জীবন্ত পুতুল ও মাঝরাতের খেলা

জড়বস্তু যখন জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন ভয়ের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায়। আপনি আমাদের সিরিজে আগেই পড়েছেন অভিশপ্ত কাকতাড়ুয়ার কথা, কিংবা জমিদার বাড়ির সেই পালকির কথা। কিন্তু আজ আমরা এমন এক খেলনার কথা বলব, যা আনন্দ দেওয়ার বদলে কেড়ে নেয় প্রাণ। অয়ন ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে এসে চিলেকোঠার ঘর থেকে উদ্ধার করেছিল একটি প্রাচীন কাঠের পুতুল। সে জানত না, এই পুতুলের সুতোর টান অন্য কারো হাতে ধরা।
১. জাদুকর বামাচরণের বাক্স
অয়নের দাদু ছিলেন বিখ্যাত পুতুল নাচিয়ের সাকরেদ। বাড়ির চিলেকোঠায় অনাদরে পড়ে থাকা একটি ধুলোমাখা কাঠের বাক্সের প্রতি অয়নের নজর পড়ে। বাক্স খুলতেই বেরিয়ে আসে একটি দুই ফুট লম্বা কাঠের পুতুল। অদ্ভুত তার গঠন—বড় বড় চোখ, মুখে এক রহস্যময় হাসি, আর পরনে লাল ভেলভেটের জামা।
গ্রামের বুড়োরা বলে, এই পুতুলটি একসময় জাদুকর বামাচরণের ছিল। শোনা যায়, বামাচরণ নাকি তার মৃত ছেলের আত্মাকে কালো জাদুর মাধ্যমে এই পুতুলের মধ্যে বন্দি করেছিল। অয়ন এসব কুসংস্কার বিশ্বাস করত না। সে পুতুলটাকে পরিষ্কার করে নিজের শোবার ঘরে সাজিয়ে রাখল। কিন্তু সে খেয়াল করল না, পুতুলের কাঠের আঙুলগুলো সামান্য নড়ে উঠল। ঠিক যেন নিশুতি রাতের সেই ছায়ামূর্তির মতো, পুতুলটিও অন্ধকারের অপেক্ষায় ছিল।
২. খট্ খট্ শব্দ
রাত তখন দুটো। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। হঠাৎ অয়নের ঘুম ভেঙে গেল। একটা শব্দ হচ্ছে— ‘খট্… খট্… খট্…’। যেন ছোট ছোট কাঠের পা ফেলে কেউ ঘরের মেঝেতে হাঁটছে। অয়ন লাইট জ্বালাল। ঘর ফাঁকা, কিন্তু যে টেবিলে সে পুতুলটাকে বসিয়ে রেখেছিল, সেটা খালি!
আতঙ্কে অয়নের গলা শুকিয়ে গেল। সে খাট থেকে নামতে যাবে, এমন সময় অনুভব করল তার পায়ের গোড়ালিতে কিছু একটা স্পর্শ করছে। সে সাহস করে খাটের নিচে উঁকি দিল। সেখানে পুতুলটি বসে আছে, আর তার হাতে ধরা আছে একটি ধারালো কাঁচি। পুতুলটির মুখে সেই হাসিটা এখন আরও চওড়া হয়েছে। কাঠের মুখ থেকে এক যান্ত্রিক শব্দ বের হলো, “আমার সুতো ছিঁড়ে গেছে… তোর শিরা দিয়ে নতুন সুতো বানাব।”
৩. সুতোর টান
অয়ন চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। সে অনুভব করল তার হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। অদৃশ্য কোনো সুতো যেন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে। সে দেখল, পুতুলটি ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে, আর অয়ন নিজে ছোট হয়ে যাচ্ছে। কাঠের পুতুলটি মানুষের আকার ধারণ করছে, তার চামড়া, তার চোখ—সব অবিকল অয়নের মতো হয়ে যাচ্ছে।
আর অয়ন? তার শরীরটা শক্ত হয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। তার হাত-পায়ের জয়েন্টগুলো কব্জায় পরিণত হচ্ছে। সে বুঝতে পারল, সে আর মানুষ নেই, সে এখন জাদুকর বামাচরণের সেই কাঠের পুতুল। আর পুতুলের বেশে যে দানবটি এখন অয়নের রূপ নিয়েছে, সে হাসতে হাসতে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
পরদিন সকালে অয়নের মা ঘরে ঢুকে দেখেন, অয়ন বিছানায় নেই। শুধু মেঝেতে পড়ে আছে সেই পুরনো কাঠের পুতুলটি। পুতুলটির চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করছে, যা কাঠের পুতুলের হওয়ার কথা নয়।
আজও মায়াপুর গ্রামের ওই বাড়িতে মাঝরাতে চিলেকোঠা থেকে আওয়াজ আসে। কেউ যেন কাঠের পা ঠুকে ঠুকে নাচে, আর করুণ সুরে গায়— “আমি মানুষ ছিলাম, আজ আমি কাঠ… কে আছিস, আমার সুতো কাট!”