নিশীথ রাতের যাত্রা ও রক্তাক্ত মুখোশ | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী

নিশীথ রাতের যাত্রা ও রক্তাক্ত মুখোশ | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ১৭
গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ১৭

নিশীথ রাতের যাত্রা ও রক্তাক্ত মুখোশ

লিখেছেন: সঙ্গীত দত্ত | স্থান: আঁধারমানিক গ্রাম, দক্ষিণ ২৪ পরগনা
রক্তাক্ত কাঠের মুখোশ ও যাত্রাপালা - কাল্পনিক চিত্র

গ্রাম বাংলার প্রতিটি মোড়ে অপেক্ষা করে আছে প্রাচীন সব রহস্য। আপনারা এর আগে আমাদের সাথে পাড়ি দিয়েছেন মাঝরাতের খেয়াঘাটের কুয়াশাচ্ছন্ন নদীতে, যেখানে কঙ্কাল মাঝি আয়ু কেড়ে নেয়। কিংবা নিষিদ্ধ বাঁশবাগানের সেই উল্টো পায়ের রমণীর কথা আপনাদের স্মৃতিতে আজও টাটকা। কিন্তু আজ আমরা যাব এমন এক গ্রামে, যার নাম শুনলেই স্থানীয়রা শিউরে ওঠে—আঁধারমানিক। কথিত আছে, এই গ্রামের ধ্বংসপ্রাপ্ত জমিদার বাড়ির নাটমঞ্চে প্রতি অমাবস্যায় বসে এক অদ্ভুত যাত্রাপালা। সেই যাত্রায় যারা অভিনয় করে, তারা কেউ মানুষ নয়, তারা একশ বছর আগের এক অভিশপ্ত অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মরা অতৃপ্ত আত্মা। সুজন, শহরের এক শৌখিন গবেষক, গ্রামের লোককথার উপর বই লিখতে এসে আটকে পড়েছিল এই গ্রামে। সে জানত না, কৌতূহল মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু হতে পারে।

১. নিষিদ্ধ ঢোলের শব্দ ও পুরনো ধুনোর গন্ধ

রাত তখন প্রায় একটা। সুজন গ্রামের ডাকবাংলোর বারান্দায় বসে ডায়েরি লিখছিল। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ তার কানে এল এক দূরবর্তী বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ। ‘ধা… কুড়… কুড়… ধা…’। ঢোলের গম্ভীর আওয়াজ বাতাসের বুক চিরে ভেসে আসছে। শব্দের উৎস জমিদার বাড়ির সেই পোড়ো নটমঞ্চ, যা এখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে জঙ্গলের ভেতরে।

গ্রামের চৌকিদার সুজনকে আগেই সাবধান করেছিল, “বাবু, রাতে যদি বাজনা শোনেন, কানে তুলো দিয়ে শুয়ে পড়বেন। ভুলেও ওই জঙ্গলের দিকে যাবেন না। ওটা ‘রক্তনটীর’ আসর।” কিন্তু সুজনের যুক্তিবাদী মন সেই বারণ মানল না। সে টর্চ আর ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। জঙ্গলের রাস্তায় ঢুকতেই সে অনুভব করল, বাতাসটা এখানে অস্বাভাবিক ভারী। আর বাতাসের সাথে ভেসে আসছে পোড়া কাঠ আর পুরনো ধুনোর তীব্র গন্ধ। ঠিক যেমনটা সে অনুভব করেছিল তেমাথার মোড়ের সেই নিশিহাটে। তার মনে হলো, কেউ যেন জঙ্গলের আড়াল থেকে তার ওপর নজর রাখছে।

২. মুণ্ডুহীন দর্শক ও নীল আগুনের খেলা

ঝোপঝাড় পেরিয়ে সুজন যখন নটমঞ্চের সামনে পৌঁছাল, তখন দৃশ্যটি দেখে তার পা মাটিতে গেঁথে গেল। ভাঙা থাম আর আগাছায় ভরা মঞ্চটি এখন নীলচে রঙের এক অলৌকিক আলোয় আলোকিত। মঞ্চের চারপাশ ঘিরে বসে আছে শত শত দর্শক। কিন্তু তাদের কারো শরীর নড়ছে না, তারা যেন মূর্তির মতো স্থির। সুজন সাহস সঞ্চয় করে একটু এগিয়ে গেল।

কাছে যেতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। দর্শকরা সবাই পুরনো আমলের পোশাক পরা, কিন্তু তাদের কারো কাঁধের ওপর মাথা নেই! কাটা গলার ওপর কেউ কেউ চাদর দিয়ে ঢেকে রেখেছে। মঞ্চে তখন পুরোদমে অভিনয় চলছে। রাজা ও রানী সেজে দুজন অভিনয় করছে, তাদের সংলাপ প্রাচীন বাংলায়। কিন্তু তাদের গলার স্বর মানুষের নয়, যেন পাতাল থেকে উঠে আসা কোনো যান্ত্রিক গোঙানি। সুজনের ক্যামেরার শাটার কাজ করছিল না। সে বুঝল, সে এক নিষিদ্ধ জগতে প্রবেশ করেছে, যেখানে জীবিত মানুষের কোনো স্থান নেই।

৩. কাঠের মুখোশ ও আসল সত্য

হঠাৎ ঢোলের বাদ্যি প্রচণ্ড জোরে বেজে উঠল। মঞ্চের মাঝখানে প্রবেশ করল প্রধান অভিনেতা। তার মুখে পরা একটি বিশাল কাঠের মুখোশ। মুখোশটি রাক্ষসের মতো দেখতে, দাঁতগুলো বের করা, আর কপাল থেকে গড়িয়ে পড়ছে তাজা রক্ত। সে মঞ্চে দাঁড়িয়ে অট্টহাসি হাসল, আর সেই হাসিতে চারপাশের গাছগুলো কেঁপে উঠল।

অভিনেতাটি ধীরে ধীরে মঞ্চ থেকে নেমে সুজনের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। সুজন পালাতে চাইল, কিন্তু তার শরীর অবশ হয়ে গেছে। অভিনেতাটি সুজনের একদম মুখের সামনে এসে দাঁড়াল। সে ফিসফিস করে বলল, “আমাদের পালা শেষ করতে একজন নতুন দর্শক দরকার… তুই কি আমাদের সাথে যাবি?” এই বলে সে তার মুখের কাঠের মুখোশটা খোলার জন্য হাত দিল।

সুজন দেখল, মুখোশের নিচে কোনো মুখ নেই। আছে শুধু এক দলা পোড়া, ঝলসানো মাংস, যার মধ্যে দুটো চোখ আগুনের ভাটার মতো জ্বলছে। সেই পোড়া মাংসের গর্ত থেকে পোকা মাকড় বেরিয়ে আসছে। সুজন আর সহ্য করতে পারল না, সে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।

পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা সুজনকে নটমঞ্চের ভাঙা বেদীতে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে। তার জ্ঞান ফেরার পর সে কাউকেই কিছু বলতে পারেনি, কারণ সে তার কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। ডাক্তাররা বললেন, প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে তার বাকশক্তি চলে গেছে।

তবে সবচেয়ে রহস্যজনক ব্যাপার হলো, সুজনের ব্যাগের ভেতর থেকে পাওয়া গেল সেই রক্তমাখা কাঠের মুখোশটি, যেটি সে গত রাতে ওই অভিনেতার মুখে দেখেছিল। মুখোশটি শত বছরের পুরনো হলেও, তার গায়ে লেগে থাকা রক্ত ছিল একদম তাজা। আজও সুজন গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে চিৎকার করার চেষ্টা করে, কিন্তু তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না—যেন সেই অভিশপ্ত নাটকের কোনো এক নির্বাক চরিত্রে সে আজীবন বন্দি হয়ে গেছে।

© ২০২৬ গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী সিরিজ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Scroll to Top