তেমাথার মোড়ের নিশিহাট ও কঙ্কাল বিক্রেতা | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী

তেমাথার মোড়ের নিশিহাট ও কঙ্কাল বিক্রেতা | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ৬
গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ৬

তেমাথার মোড়ের নিশিহাট ও কঙ্কাল বিক্রেতা

লিখেছেন: সঙ্গীত দত্ত | স্থান: বেতডুবি মোড়, বর্ধমান
ভৌতিক নিশিহাট - কাল্পনিক চিত্র

গ্রামের তেমাথার মোড় মানেই এক অজানা আতঙ্ক। আমাদের সিরিজের আগের গল্পে আপনি পড়েছেন জীবন্ত পুতুলের কথা, কিংবা কুয়াশাঘেরা স্টেশনের সেই অদৃশ্য ট্রেনের কথা। কিন্তু কখনো কি শুনেছেন রাত তিনটের সময় ফাঁকা মাঠে হাট বসে? সোমনাথ, শহরের নাইট শিফট শেষ করে বাইক নিয়ে ফিরছিল গ্রামের বাড়িতে। শর্টকাট নেওয়ার জন্য সে বেছে নিয়েছিল বেতডুবির সেই অভিশপ্ত তেমাথার রাস্তা, যেখানে মধ্যরাতে শোনা যায় অদ্ভুত কোলাহল।

১. কুয়াশায় ঢাকা বাজার

রাত তখন প্রায় আড়াইটে। শীতের রাতে বাইক চালাতে সোমনাথের হাত জমে যাচ্ছিল। হঠাৎ বেতডুবি মোড়ের কাছে আসতেই সে দেখল চারদিক আলোয় ঝলমল করছে। অবাক কান্ড! এই নির্জন জায়গায় এত রাতে মেলা বসল নাকি? সে বাইকের গতি কমাল। ধোঁয়াটে কুয়াশার মধ্যে সে দেখল সারি সারি দোকান। মাছের দোকান, সবজির দোকান—সবই আছে। ক্রেতাদের ভিড়ও উপচে পড়ছে।

সোমনাথের মনে পড়ল দাদুর সেই পুরনো সাবধানবাণী— “রাতের বেলা অচেনা আলো দেখলে থামবি না, ওটা নিশির ডাক হতে পারে।” কিন্তু টাটকা ইলিশ মাছের গন্ধে তার লোভ সামলানো দায় হলো। সে বাইক থামিয়ে বাজারের ভেতর ঢুকল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, বাজারে এত লোক থাকলেও কোনো শব্দ নেই। সবাই ফিসফিস করে কথা বলছে, যেন বাতাসের সাথে কথা বলছে।

২. মুদ্রার বদলে রক্ত

সোমনাথ এক মাছওয়ালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বিশাল বড় এক কাতলা মাছ ডালায় রাখা। সোমনাথ জিজ্ঞেস করল, “দাদা, মাছটা কত?” মাছওয়ালা মাথা নিচু করে বসে ছিল, তার মুখ গামছায় ঢাকা। সে একটা খসখসে গলায় বলল, “টাকা লাগবে না বাবু, অন্য কিছু দে।”

সোমনাথ অবাক হয়ে বলল, “অন্য কিছু মানে?” মাছওয়ালা তখন ধীরে ধীরে মুখ তুলল। সোমনাথের রক্ত হিম হয়ে গেল। গামছার নিচে কোনো চামড়া নেই, শুধুই একটা সাদা হাড়ের খুলি। খুলির চোখের গর্ত দুটোতে সবুজ রঙের আগুন জ্বলছে। সে তার কঙ্কালসার হাত বাড়িয়ে বলল, “তোর আয়ু দে… একটু তাজা রক্ত দে…”

৩. পচা মাংসের গন্ধ

সোমনাথ ভয়ে পিছিয়ে গেল। ঠিক তখনই তার নজর পড়ল চারপাশের অন্য দোকানগুলোর দিকে। যারা সবজি বিক্রি করছে, তাদের ঝুড়িতে সবজির বদলে মানুষের কাটা হাত-পা, হৃদপিণ্ড আর নাড়িভুঁড়ি। আর ক্রেতারা? তারা সবাই শূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে, তাদের কারো পা নেই। সোমনাথ বুঝতে পারল, সে মানুষের হাটে নয়, সে এসে পড়েছে প্রেতাত্মাদের ‘নিশিহাটে’।

হঠাৎ বাজারের সব আলো নিভে গেল। চারদিক থেকে বিকট অট্টহাসি ভেসে এল। সেই মাছওয়ালা কঙ্কালটা এবার উঠে দাঁড়াল। তার উচ্চতা যেন তালগাছকেও হার মানায়। সে সোমনাথের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। সোমনাথ প্রাণপণে দৌড়ে বাইকের কাছে পৌঁছাল। বাইক স্টার্ট দিতেই মনে হলো কেউ তার জ্যাকেটটা পেছন থেকে টেনে ধরেছে। হ্যাঁচকা টানে জ্যাকেটটা ছিঁড়ে ফেলে সে কোনোমতে বাইক ছোটাল।

পরদিন সকালে সোমনাথকে বাড়ির উঠোনে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। তার জ্বর কিছুতেই কমছিল না। যখন জ্ঞান ফিরল, সে তার জ্যাকেটের পকেটে হাত দিয়ে শিউরে উঠল। পকেটের ভেতর ছিল এক টুকরো পচা মানুষের হাড় আর কিছু বাসি রজনীগন্ধা ফুল।

গ্রামের তান্ত্রিক বলেছিলেন, “তুই বেঁচে ফিরেছিস কারণ তোর কপালে মায়ের তিলক ছিল। ওই নিশিহাটে যারা একবার সওদা করতে ঢোকে, তারা আর কোনোদিন ফিরে আসে না, নিজেরাই পসরা হয়ে ঝুড়িতে উঠে পড়ে।”

© ২০২৪ গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী সিরিজ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Scroll to Top