অভিশপ্ত তেঁতুলগাছ ও উল্টো দোলনা | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী

অভিশপ্ত তেঁতুলগাছ ও উল্টো দোলনা | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ১৪
গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ১৪

অভিশপ্ত তেঁতুলগাছ ও উল্টো দোলনা

লিখেছেন: সঙ্গীত দত্ত | স্থান: কঙ্কালীতলা, বীরভূম
ভৌতিক তেঁতুলগাছ - কাল্পনিক চিত্র

গ্রাম বাংলার লোককথায় তেঁতুলগাছকে চিরকালই অশুভ শক্তির আধার বলে মনে করা হয়। দিনের বেলাতেও যে গাছের নিচে দাঁড়ালে গা ছমছম করে, রাতের অন্ধকারে তার রূপ যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা শহরের কংক্রিটের জঙ্গলে বসে কল্পনা করা অসম্ভব। আমাদের এই সিরিজের আগের গল্পগুলোতে আপনারা দেখেছেন মাঝরাতের খেয়াঘাটের সেই কঙ্কাল মাঝিকে, কিংবা বাঁশবাগানের সেই রক্তমাখা শাড়িকে। কিন্তু গাছের ডালে ঝুলে থাকা অদৃশ্য দোলনার গল্প কি কখনো শুনেছেন? পলাশ, কোলকাতা থেকে সদ্য গ্রামে আসা এক যুক্তিবাদী যুবক, গ্রামের মানুষের সাবধানবাণীকে ‘কুসংস্কার’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। সে জেদ ধরেছিল, গ্রামের শেষ প্রান্তের সেই প্রাচীন তেঁতুলতলায় অমাবস্যার রাত কাটাবে। কিন্তু সে জানত না, কিছু গাছ শুধু অক্সিজেন দেয় না, তারা পুরনো অভিশাপও বহন করে, আর তাদের শিকড় মাটির গভীরে নয়, মানুষের ভয়ের গভীরে ছড়িয়ে থাকে।

১. নিষিদ্ধ সীমানা ও নিস্তব্ধতা

গ্রামের একেবারে উত্তর প্রান্তে, শ্মশানের ঠিক আগেই দাঁড়িয়ে আছে সেই বিশাল তেঁতুলগাছ। স্থানীয়রা ওই এলাকাটিকে ‘ডাকিনী তলা’ বলে ডাকে। গাছের ডালপালাগুলো এমনভাবে চারদিকে ছড়িয়ে আছে, যেন হাজারটা কালো হাত আকাশটাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। পলাশ যখন রাত বারোটার সময় টর্চ আর মোবাইল নিয়ে সেখানে পৌঁছাল, তখন চারদিক অদ্ভুত রকম শান্ত। গ্রামের ভেতর যেমন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যায়, এখানে তেমন কোনো শব্দ নেই। এক অসহ্য নিস্তব্ধতা যেন কানে তালা লাগিয়ে দেয়।

পলাশ একটা মোটা শিকড়ের ওপর বসল। তার মনে হলো তাপমাত্রা হঠাৎ করেই অনেকটা কমে গেছে। অথচ গ্রীষ্মকাল, ভ্যাপসা গরম থাকার কথা। সে মোবাইল বের করে বন্ধুদের লাইভ ভিডিও করে দেখানোর চেষ্টা করল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে মোবাইলের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ চলে গেছে। এমনকি টর্চের আলোটাও কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে আসছে, যেন অন্ধকার সেই আলোকে গিলে খেতে চাইছে। তার মনে পড়ে গেল পরিত্যক্ত কুয়োর গল্পের সেই বিমলের কথা, যে অন্ধকারের গভীরতা মাপতে গিয়ে নিজেই হারিয়ে গিয়েছিল। পলাশ নিজেকে বোঝাল, এসবই মনের ভুল। কিন্তু ঠিক তখনই তার মাথার ওপরের ডাল থেকে একটা শব্দ এল।

‘কড় কড়… ক্যাঁচ…’ শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ নয়, এটা কোনো ভারী জিনিস দুললে যেমন দড়িতে টান পড়ে, ঠিক তেমন শব্দ। পলাশ টর্চটা ওপরের দিকে তুলল। যা দেখল, তাতে তার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল।

২. শূন্যে দোলনা ও অট্টহাসি

গাছের মগডাল থেকে দুটো মোটা লতা ঝুলে আছে, আর সেই লতার সাথে বাঁধা আছে একটা পুরনো কাঠের দোলনা। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, সেই দোলনায় কেউ বসে নেই, অথচ সেটা বাতাসের বিপরীতে দুলছে! একবার সামনে, একবার পেছনে। দোলনার গতি ক্রমশ বাড়ছে।

পলাশ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল। হঠাৎ দোলনাটা থেমে গেল। আর সাথে সাথেই শোনা গেল এক খিলখিল হাসির শব্দ। হাসিটা কোনো মানুষের নয়, যেন অনেকগুলো শিয়াল একসাথে ডেকে উঠল। পলাশ দেখল, শূন্য দোলনাটা এবার ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে আসছে। লতাগুলো সাপের মতো একেবেঁকে নিচে নামছে। আর সেই দোলনার ওপর আবছা এক ছায়া ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

ছায়াটা একজন নারীর। তার চুলগুলো এলোমেলো, পরনে সাদা থান, যা রক্তে ভেজা। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো তার বসার ভঙ্গি। সে দোলনায় সোজা হয়ে বসে নেই, সে বসে আছে উল্টো হয়ে—মাথাটা নিচের দিকে ঝুলে আছে আর পা দুটো দোলনার সাথে আটকানো। তার লম্বা চুলগুলো মাটি স্পর্শ করছে। সেই উল্টো মুখ দিয়েই সে পলাশের দিকে তাকিয়ে হাসল। তার চোখ দুটো জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল।

৩. শিকড়ের বাঁধন ও অদৃশ্য আক্রমণ

পলাশ চিৎকার করে উঠতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। সে পালাতে চাইল, কিন্তু তার পা দুটো যেন মাটির সাথে গেঁথে গেছে। সে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল, তেঁতুলগাছের সরু সরু শিকড়গুলো মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে তার গোড়ালি পেঁচিয়ে ধরেছে। শিকড়গুলো ধীরে ধীরে তার পায়ের চামড়া ভেদ করে মাংসের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। তীব্র যন্ত্রণায় পলাশ জ্ঞান হারানোর উপক্রম হলো।

ওপর থেকে সেই উল্টো দোলনাটা এখন পলাশের মুখের খুব কাছে। সেই পিশাচিনী তার হাত বাড়িয়ে দিল পলাশের দিকে। তার নখগুলো পাখির ঠোঁটের মতো বাঁকানো। সে ফিসফিস করে বলল, “আমার দোলনায় সঙ্গী নেই… অনেকদিন একা দুলছি… তুই আসবি? আমার সাথে উল্টো হয়ে ঝুলবি?”

বাতাসে তখন পচা তেঁতুলের গন্ধের সাথে মিশে আছে পুরনো রক্তের গন্ধ। পলাশ অনুভব করল, তার প্রাণশক্তি যেন শরীর থেকে শুষে নেওয়া হচ্ছে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল ডাকবাংলোর সেই সাংবাদিক অনিকের মুখ, যে এভাবেই কৌতূহলের শিকার হয়েছিল। পলাশ বুঝতে পারল, প্রকৃতির নিষিদ্ধ গণ্ডি পেরোনোর শাস্তি মৃত্যু। সে শেষবারের মতো চোখ বন্ধ করল, আর অনুভব করল এক জোড়া ঠান্ডা হাত তার গলা টিপে ধরছে।

পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা পলাশকে তেঁতুলতলায় খুঁজে পায়। সে বেঁচে ছিল, কিন্তু তার মানসিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তার গলার দুপাশে ছিল কালশিটে দাগ, আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়—তার পায়ের গোড়ালি দুটো এমনভাবে মচকানো ছিল, যেন কেউ জোর করে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।

ডাক্তাররা বললেন, উঁচু থেকে পড়ার ফলে এমন হয়েছে। কিন্তু গ্রামের বুড়োরা জানেন আসল সত্যটা। আজও অমাবস্যার রাতে ওই তেঁতুলগাছের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পথচারীরা ওপরের দিকে তাকান না। কারণ তারা জানেন, তাকালেই হয়তো দেখতে পাবেন দুটো দোলনা পাশাপাশি দুলছে—একটায় সেই পিশাচিনী, আর অন্যটায় পলাশের মতো কোনো কৌতুহলী আত্মার ছায়া।

© ২০২৪ গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী সিরিজ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Scroll to Top