মাঝরাতের খেয়াঘাট ও কঙ্কাল মাঝি

গ্রামের নির্জন রাস্তা ধরে হাঁটার সময় যেমন বাঁশবাগানের লাল শাড়ি দেখে গা ছমছম করে, ঠিক তেমনি মাঝরাতে নদীর ঘাটে একা দাঁড়িয়ে থাকলে এক অজানা ভয় ঘিরে ধরে। আমাদের সিরিজের আগের গল্পে আপনারা দেখেছেন শ্মশানের জ্বলন্ত চিতা। আজকের গল্প নদীর কালো জল আর এক রহস্যময় মাঝিকে নিয়ে। ডাক্তার সমীর, রাত দুপুরে এক মুমূর্ষু রোগীকে দেখে ফিরছিলেন। নদী পার হলেই তার বাড়ি। কিন্তু তিনি জানতেন না, আজ রাতে তার জন্য অপেক্ষা করছে এক অন্য জগতের খেয়া।
১. কুয়াশায় ঢাকা ডিঙি নৌকা
খেয়াঘাটে যখন সমীর বাবু পৌঁছালেন, তখন রাত দুটো। শীতে নদীর জল থেকে ধোঁয়া উঠছে। ঘাটে কোনো নৌকা নেই, সব মাঝি অনেক আগেই চলে গেছে। সমীর বাবু চিন্তায় পড়লেন। এই শীতে সারারাত ঘাটে বসে থাকা অসম্ভব।
হঠাৎ কুয়াশা ফুঁড়ে একটা ছোট ডিঙি নৌকা নিঃশব্দে ঘাটে এসে ভিড়ল। নৌকায় হ্যারিকেনের আলো নেই, ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাঝি মাথায় গামছা বেঁধে বসে আছে, মুখ দেখা যাচ্ছে না। সমীর বাবু ডাকলেন, “ও ভাই, ওপারে যাবে?” মাঝি কোনো কথা বলল না, শুধু হাত নেড়ে ইশারা করল ওঠার জন্য। সমীর বাবু ভাবলেন, হয়তো বোবা। তিনি উঠে বসলেন। কিন্তু নৌকায় পা দিতেই তার মনে হলো কাঠগুলো বড়ই নড়বড়ে, যেন বহু বছরের পচা কাঠ। ঠিক যেমনটা ছিল সেই অভিশপ্ত কুয়োর ঢাকনা।
২. ছপ ছপ শব্দ ও পচা গন্ধ
নৌকা মাঝনদীতে এল। অদ্ভুত ব্যাপার, মাঝি বৈঠা বাইছে না, অথচ নৌকা স্রোতের বিপরীতে তরতর করে এগিয়ে চলেছে। জলের শব্দ হচ্ছে— ‘ছপ… ছপ… ছপ…’। কিন্তু শব্দটা বৈঠার নয়, মনে হচ্ছে কেউ সাঁতরে নৌকার সাথে সাথে আসছে।
হঠাৎ সমীর বাবুর নাকে এল এক তীব্র পচা গন্ধ। অনেকটা শ্যাওলা ধরা দিঘির সেই গন্ধের মতো। তিনি টর্চ জ্বেলে মাঝির দিকে ধরলেন। আলো পড়তেই তিনি দেখলেন, মাঝির গায়ের জামাটা শতছিন্ন, আর তার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে পাঁজরের হাড়। চামড়া বলে কিছু নেই, শুধু হাড়ের ওপর শ্যাওলা জমে আছে।
৩. কড়ির বদলে প্রাণ
সমীর বাবু আতঙ্কে চিৎকার করতে চাইলেন, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। মাঝি ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরাল। তার চোখে কোনো মনি নেই, শুধু দুটো কালো গর্ত। সে তার কঙ্কালসার হাত বাড়িয়ে একটা ভাঙা, খসখসে গলায় বলল, “কড়ি দে… পারের কড়ি দে… নয়তো তোকে রেখে যাব।”
সমীর বাবু পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করতে গেলেন। কিন্তু মাঝি হেসে উঠল, সেই হাসি হাড়ের সাথে হাড় ঘষার মতো শব্দ। “টাকা নয়… আয়ু দে!” এই বলে মাঝি নৌকাটা উল্টে দিল। সমীর বাবু বরফশীতল জলে পড়ে গেলেন। তিনি অনুভব করলেন জলের নিচ থেকে শত শত হাত তাকে টেনে ধরছে। নদীর জল তখন আর জল নেই, মনে হচ্ছে ঘন রক্তে সাঁতার কাটছেন তিনি।
পরদিন সকালে জেলেরা সমীর বাবুকে নদীর চড়ায় কাদার মধ্যে অজ্ঞান অবস্থায় পায়। তার হাতে মুঠো করা ছিল একটা প্রাচীন তামার পয়সা, যা এই যুগে অচল।
জ্ঞান ফেরার পর সমীর বাবু আর কখনো ওই ঘাটে যাননি। স্থানীয়রা বলে, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে এক মাঝিকে যাত্রীরা খুন করে মাঝনদীতে ফেলে দিয়েছিল। অমাবস্যার রাতে সে ফিরে আসে, আর একা কোনো যাত্রীকে পেলে ‘পারের কড়ি’ হিসেবে তার প্রাণ নিয়ে নেয়।