অভিশপ্ত যাত্রাপালা ও শেষ অঙ্কের বিভীষিকা

গ্রাম বাংলার শীতকাল মানেই মেলা, আর মেলা মানেই রাতজাগা যাত্রাপালা। হ্যাজাক লাইটের তীব্র আলো, চড়া মেকআপ আর বাদ্যযন্ত্রের শব্দে গ্রামীণ জীবন মুখর হয়ে ওঠে। কিন্তু সব আনন্দ উৎসবের আড়ালে কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে এক ভয়ঙ্কর অতীত। আমাদের ভৌতিক সিরিজের আগের গল্পগুলোতে আপনারা দেখেছেন জীবন্ত পুতুলের খেলা কিংবা কঙ্কাল মাঝির নৌকা। আজকের গল্পটি একটি অভিশপ্ত যাত্রাপালাকে ঘিরে। সৌরভ, কলকাতা থেকে আসা এক ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, চণ্ডীতলার মেলায় ‘রক্তজবা অপেরা’-র নাম শুনেছিল। স্থানীয়রা তাকে বারবার বারণ করেছিল যে, অমাবস্যার রাতে ওই দলের শো দেখতে যেও না। কারণ, তাদের শো শুরু হয় রাত বারোটায়, আর শেষ হয় এক নির্মম ট্র্যাজেডিতে। সৌরভ সেই বারণ শোনেনি। সে চেয়েছিল গ্রামের লুপ্তপ্রায় সংস্কৃতির ছবি তুলতে, কিন্তু তার ক্যামেরার লেন্সে যা ধরা পড়ল, তা সংস্কৃতি নয়—বরং এক জীবন্ত দুঃস্বপ্ন।
১. সাজঘরের আড়ালে মৃতদেহের গন্ধ
রাত তখন প্রায় এগারোটা। মেলার ভিড় অনেকটাই কমে এসেছে। মাঠের এক কোণে বিশাল সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে ‘রক্তজবা অপেরা’-র জন্য। সৌরভ কৌতূহলবশত যাত্রার আগে অভিনেতাদের প্রস্তুতি দেখার জন্য গ্রীনরুমের দিকে এগিয়ে গেল। সাধারণত গ্রীনরুমে খুব হইচই থাকে, অভিনেতারা সংলাপ আওড়ায়, চা-এর ভাঁড়ে চুমুক দেয়। কিন্তু এখানকার পরিবেশটা একদম অন্যরকম।
পুরো গ্রীনরুম নিস্তব্ধ। হ্যাজাক লাইটের ফ্যাকাশে আলোয় সৌরভ দেখল, অভিনেতারা আয়নার সামনে বসে মেকআপ নিচ্ছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তাদের কারো মুখে কোনো কথা নেই। তাদের চলাফেরা খুব ধীর, যান্ত্রিক। সৌরভ দলের প্রধান অভিনেতা, যাকে সবাই ‘ভৈরব বাবু’ বলে ডাকে, তার কাছে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করল। ভৈরব বাবু যখন মুখ ঘোরালেন, সৌরভ শিউরে উঠল। এত চড়া মেকআপের আড়ালেও লোকটার চামড়ার ফ্যাকাশে ভাব লুকানো যাচ্ছে না। তার চোখ দুটো ঘোলাটে, যেন মাছের চোখের মতো প্রাণহীন। আর গ্রীনরুমের বাতাসে ভাসছে এক ভ্যাপসা গন্ধ—যেমনটা পাওয়া যায় পুরনো কবরে বা পরিত্যক্ত কুয়োর স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারে। সৌরভের মনে হলো, এরা কেউ মানুষ নয়, এরা যেন মোমের তৈরি পুতুল, যারা শুধু অভিনয়ের জন্য অপেক্ষা করছে।
২. সম্মোহিত দর্শক ও করুণ সুর
ঠিক রাত বারোটায় কনসার্ট শুরু হলো। হারমোনিয়াম, ক্ল্যারিওনেট আর নহবতের শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। কিন্তু সেই সুরের মধ্যে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক বুকফাঁটা কান্না। সৌরভ মঞ্চের সামনের সারিতে বসল। সে অবাক হয়ে দেখল, প্যান্ডেল ভর্তি দর্শক। গ্রামের আবালবৃদ্ধবণিতা সবাই এসেছে। কিন্তু কেউ নড়ছে না, কেউ কথা বলছে না। সবার দৃষ্টি মঞ্চের দিকে স্থির, যেন তারা কোনো শক্তিশালী জাদুর দ্বারা সম্মোহিত হয়ে আছে।
যাত্রাপালার নাম ছিল “অগ্নিসাক্ষী”। গল্পের নায়ক এক জমিদার, যে তার প্রজাদের ওপর অত্যাচার করে তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল। মঞ্চে যখন সেই দৃশ্য অভিনীত হচ্ছিল, সৌরভ অনুভব করল তার চারপাশের তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। অভিনেতারা যখন সংলাপ বলছিল, তাদের গলা দিয়ে যেন আগুনের হলকা বেরোচ্ছিল। বিশেষ করে নায়িকা যখন কান্নার অভিনয় করছিল, তার চোখ দিয়ে জলের বদলে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। সৌরভের যুক্তিবাদী মন বলতে চাইল এটা কোনো স্পেশাল এফেক্ট, কিন্তু তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল—এখানে যা হচ্ছে তা অভিনয়ের বাইরে। ঠিক যেমন বাঁশবাগানের সেই শাড়িটি নিজের ইচ্ছায় নড়ছিল, তেমনি এই মঞ্চের ঘটনাগুলোও কোনো অলৌকিক শক্তির ইশারায় ঘটছে।
৩. শেষ অঙ্কের নরক গুলজার
নাটকের শেষ দৃশ্য। জমিদার তার পাপের সাজা হিসেবে আগুনে পুড়ে মরবে। মঞ্চের ওপর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। সাধারণ যাত্রাপালায় লাল আলো আর ফগ মেশিন ব্যবহার করা হয়, কিন্তু এখানে সত্যিকারের আগুনের লেলিহান শিখা মঞ্চ গ্রাস করে নিল। সৌরভ দেখল, অভিনেতারা কেউ পালাচ্ছে না। তারা সেই আগুনের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে এবং তাদের শরীরের চামড়া পুড়তে শুরু করেছে।
পোড়া মাংসের গন্ধে সৌরভের নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসার উপক্রম হলো। মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা ভৈরব বাবু তখন সরাসরি সৌরভের দিকে তাকালেন। তার অর্ধেক মুখ পুড়ে হাড় বেরিয়ে পড়েছে। তিনি বিকট চিৎকার করে বললেন, “আমাদের পালা শেষ হয়নি! পঞ্চাশ বছর ধরে আমরা এই আগুনেই পুড়ছি! তুইও আমাদের সাথে থাক!”
হঠাৎ পুরো প্যান্ডেলজুড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। দর্শকরা এবার চিৎকার করতে শুরু করল, কিন্তু তাদের সেই চিৎকার মানুষের গলার আওয়াজ নয়, যেন মাটির নিচ থেকে উঠে আসা এক আর্তনাদ। সৌরভ পালাতে চাইল, কিন্তু তার পা যেন মাটির সাথে গেঁথে গেছে। সে দেখল, তার পাশে বসা মানুষগুলো আসলে মানুষ নয়—সব পোড়া কঙ্কাল, যারা এতক্ষণ মানুষের ছদ্মবেশে বসে ছিল। আগুনের ধোঁয়ায় সৌরভের দম বন্ধ হয়ে এল, আর চোখের সামনে নেমে এল অন্ধকার।
পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা সৌরভকে মেলা প্রাঙ্গণের মাঝখানে অচৈতন্য অবস্থায় খুঁজে পায়। তার জামাকাপড় জায়গায় জায়গায় পোড়া ছিল এবং ক্যামেরাটি গলে গিয়ে এক দলা প্লাস্টিকে পরিণত হয়েছিল।
জ্ঞান ফেরার পর সৌরভ যখন যাত্রাপালার কথা বলল, গ্রামবাসীরা অবাক হয়ে তাকে জানাল, “বাবা, গত পঞ্চাশ বছর ধরে চণ্ডীতলায় কোনো যাত্রা হয় না। ১৯৭৫ সালে ‘রক্তজবা অপেরা’র প্যান্ডেলে আগুন লেগে দলের সবাই এবং বহু দর্শক পুড়ে মারা গিয়েছিল। সেই থেকে ওই মাঠ অভিশপ্ত।” সৌরভের ক্যামেরার মেমোরি কার্ডটা কোনোমতে রিকভার করা সম্ভব হয়েছিল। সেখানে শুধুই অন্ধকারের ছবি, আর শেষ ছবিতে দেখা যাচ্ছে মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে আছে একদল কঙ্কাল, যারা হাততালি দিচ্ছে।