শ্যাওলা ধরা দিঘি ও জলের তলার হাত

গ্রামের জলাশয়গুলো অনেক রহস্য বুকে চেপে রাখে। আমাদের সিরিজের আগের পর্বে আপনি পড়েছেন তেমাথার মোড়ের নিশিহাটের কথা, যেখানে মানুষ আর প্রেতাত্মারা কেনাবেচা করে। কিন্তু আজ আমরা যাব হাসানপুরের এক পুরনো দিঘির পাড়ে। গ্রামের লোকে বলে, এই দিঘির নিচে নাকি গুপ্তধন আছে, আর তা পাহারা দেয় ‘যক্ষ’। সুমন, এক শৌখিন মাছ শিকারি, বন্ধুদের বাজি ধরে অমাবস্যার রাতে সেখানে বড়শি ফেলতে গিয়েছিল। সে জানত না, জলের নিচে থাকা সবকিছু মাছ নয়।
১. নিষিদ্ধ কচুরিপানা
দিঘিটা গ্রামের শেষ প্রান্তে, বাঁশবাগানের ঠিক পেছনে। দিঘির জল দেখা যায় না বললেই চলে, পুরোটা সবুজ কচুরিপানায় ঢাকা। দিনের বেলাতেও জায়গাটা অন্ধকার হয়ে থাকে। স্থানীয় জেলেরা বলে, “এই দিঘিতে জাল ফেলা মানা। একবার জাল ফেললে সেই জাল আর উঠে আসে না, সাথে জেলের প্রাণটাও আটকা পড়ে।”
সুমন এসব মানল না। সে ভাবল, কালিপুরের সেই অভিশপ্ত বাড়ির মতো এটাও হয়তো গ্রামের লোকের বানানো গালগপ্পো। রাত বারোটার সময় সে দিঘির শান-বাঁধানো ঘাটে বসে বড়শিতে টোপ পরাল। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু মাঝে মাঝে জলের ভেতর থেকে ‘ভল… ভল…’ করে বুদবুদ ওঠার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
২. টোপ গেলা ও টান
ঘন্টাখানেক কাটার পর হঠাৎ বড়শিতে হ্যাঁচকা টান পড়ল। সুমনের হাত কেঁপে উঠল। এত জোর টান! নিশ্চয়ই বড় কোনো রুই বা কাতলা হবে। সে সর্বশক্তি দিয়ে ছিপ টানতে শুরু করল। কিন্তু বড়শিটা যেন পাথরের সাথে আটকে গেছে।
সুমন টর্চ জ্বেলে জলের দিকে তাকাল। কচুরিপানাগুলো সরে গিয়ে কালো জল বেরিয়ে এসেছে। সেই জলের ভেতর থেকে আবছা দেখা যাচ্ছে সাদা মতো কী যেন একটা উঠে আসছে। সুমনের মনে পড়ল কাকতাড়ুয়ার গল্পের সেই ভয়ের মুহূর্তের কথা। জলের জিনিসটা মাছ নয়, মানুষের মতো দেখতে! হঠাৎ জল তোলপাড় করে বড়শির সুতো ধরে উঠে এল একটা হাত—ফ্যাকাশে, পচা-গলা, শ্যাওলা মাখা একটা মানুষের হাত!
৩. জলের তলার সংসার
সুমন ছিপ ফেলে পালাতে চাইল, কিন্তু সেই পচা হাতটা সুতো ধরে তরতর করে পাড়ের দিকে এগিয়ে এল। জলের ভেতর থেকে ভেসে উঠল এক নারীর মুখ। তার চুলগুলো কচুরিপানার মতো ছড়িয়ে আছে, চোখ দুটো মাছের মতো গোল এবং পলকহীন। সে খলখল করে হেসে উঠল, “আমার চিরুনিটা হারিয়ে গেছে রে… তুই কি আমার চুল আঁচড়ে দিবি?”
মুহূর্তের মধ্যে জল থেকে আরও হাজার হাজার হাত উঠে এল। সেগুলো সুমনের পা জড়িয়ে ধরল। সুমন অনুভব করল এক প্রচণ্ড টান। তাকে জলের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সে চিৎকার করে ডাকল, কিন্তু সেই চিৎকার বাঁশবাগানেই প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল। জলের নিচে যাওয়ার ঠিক আগে সে দেখল, দিঘির তলায় একটা বিশাল সংসার—সেখানে ডুবে মরা মানুষগুলো পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে, আর তাদের সবার পায়ে লোহার শিকল বাঁধা।
পরদিন সকালে ঘাটে সুমনের ছিপটা পড়ে ছিল। আর ছিপের বড়শিতে গাঁথা ছিল এক দলা লম্বা কালো চুল আর পুরনো আমলের একটা রুপোর নূপুর। সুমনকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তবে গ্রামের লোকেরা বলে, আজও গভীর রাতে দিঘির পাড় দিয়ে গেলে জলের নিচ থেকে কাউকে কাঁদতে শোনা যায়। কেউ যেন করুণ স্বরে বলে— “ওরে, আমার বাঁধন খুলে দে… আমি বাড়ি যাব।”