শ্মশানের নিভে যাওয়া চিতা ও অশরীরী ছায়া | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী

শ্মশানের নিভে যাওয়া চিতা ও অশরীরী ছায়া | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ১০
গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ১০

শ্মশানের নিভে যাওয়া চিতা ও অশরীরী ছায়া

লিখেছেন: সঙ্গীত দত্ত | স্থান: কীর্তিনাশা নদীর শ্মশান
শ্মশানের জ্বলন্ত চিতা - কাল্পনিক চিত্র

স্বাগত আমাদের ভৌতিক সিরিজের ১০ম পর্বে। আপনারা আমাদের সাথে ঘুরে এসেছেন নিশিহাটে, দেখেছেন অভিশপ্ত কুয়োর রহস্য, এমনকি ভৌতিক স্টেশনের অদৃশ্য যাত্রীও হয়েছেন। কিন্তু সব ভয়ের শেষ যেখানে, সেই শ্মশান ঘাটের গল্প কি আপনারা শুনেছেন? রূপক, গ্রামের এক ডানপিটে ছেলে, অমাবস্যার রাতে কীর্তিনাশা নদীর শ্মশানে গিয়েছিল তার সাহসের প্রমাণ দিতে। কিন্তু সে জানত না, কিছু আগুন জল দিয়েও নেভানো যায় না।

১. ছাইয়ের পাহাড় ও পোড়া গন্ধ

নদীর পাড়ের এই শ্মশানটি শত বছরের পুরনো। এখানে বড় বড় বটগাছগুলো যেন পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছে। রূপক যখন শ্মশানে পৌঁছাল, তখন রাত বারোটা। চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু শেয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক শোনা যাচ্ছে। শ্মশানের এক কোণে একটা চিতা বিকেলে জ্বলেছিল, এখন সেখানে শুধুই এক গাদা ছাই আর আধপোড়া কাঠ পড়ে আছে।

রূপক একটা বটগাছের নিচে বসল। বাতাসে পোড়া চামড়ার তীব্র গন্ধ। হঠাৎ তার মনে হলো, ছাইয়ের গাদাটা নড়ছে। প্রথমে সে ভাবল বাতাসের কারণে, কিন্তু বাতাস তো নেই! গুমোট গরমে গাছের পাতাও নড়ছে না। তার মনে পড়ে গেল নিশুতি রাতের সেই রক্তপলাশের গল্পের কথা, যেখানে পরিবেশ এভাবেই হঠাৎ ভারী হয়ে গিয়েছিল।

২. দাউ দাউ করে জ্বলা আগুন

হঠাৎ রূপকের চোখের সামনে সেই নিভে যাওয়া ছাইয়ের গাদা থেকে ধপ করে আগুন জ্বলে উঠল। কেউ আগুন জ্বালায়নি, কোনো দেশলাইয়ের শব্দ হয়নি। নীলচে রঙের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করল। রূপক ভয়ে উঠে দাঁড়াল। আগুনের শিখাগুলো যেন কোনো মানুষের আকার ধারণ করছে।

আগুনের ভেতর থেকে এক অস্পষ্ট অবয়ব বেরিয়ে এল। তার সারা শরীর ঝলসানো, চামড়া খসে পড়ছে। সে আগুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রূপকের দিকে তাকিয়ে হাসল। তার হাসিটা ছিল হাড়হিম করা। রূপকের মনে হলো, ডাকবাংলোর সেই সাহেব ভূতের চেয়েও এই দৃশ্য অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। ছায়াটি হাত বাড়িয়ে বলল, “তোর শরীরে খুব ঠান্ডা রক্ত… আয়, একটু আগুন পোহাবি আয়।”

৩. নদীর জলের আর্তনাদ

রূপক দৌড়াতে শুরু করল। কিন্তু শ্মশানের মাটি যেন তাকে আটকে ধরছে। সে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল নদীর কাছে। তখন দেখল আরেক দৃশ্য। নদীর জল থেকে উঠে আসছে শত শত কালো হাত, ঠিক যেমনটা হাসানপুরের দিঘিতে ঘটেছিল। কিন্তু এরা তাকে জলে টানছে না, বরং ডাঙায় সেই জ্বলন্ত চিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সেই জ্বলন্ত ছায়াটা রূপকের খুব কাছে চলে এল। তার গায়ের তাপে রূপকের চামড়া জ্বলে যাওয়ার উপক্রম। ছায়াটা ফিসফিস করে বলল, “আমার চিতা অর্ধেক জ্বলে নিভে গিয়েছিল… আমার মুক্তি হয়নি। আজ তোর শরীর দিয়ে আমি আমার শেষকৃত্য সম্পন্ন করব।”

পরদিন সকালে গ্রামের জেলেরা রূপককে শ্মশান ঘাটে খুঁজে পায়। সে বেঁচে ছিল, কিন্তু তার সারা পিঠে ছিল পোড়া দাগ, যেন কেউ গরম লোহা দিয়ে ছ্যাঁকা দিয়েছে। ডাক্তাররা কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

রূপক এখন আর আগুনের দিকে তাকাতে পারে না। এমনকি দেশলাই কাঠি জ্বালালেও সে ভয়ে চিৎকার করে ওঠে। আর গ্রামের লোকেরা বলে, অমাবস্যার রাতে ওই শ্মশানে নাকি এখনও নিভে যাওয়া চিতা আপনা আপনি জ্বলে ওঠে, আর আগুনের ভেতর থেকে শোনা যায় এক অতৃপ্ত আত্মার দীর্ঘশ্বাস।

© ২০২৪ গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী সিরিজ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

Scroll to Top