রক্তমাখা আয়না ও ছায়ার নর্তকী

আয়না কি কেবল আমাদের প্রতিবিম্ব দেখায়, নাকি কখনো কখনো এমন কিছু দেখায় যা দেখার কথা নয়? আপনারা আমাদের সিরিজের আগের পর্বগুলোতে মাঝরাতের খেয়াঘাটে কঙ্কাল মাঝির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, আবার বাঁশবাগানে রক্তমাখা শাড়ি দেখে শিউরে উঠেছেন। আজ আমরা প্রবেশ করব হুগলির গুপ্তিপাড়া জমিদার বাড়ির অন্দরমহলে। সায়ন্তনী, ইতিহাসের ছাত্রী, তার দাদুর আমলের এই পুরনো বাড়িটি সংস্কার করতে এসেছিল। বাড়ির সব ঘর খোলা গেলেও, চিলেকোঠার ‘জলসাঘর’টি গত আশি বছর ধরে তালাবন্ধ ছিল। সায়ন্তনী যখন সেই নিষিদ্ধ দরজার তালা খুলল, সে জানত না—কিছু স্মৃতি ধুলোমাখা আয়নার গভীরে আজও জীবন্ত হয়ে আছে, আর তা অপেক্ষা করছে নতুন কোনো শিকারের।
১. ধুলোমাখা মখমল ও বেলজিয়াম গ্লাস
চিলেকোঠার দরজাটা খুলতেই একরাশ বাদুড় ডানা ঝাপটে বেরিয়ে গেল। ঘরটিতে পা ফেলার সাথে সাথে সায়ন্তনীর নাকে এল বহুদিনের পুরোনো ভ্যাপসা গন্ধ, যার সাথে মিশে আছে কড়া আতরের ঘ্রাণ। ঘরের মাঝখানে আসবাবপত্রগুলো সাদা চাদরে ঢাকা, যেন কোনো মৃতদেহ শুইয়ে রাখা হয়েছে। তবে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল বস্তু, যা লাল মখমলের কাপড় দিয়ে আপাদমস্তক ঢাকা।
কৌতূহল সায়ন্তনীকে চুম্বকের মতো টানল। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে হ্যাঁচকা টানে কাপড়টা সরিয়ে দিল। বেরিয়ে এল এক প্রকাণ্ড বেলজিয়াম গ্লাসের আয়না। আয়নার ফ্রেমে সোনার প্রলেপ দেওয়া, তাতে খোদাই করা আছে অদ্ভুত সব নকশা—সাপ আর লতাপাতার মরণফাঁদ। আয়নাটা এত পরিষ্কার যে মনে হয় গতকালই কেউ মুছে রেখেছে। সায়ন্তনী নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, আয়নার ভেতরের সায়ন্তনী যেন তার আগেই চোখের পলক ফেলল। মনের ভুল ভেবে সে ইগনোর করল, কিন্তু সে খেয়াল করল না যে আয়নার কোণে এক ফোঁটা তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ঠিক যেন সেই জীবন্ত পুতুলের চোখের জলের মতো।
২. নূপুরের ছন্দ ও অদৃশ্য দর্শক
সেদিন রাতে সায়ন্তনী দোতলার শোবার ঘরে ঘুমিয়েছিল। গভীর রাতে হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে গেল এক সুমিষ্ট বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজে। কেউ একজন সারেঙ্গি বাজাচ্ছে। আর তার সাথে তাল মিলিয়ে বাজছে ঘুঙুর। ‘ছম… ছম… ছম…’। আওয়াজটা আসছে ঠিক মাথার ওপরের সেই চিলেকোঠা থেকে।
সায়ন্তনী বিছানা ছেড়ে উঠল। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ, অথচ চিলেকোঠায় যেন পুরোদমে জলসা চলছে। সে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। তার হৃৎস্পন্দন যেন কানের কাছে বাজছে। চিলেকোঠার দরজাটা কি সে বন্ধ করেনি? এখন সেটা আধখোলা। দরজার ফাঁক দিয়ে আবছা হলুদ আলো বেরিয়ে আসছে। সায়ন্তনী দরজায় চোখ রাখল। সে দেখল, সেই বিশাল আয়নাটার সামনে কেউ একজন নাচছে। তার পরনে বেনারসি শাড়ি, পায়ে আলতা, আর পিঠভর্তি খোলা চুল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মেয়েটির কোনো শরীর নেই—সে কেবলই এক দলা কালো ছায়া, কিন্তু আয়নার ভেতরে তার প্রতিবিম্বটি স্পষ্ট। এক অপরূপ সুন্দরী নারী, যার চোখ দুটোতে আছে এক তীব্র আক্রোশ।
৩. আয়নার ভেতরের জগৎ
সায়ন্তনী সম্মোহিতের মতো ঘরে ঢুকল। আয়নার ভেতরের সেই নারীমূর্তি এবার নাচ থামিয়ে সায়ন্তনীর দিকে তাকাল। তার ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি। সে হাত ইশারা করে সায়ন্তনীকে কাছে ডাকল। সায়ন্তনী অনুভব করল, তার নিজের শরীরের ওপর তার আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সে যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পুতুল।
সে আয়নার একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নার ভেতরের নারীটি এবার কথা বলল, কিন্তু কোনো শব্দ হলো না, সরাসরি সায়ন্তনীর মস্তিষ্কে সেই কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হলো— “বহুদিন কেউ আসেনি… আমার একাকিত্ব কাটাতে তোকে চাই।” সায়ন্তনী দেখল, আয়নার কাচটা জলের মতো তরল হয়ে যাচ্ছে। সেই নারীমূর্তি আয়নার ভেতর থেকে তার হাত বাড়িয়ে দিল। সেই হাত সায়ন্তনীর গলা টিপে ধরল না, বরং সায়ন্তনীর হাত ধরে তাকে আয়নার ভেতরে টেনে নিতে চাইল। সায়ন্তনী প্রাণপণে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু আয়নার ওপারের শক্তি ছিল অমানবিক। ঘরের বাতাসে তখন পচা ফুলের গন্ধ আর পোড়া মোমবাতির ধোঁয়া। সায়ন্তনী দেখল, আয়নার ভেতরে আরও অনেকে আছে—তারা সবাই করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যেন তারা বহু বছর ধরে সেখানে বন্দি।
পরদিন সকালে কেয়ারটেকার এসে সায়ন্তনীকে চিলেকোঠার মেঝেতে অচৈতন্য অবস্থায় খুঁজে পায়। তার জ্ঞান ফিরলেও সে আর আগের মতো ছিল না। সে এখন সারাদিন আয়নার সামনে বসে থাকে এবং বিড়বিড় করে কার সাথে যেন কথা বলে। তার হাঁটার ধরণ বদলে গেছে, সে এখন চলাফেরায় এক অদ্ভুত ছন্দ রাখে, যেন সে কোনো নর্তকী।
সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, সেই বিশাল বেলজিয়াম গ্লাসের আয়নাটা এখন আর কোনো প্রতিবিম্ব দেখায় না। আপনি যদি ওই আয়নার সামনে দাঁড়ান, তবে দেখবেন আয়নাটি ঝাপসা, যেন ভেতর থেকে কেউ ওতে নিঃশ্বাস ফেলেছে। আর গভীর রাতে কান পাতলে আজও ওই ঘর থেকে শোনা যায়, কেউ একজন খুব করুণ সুরে বলছে— “আমাকে বের কর… আমি সায়ন্তনী… আমাকে বের কর!” তবে কি আসল সায়ন্তনী এখন আয়নার ওপারে, আর ছায়ার নর্তকী এখন এপারে রাজত্ব করছে?