ডাইনি বুড়ির কালো বিড়াল ও মধ্যরাতের মন্ত্র | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী

ডাইনি বুড়ির কালো বিড়াল ও মধ্যরাতের মন্ত্র | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ২২
গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ২২

ডাইনি বুড়ির কালো বিড়াল ও মধ্যরাতের মন্ত্র

লিখেছেন: সঙ্গীত দত্ত | স্থান: তেঁতুলতলা গ্রাম, বাঁকুড়া
ডাইনি ও কালো বিড়াল - কাল্পনিক চিত্র

গ্রামের শেষ প্রান্তে, যেখানে লোকালয় শেষ হয়ে জঙ্গলের শুরু, সেখানে একটা মরা পুকুর আছে। পুকুরের পাড়ে একটা জরাজীর্ণ মাটির ঘর। গ্রামের সবাই জানে, ওটা ‘কপালি বুড়ির’ ঘর। কেউ বলে সে পাগল, আবার কেউ ফিসফিস করে বলে সে আসলে এক ডাইনি। দিনের বেলা তাকে খুব একটা দেখা যায় না, কিন্তু রাত নামলেই তার ঘর থেকে অদ্ভুত সব শব্দ ভেসে আসে। কখনো বিড়ালের কান্না, আবার কখনো দুর্বোধ্য ভাষায় মন্ত্রপাঠ। আমাদের সিরিজের আগের পর্বে আপনারা নিশির ডাকের কথা জেনেছেন, যা মানুষকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে যায়। কিন্তু কপালি বুড়ির জাদু আরও ভয়ঙ্কর। সে মানুষকে ডাকে না, মানুষ কৌতূহলের বশে তার কাছে যায়, আর তারপর… তারা হয়ে যায় তার কালো বিড়ালের শিকার। টিটু, পাড়ার দুরন্ত কিশোর, খেলার ছলে সেই সীমানা পেরিয়েছিল।

১. নিষিদ্ধ সীমানা ও হারানো ক্রিকেট বল

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। গ্রামের ছেলেরা মাঠ থেকে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হঠাৎ টিটুর সজোরে মারা ক্রিকেট বলটা উড়ে গিয়ে পড়ল সেই মরা পুকুরের পাড়ে, ঠিক কপালি বুড়ির ঘরের পেছনের ঝোপে। বন্ধুরা তাকে বারণ করেছিল। বলেছিল, “বলটা থাক, ওদিকে যাস না। বুড়ির বিড়ালটা খুব খারাপ।”

কিন্তু টিটু ছিল নাছোড়বান্দা। নতুন বল, সে কিছুতেই ফেলবে না। বন্ধুদের কথা কানে না তুলে সে ঝোপের দিকে এগোল। জায়গাটা কেমন যেন ঠান্ডা। ঝোপের কাছে আসতেই সে দেখল বলটা পড়ে আছে একটা তুলসী মঞ্চের পাশে। কিন্তু মঞ্চটা সাধারণ নয়—ওটা উল্টো করে গাঁথা, আর তার ওপর ছডানো আছে কিছু হাড়গোড় আর শুকনো জবা ফুল। টিটু বলটা কুড়োতে যাবে, এমন সময় তার পায়ের কাছে একটা কালো ছায়া নড়ে উঠল।

একটা কুচকুচে কালো বিড়াল। তার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। সাধারণ বিড়ালের মতো সে ‘মিউ’ করল না, বরং কুকুরের মতো ঘোঁত ঘোঁত শব্দ করে টিটুর দিকে তাকিয়ে রইল। টিটুর মনে পড়ে গেল সেই অভিশপ্ত কাকতাড়ুয়ার কথা, যার চোখগুলোও ঠিক এমনই ছিল।

২. জানলার ফাঁকে দেখা ভয়ঙ্কর দৃশ্য

টিটু বল নিয়ে দৌড় দিতে চেয়েছিল, কিন্তু কৌতূহল তাকে থামিয়ে দিল। বুড়ির ঘরের জানলাটা একটু খোলা। ভেতর থেকে লালচে আলো বেরিয়ে আসছে। টিটু পা টিপে টিপে জানলার কাছে গিয়ে উঁকি দিল। ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে তার রক্ত হিম হয়ে গেল।

ঘরের মাঝখানে একটা আগুন জ্বলছে। আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে আছে সাতটা কালো বিড়াল। আর আগুনের সামনে বসে আছে কপালি বুড়ি। তার সাদা চুলগুলো এলোমেলো, পরনে একটা ছেঁড়া লাল শাড়ি। সে আগুনের মধ্যে কিছু একটা ছুড়ে দিচ্ছে আর বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ছে।

হঠাৎ বুড়ি একটা মাটির পুতুল বের করল। পুতুলটার গায়ে সুতো দিয়ে কিছু বাঁধা। বুড়ি একটা বড় কাঁটা দিয়ে পুতুলটার পায়ে খোঁচা মারল। সাথে সাথে ঘরের কোণ থেকে একটা বিড়াল মানুষের গলার স্বরে আর্তনাদ করে উঠল, “উফ! মাগো, পা গেল!” টিটুর গলা শুকিয়ে কাঠ। বিড়ালটা মানুষের ভাষায় কথা বলছে! সে বুঝতে পারল, গ্রামের যেসব বাচ্চা গত কয়েক বছরে হারিয়ে গেছে, তারা কেউ মরেনি। এই ডাইনি বুড়ি কালো জাদুর মাধ্যমে তাদের আত্মাগুলোকে বিড়ালের শরীরে বন্দি করে রেখেছে।

৩. বিড়ালের ধাওয়া ও মন্ত্রের বাঁধন

টিটু আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। সে উল্টো ঘুরে দৌড় দিল। কিন্তু সে নড়তেই পায়ের নিচে একটা শুকনো ডাল মট করে ভেঙে গেল। নিস্তব্ধ দুপুরে সেই শব্দটা যেন বোমার মতো ফাটল। ঘরের ভেতর বুড়ির মন্ত্রপড়া থেমে গেল। একটা খসখসে গলায় সে চেঁচিয়ে উঠল, “কে রে? আমার পূজা নষ্ট করলি!”

টিটু প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। কিন্তু সে অনুভব করল তার পেছনে অনেকগুলো পায়ের শব্দ। সেই সাতটা কালো বিড়াল তাকে তাড়া করেছে। তারা সাধারণ বিড়ালের চেয়ে অনেক দ্রুত দৌড়াচ্ছে। টিটুর মনে হলো তার পা দুটো ভারী হয়ে আসছে, যেন কেউ অদৃশ্য দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছে। বুড়ির মন্ত্রের প্রভাব শুরু হয়ে গেছে।

টিটুর বাড়ির কাছে যখন পৌঁছাল, তখন একটা বিড়াল লাফিয়ে তার পিঠে পড়ল। বিড়ালটার নখগুলো যেন ধারালো ব্লেড। টিটু যন্ত্রণায় চিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেল। জ্ঞান হারানোর আগে সে দেখল, বিড়ালটা তার মুখের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলছে, “তুইও আমাদের মতো হবি… তুইও আমাদের মতো হবি…”

টিটুর চিৎকারে বাড়ির লোকজন বেরিয়ে আসে। তারা দেখে টিটু অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে, আর তার পিঠে গভীর আঁচড়ের দাগ। বিড়ালগুলো উধাও। টিটুর অনেকদিন জ্বর ছিল। সে সুস্থ হয়ে সব কথা সবাইকে বলে, কিন্তু কেউ বিশ্বাস করেনি। সবাই ভেবেছে জ্বরের ঘোরে সে প্রলাপ বকেছে।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেই ঘটনার পর থেকে টিটুর স্বভাব বদলে গেছে। সে এখন আর ক্রিকেট খেলে না, রোদে বের হয় না। সারাদিন ঘরের অন্ধকার কোণে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে। আর রাতে যখন গ্রামের কুকুরগুলো ডেকে ওঠে, তখন টিটুর চোখ দুটো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে—ঠিক সেই কালো বিড়ালের মতো। হয়তো কপালি বুড়ির জাদু ব্যর্থ হয়নি, শুধু রূপান্তরটা ধীর গতিতে ঘটছে।

© ২০২৬ গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী সিরিজ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Scroll to Top