রক্তকামল মন্দির ও কাপালিকের মন্ত্র | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী

রক্তকামল মন্দির ও কাপালিকের মন্ত্র | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ১৫
গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ১৫

রক্তকামল মন্দির ও কাপালিকের মন্ত্র

লিখেছেন: সঙ্গীত দত্ত | স্থান: শুশুনিয়া পাহাড়ের জঙ্গল, বাঁকুড়া
অভিশপ্ত মন্দির ও কাপালিক - কাল্পনিক চিত্র

গ্রাম বাংলার প্রতিটি প্রাচীন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকে হাজার বছরের ইতিহাস এবং কিছু না বলা বিভীষিকা। আপনারা আমাদের এই ভৌতিক সিরিজে ইতিমধ্যেই সাক্ষী থেকেছেন মাঝনদীর কঙ্কাল মাঝির, দেখেছেন বাঁশবাগানের রক্তমাখা শাড়ি, এমনকি শ্মশানের জীবন্ত আগুনের মুখোমুখিও হয়েছেন। কিন্তু আজ আমরা এমন এক জায়গায় যাব, যেখানে দিনের বেলাতেও সূর্যের আলো প্রবেশ করতে ভয় পায়। বাঁকুড়ার শুশুনিয়া পাহাড়ের গভীর জঙ্গলে অবস্থিত ‘রক্তকামল মন্দির’। লোককথা অনুযায়ী, একসময় এখানে এক তান্ত্রিক কাপালিক নরবলি দিয়ে কালীর আরাধনা করত। গ্রামের মানুষ আজও বিশ্বাস করে, অমাবস্যার রাতে সেই কাপালিকের অতৃপ্ত আত্মা ফিরে আসে তার অসমাপ্ত পূজা শেষ করতে। প্রত্নতাত্ত্বিক অরিন্দম এই মিথ ভাঙতেই সেখানে পা রেখেছিল, কিন্তু সে জানত না, কিছু দরজা কেবল নরকের পথই দেখায়।

১. জঙ্গলের গভীরে পাথরের চোখ

অরিন্দমের নেশা পুরনো মন্দির নিয়ে গবেষণা করা। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের শত বারণ সত্ত্বেও সে একাই ট্রেকিং করে জঙ্গলের গভীরে সেই পরিত্যক্ত মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। জঙ্গলটা এতটাই ঘন যে দুপুরের রোদও এখানে ম্লান। চারদিকে শাল আর মহুয়া গাছের সারি, আর তাদের ফাঁক দিয়ে বয়ে চলা বাতাস যেন ফিসফিস করে কথা বলছে। হাঁটতে হাঁটতে অরিন্দমের মনে হলো, জঙ্গলের গাছগুলো যেন তাকে নজরে রাখছে। প্রতিটা পাতার আড়ালে যেন লুকিয়ে আছে হাজারটা অদৃশ্য চোখ।

মন্দিরটার সামনে যখন সে পৌঁছাল, তখন সূর্য ডুবতে বসেছে। পোড়ামাটির তৈরি মন্দিরটা কালের নিয়মে ভেঙেচুরে একাকার। মন্দিরের গায়ে খোদাই করা মূর্তিগুলোর বেশিরভাগেরই মাথা নেই। কিন্তু যেটা অরিন্দমকে সবচেয়ে বেশি অবাক করল, সেটা হলো মন্দিরের প্রবেশদ্বারের ওপর টাঙানো একটি বড় জং ধরা ঘণ্টা। এত বছর অনাদরে থাকার পরেও ঘণ্টাটি চকচক করছে, যেন কেউ রোজ ওটাকে পরিষ্কার করে। মন্দিরের ভেতরে ঢুকতেই নাকে এল এক তীব্র গন্ধ—পচা মাংস আর পোড়া ধূপের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। অরিন্দম টর্চ জ্বেলে দেখল, গর্ভগৃহের মেঝেতে আলপনা দেওয়া আছে, কিন্তু সেই আলপনার রং সাধারণ চালের গুঁড়ো নয়, কালচে লাল রক্তের মতো।

হঠাৎ তার মনে পড়ল সেই অভিশপ্ত কুয়োর কথা, যেখানে কৌতূহল ডেকে এনেছিল চরম বিপদ। তবুও সে তার ক্যামেরা বের করে ছবি তুলতে শুরু করল। ঠিক তখনই তার ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে ধরা পড়ল এক ছায়া। গর্ভগৃহের বিগ্রহের ঠিক পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে।

২. মধ্যরাতের মন্ত্রোচ্চারণ ও দামারুর শব্দ

অরিন্দম ভেবেছিল আজ রাতটা সে মন্দিরের চাতালেই তাঁবু খাটিয়ে কাটিয়ে দেবে। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে জঙ্গলের শব্দগুলো পাল্টাতে শুরু করল। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক থেমে গিয়ে শুরু হলো এক গম্ভীর আওয়াজ। প্রথমে মনে হলো বাতাসের শব্দ, কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা স্পষ্ট হলো। কেউ একজন সংস্কৃত মন্ত্র পাঠ করছে। মন্ত্রের ভাষা অরিন্দমের চেনা নয়, কিন্তু তার উচ্চারণে এমন এক সম্মোহনী শক্তি আছে যা রক্ত হিম করে দেয়।

‘ওঁ হ্রীং ক্লীং চামুণ্ডায়ৈ বিচ্চে…’ মন্ত্রের আওয়াজ ক্রমশ চড়তে লাগল। সাথে যুক্ত হলো ‘ডুং… ডুং… ডুং…’ করে দামারু বাাজানোর শব্দ। অরিন্দম তাঁবুর চেইন খুলে বাইরে উঁকি দিল। সে দেখল, মন্দিরের ভেতরে আগুন জ্বলছে। কে জ্বালালো এই আগুন? সে সাহস সঞ্চয় করে মন্দিরের দিকে পা বাড়াল।

মন্দিরের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে সে যা দেখল, তাতে তার পায়ের মাটি সরে গেল। গর্ভগৃহে দাউ দাউ করে হোমকুণ্ড জ্বলছে। আর আগুনের সামনে বসে আছে এক বিশালদেহী পুরুষ। তার সারা গায়ে ভস্ম মাখা, গলায় হাড়ের মালা, আর জটা ধরা চুল মাটি স্পর্শ করেছে। লোকটা পিছন ফিরে বসে আহুতি দিচ্ছে। কিন্তু আহুতি হিসেবে সে যা আগুনে ফেলছে, তা কাঠ বা ঘি নয়—সেগুলো মানুষের আঙুল!

৩. মুণ্ডহীন সাধক ও রক্তচক্ষু

অরিন্দম পালানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তার পা যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে। মন্ত্রোচ্চারণ থামল। সেই কাপালিক ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরাতে শুরু করল। অরিন্দমের হৃৎস্পন্দন যেন গলার কাছে উঠে এল। কাপালিক পুরোটা ঘুরল, কিন্তু অরিন্দম দেখল তার কাঁধের ওপর কোনো মাথা নেই! কাটা গলা দিয়ে গলগল করে কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে, আর সেই ধোঁয়ার মধ্যে ভেসে আছে দুটো জ্বলন্ত লাল চোখ।

এক পৈশাচিক স্বরে সেই ধোঁয়া থেকে আওয়াজ এল, “আমার পুজোয় বিঘ্ন ঘটিয়েছিস… আজ তোকেই বলি দেব।” কাপালিক তার ত্রিশূলটা হাতে তুলে নিল। ত্রিশূলের ফলাগুলো থেকে তখনো টাটকা রক্ত ঝরছে। অরিন্দম বুঝল, এই সেই কাপালিক যে ১০০ বছর আগে নিজের মাথা কেটে দেবীকে উৎসর্গ করেছিল অমরত্ব পাওয়ার আশায়। কিন্তু দেবী তাকে গ্রহণ করেননি, তাই সে আজীবন অতৃপ্ত প্রেতাত্মা হয়ে এই মন্দিরে ঘুরে বেড়ায়।

অরিন্দম প্রাণপণে দৌড়াতে শুরু করল। পিছন থেকে ভেসে আসছে সেই দামারুর শব্দ আর অট্টহাসি। জঙ্গলটা যেন গোলকধাঁধা হয়ে গেছে। যতবার সে সোজা পথে যাওয়ার চেষ্টা করছে, ততবারই সে ফিরে আসছে সেই মন্দিরের সামনে। মনে হচ্ছে সেই জীবন্ত পুতুলের মতো তাকেও কেউ সুতো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে।

পরদিন সকালে স্থানীয় আদিবাসীরা অরিন্দমকে জঙ্গলের সীমান্তে অচৈতন্য অবস্থায় খুঁজে পায়। তার জ্ঞান ফেরার পর সে সুস্থই ছিল, কিন্তু একটা অদ্ভুত পরিবর্তন তার মধ্যে দেখা যায়। সে এখন আর প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে কথা বলে না, বরং মাঝেমধ্যেই বিড়বিড় করে সেই অচেনা সংস্কৃত মন্ত্র আওড়ায়।

সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, অরিন্দমের গলার কাছে একটা গভীর কাটা দাগ তৈরি হয়েছে, যা কোনো ডাক্তারের ওষুধে সারে না। আর প্রতি অমাবস্যার রাতে তার ঘরের জানলায় নাকি সেই মুণ্ডহীন ছায়া এসে দাঁড়ায়, নিজের পাওনা বুঝে নিতে। অরিন্দম কি সত্যিই ফিরে এসেছে, নাকি তার শরীরের খোলসটা ফিরেছে আর আত্মাটা রয়ে গেছে সেই রক্তকামল মন্দিরের যূপকাষ্ঠে?

© ২০২৬ গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী সিরিজ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Scroll to Top