অভিশপ্ত নূপুর ও ভগ্ন রাজবাড়ির নর্তকী | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী

অভিশপ্ত নূপুর ও ভগ্ন রাজবাড়ির নর্তকী | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ১৩
গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ১৩

অভিশপ্ত নূপুর ও ভগ্ন রাজবাড়ির নর্তকী

লিখেছেন: সঙ্গীত দত্ত | স্থান: রায়গড় রাজবাড়ি, বাঁকুড়া
ভৌতিক নর্তকী ও রাজবাড়ি - কাল্পনিক চিত্র

গ্রাম বাংলার প্রতিটি প্রাচীন ইমারতের ইটের ফাঁকে লুকিয়ে থাকে হাজারো অব্যক্ত ইতিহাস, আর সেই ইতিহাসের সাথে মিশে থাকে জমাট বাঁধা কান্না। আপনারা ইতিমধ্যেই আমাদের সাথে মাঝনদীর খেয়াঘাটে কঙ্কাল মাঝির মুখোমুখি হয়েছেন, সাহস করে পা রেখেছেন নিষিদ্ধ বাঁশবাগানে। কিন্তু আজ আপনাদের নিয়ে যাব এমন এক জায়গায়, যেখানে দিনের বেলাতেও সূর্যের আলো প্রবেশ করতে ভয় পায়। বাঁকুড়ার জঙ্গলঘেরা রায়গড় রাজবাড়ি। এককালে এই মহলে নূপুরের ঝংকারে রাত নেমে আসত, কিন্তু আজ সেখানে রাজত্ব করে শুধুই বাদুড় আর এক বিষাদগ্রস্ত আত্মা। ইতিহাসের গবেষক সায়ন, রাজবাড়ির স্থাপত্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এমন এক সত্যের মুখোমুখি হয়েছিল, যা তাকে আজও ঘুমের ঘোরে তাড়িয়ে বেড়ায়। কথিত আছে, অমাবস্যার রাতে রাজবাড়ির জলসাঘরে আজও জ্বলে ওঠে ঝাড়লন্ঠন, আর শোনা যায় মঞ্জুলিকার সেই অভিশপ্ত নূপুরের শব্দ।

১. নিষিদ্ধ মহলের হাতছানি ও কেয়ারটেকারের সাবধানবাণী

সায়ন যখন রায়গড় পৌঁছাল, তখন সূর্য প্রায় ডুবে এসেছে। বিশাল এলাকা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে ভগ্নপ্রায় রাজবাড়িটি। মূল ফটকের সিংহদুটোর মাথা ভেঙে গেছে, দেওয়ালের গায়ে গজিয়েছে বিশাল সব অশ্বত্থ গাছ। স্থানীয় কেয়ারটেকার ভরত কাকা সায়নকে বারবার বারণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “বাবা, দোতলার পশ্চিম দিকের মহলটা বহুকাল বন্ধ। ওটা ‘নর্তকী মহল’ নামেই পরিচিত। ছোট রাজকুমার এক বাঈজিকে ভালোবেসেছিলেন, নাম মঞ্জুলিকা। কিন্তু বড়রা সেই সম্পর্ক মেনে নেননি। শোনা যায়, মঞ্জুলিকাকে ওই মহলের দেওয়ালে জ্যান্ত গেঁথে দেওয়া হয়েছিল। তারপর থেকে প্রতি অমাবস্যায় ওখান থেকে কান্নার আওয়াজ আসে।”

সায়ন এসব গল্পে বিশ্বাস করে না। সে তো এসেছে স্থাপত্যের কাজ করতে। তার মনে পড়ল মুলুক পাহাড়ের ডাকবাংলোর কথা, যেখানে মানুষ নিজের মনের ভয়েই অনেক কিছু দেখে। সে ভরত কাকাকে আশ্বস্ত করে দোতলার পূর্ব দিকের ঘরে নিজের আস্তানা গাড়ল। কিন্তু রাত বাড়ার সাথে সাথে রাজবাড়ির পরিবেশ বদলাতে শুরু করল। বাতাসের শব্দে মনে হতে লাগল কেউ ফিসফিস করে কথা বলছে।

২. মধ্যরাতের জলসাঘর ও তীব্র সুগন্ধ

রাত তখন প্রায় দুটো। সায়ন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। হঠাৎ একটা মিষ্টি গন্ধে তার ঘুম ভেঙে গেল। গন্ধটা রজনীগন্ধা ফুলের, কিন্তু তার সাথে মিশে আছে এক তীব্র পচা মাংসের দুর্গন্ধ—ঠিক যেমনটা সে অনুভব করেছিল শ্মশানের সেই নিভে যাওয়া চিতার কাছে। সায়ন উঠে বসল। গন্ধটা আসছে করিডোরের ওপাশ থেকে।

কৌতূহলবশত সায়ন টর্চ নিয়ে ঘর থেকে বের হলো। করিডোরটা অন্ধকার, শুধু জানলা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় মেঝেতে ছায়া পড়েছে। হঠাৎ তার কানে এল সেই শব্দ— ‘ছম… ছম… ছম…’। নূপুরের শব্দ। খুব ধীর লয়ে, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপে মেঝের ওপর এক অদ্ভুত ভার অনুভব করা যাচ্ছে। শব্দটা তাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল সেই নিষিদ্ধ পশ্চিম মহলের দিকে। সায়ন দেখল, দিনের বেলা যে দরজায় বড় তালা ঝোলানো ছিল, সেই দরজা এখন হাট করে খোলা। আর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে এক ম্লান হলুদ আলো।

৩. আয়নার ভেতরের প্রতিবিম্ব ও সত্যের মুখোমুখি

সায়ন মন্ত্রমুগ্ধের মতো জলসাঘরে প্রবেশ করল। ঘরটা ধুলোবালিহীন, ঝকঝকে পরিষ্কার। ছাদের ঝাড়লন্ঠনগুলো জ্বলছে, যদিও সেখানে কোনো বিদ্যুতের সংযোগ নেই। ঘরের মাঝখানে মেহগনি কাঠের মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এক নারীমূর্তি। পরনে তার লাল বেনারসি, পিঠভর্তি খোলা চুল। সে সায়নের দিকে পিছন ফিরে নাচছে। তার নাচের মুদ্রায় এক অদ্ভুত সম্মোহন।

সায়ন ডাকল, “কে আপনি?” মূর্তিটি থামল না, নাচতে নাচতেই সে আয়নার সামনে গেল। সায়ন আয়নার দিকে তাকিয়ে জমে গেল। আয়নায় সায়নের নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে শুধু ওই নারীমূর্তির মুখ। কিন্তু ওটা কোনো মানুষের মুখ নয়। মুখের একপাশ পচে গলে গেছে, চোখের কোটর থেকে পোকা বের হচ্ছে, আর ঠোঁট নেই বললেই চলে—দাঁতগুলো হিংস্রভাবে বেরিয়ে আছে।

৪. মাংসের দলা ও কঙ্কালসার হাসি

হঠাৎ জলসাঘের সব আলো নিভে গেল। সায়নের টর্চটাও কাজ করছে না। অন্ধকারের মধ্যে সে অনুভব করল, কেউ তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে। কানের কাছে সেই পচা গলার ফিসফিসানি ভেসে এল, “আমার নাচ কেমন লাগল বাবু? আমার পায়ে নূপুর পরিয়ে দেবে না?”

সায়ন পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু তার পা মেঝের সাথে আটকে গেছে। সে অনুভব করল এক জোড়া ঠান্ডা, হাড়সার হাত তার গলা জড়িয়ে ধরছে। সেই হাতগুলোতে কোনো মাংস নেই, শুধু হাড় আর ঝলসানো চামড়া। অন্ধকারের মধ্যেই দুটো জ্বলন্ত চোখ তার দিকে এগিয়ে এল। সায়ন বুঝতে পারল, এই মঞ্জুলিকা কোনো সাধারণ আত্মা নয়, সে এক পিশাচিনীতে পরিণত হয়েছে, যে গত একশো বছর ধরে এই মহলে তার শিকারের অপেক্ষা করছে। সায়ন প্রাণপণে চিৎকার করল, কিন্তু সেই চিৎকার রাজবাড়ির পাথরের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল।

পরদিন সকালে ভরত কাকা সায়নকে জলসাঘরের মেঝেতে অজ্ঞান অবস্থায় খুঁজে পান। সায়নের জ্ঞান ফেরার পর সে দ্রুত রাজবাড়ি ছেড়ে শহরে ফিরে আসে। ডাক্তাররা বললেন, অতিরিক্ত ভয় বা স্ট্রেস থেকে হ্যালুসিনেশন হয়েছে।

কিন্তু আসল মোড়টা অন্য জায়গায়। সায়ন কলকাতায় ফিরে আসার পর লক্ষ্য করল, তার ডান পায়ের গোড়ালিতে এক অদ্ভুত কালশিটে দাগ, ঠিক যেন নূপুর পরার দাগ। আর সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, প্রতি অমাবস্যার রাতে সায়ন তার ফ্ল্যাটের বন্ধ ঘরেও সেই নূপুরের শব্দ শুনতে পায়। মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়ালে সে নিজের পেছনে আবছা দেখতে পায় সেই লাল শাড়ি পরা ছায়ামূর্তিকে। মঞ্জুলিকা তাকে ছাড়েনি, সে তার দর্শককে সাথে করে নিয়ে এসেছে।

© ২০২৪ গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী সিরিজ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Scroll to Top