওয়া আছে। ওটা ‘উইলিয়াম সাহেবের’ খাস কামরা ছিল। উনি ১৯৪৫ সালে ওখানেই আত্মহত্যা করেছিলেন। রাতে ওই ঘরের দিক মাড়াবেন না।”

অনিকের মনে পড়ল কালিপুরের সেই বন্ধ বারান্দার কথা, যেখানে কৌতূহল ডেকে এনেছিল বিপদ। কিন্তু সাংবাদিকের মন তো মানতে চায় না। রাত গভীর হতেই বাইরে ঝড় শুরু হলো। বিজলি চমকানোর আলোয় ডাকবাংলোটাকে ভূতুড়ে দুর্গের মতো লাগছিল।

২. পিয়ানোর সুর ও চুরুটের গন্ধ

রাত তখন দুটো। অনিক বিছানায় শুয়ে ল্যাপটপে কাজ করছিল। হঠাৎ তার নাকে এল এক তীব্র গন্ধ। দামী কিউবান চুরুটের গন্ধ। কিন্তু এই নির্জন পাহাড়ে, এই ঝড়জলের রাতে কে চুরুট খাবে? গন্ধটা ক্রমশ তীব্র হতে লাগল, যেন কেউ ঘরের দরজার ঠিক ওপাশেই দাঁড়িয়ে ধুমপান করছে।

এর পরেই শুরু হলো সেই সুর। ডাকবাংলোর কোথাও কোনো বাদ্যযন্ত্র নেই, অথচ অনিক স্পষ্ট শুনল ৩ নম্বর ঘর থেকে পিয়ানোর আওয়াজ ভেসে আসছে। কোনো এক বিষাদগ্রস্ত সুর বাজছে। অনিক সাহস করে টর্চ নিয়ে করিডোরে বেরিয়ে এল। ৩ নম্বর ঘরের দরজার নিচ দিয়ে একটা আবছা হলুদ আলো দেখা যাচ্ছে। আর ভেতর থেকে শোনা যাচ্ছে এক মদ্যপ গলার বিড়বিড়ানি— “Where is my whiskey? Ramu! Where are you?”

৩. আয়নায় সাহেবের ছায়া

অনিক ৩ নম্বর ঘরের দরজায় কান পাতল। হঠাৎ পিয়ানো থমকে গেল। ভেতর থেকে ভারী বুট জুতো পায়ে কেউ দরজার দিকে এগিয়ে আসছে। ‘খট্… খট্… খট্…’। অনিক ভয়ে পিছিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। কিন্তু তাতেও রেহাই মিলল না।

ঘরের ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় অনিক দেখল, তার ঠিক পেছনে ইজিচেয়ারে কেউ বসে আছে। এক শ্বেতাঙ্গ সাহেব, পরনে শিকারি পোশাক, হাতে এক গ্লাস মদ আর ঠোঁটে জ্বলন্ত চুরুট। সাহেবের গলার এক পাশটা গুলি লেগে উড়ে গেছে, সেখান থেকে কালচে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। সাহেব অনিকের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চুরুটের ধোঁয়া ছাড়ল। সেই ধোঁয়ায় অনিকের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল, নিশিহাটের সেই কঙ্কালের মতোই এই আত্মাও তার প্রাণ নিতে এসেছে।

পরদিন সকালে রঘু কাকা অনিককে ঘরের মেঝেতে অজ্ঞান অবস্থায় পায়। জানলা খোলা ছিল, আর ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল এক গাদা ছাই। অনিক জ্ঞান ফেরার পর দ্রুত ডাকবাংলো ছেড়ে চলে আসে।

পরে সে জানতে পারে, উইলিয়াম সাহেব তার প্রিয় পিয়ানোটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছিল, আর সেই শোকেই সে আত্মহত্যা করে। আজও ঝড়ের রাতে সে ফিরে আসে নিজের প্রিয় সুর বাজাতে, আর কোনো অতিথিকে দেখলে ভাবে তার পুরনো চাকর রামু ফিরে এসেছে। অনিক আজও নাকে মাঝে মাঝে সেই চুরুটের পোড়া গন্ধ পায়।

© ২০২৪ গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী সিরিজ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

Scroll to Top