
অভিশপ্ত গুঞ্জনের রাত
ভূমিকা: নীরবতার মাঝেও যখন শব্দ বাজে
পৃথিবীর বহু দেশে মানুষ এক অদ্ভুত শব্দের অভিযোগ করে, যার নাম ‘দ্য হাম’ (The Hum)। একটানা একঘেয়ে গুঞ্জন, যা কানের ভেতর দিয়ে সোজা মস্তিষ্কে আঘাত করে। কিন্তু এই শব্দ কি সত্যিই প্রাকৃতিক? নাকি এর পেছনে আছে মানুষের তৈরি কোনো ষড়যন্ত্র? সত্যান্বেষী সঙ্গীতের সপ্তম গল্পে উঠে এসেছে উত্তর কলকাতার এক পুরনো বনেদি বাড়ির রহস্য। যেখানে প্রতি রাতে বাসিন্দারা শুনতে পান এক ভৌতিক গুঞ্জন, অথচ তাদের পাশেই থাকা মানুষটি কিছুই শুনতে পান না। এটি কি কোনো অভিশাপ, নাকি বিজ্ঞানের অপব্যবহার?
উত্তর কলকাতার শোভাবাজারের ‘রায় চৌধুরী ম্যানসন’ নিয়ে ইদানীং পাড়ায় খুব আলোচনা। তিনশো বছরের পুরনো এই বাড়িটি নাকি অভিশপ্ত হয়ে গেছে। গত তিন মাসে এই বাড়ির চারজন ভাড়াটে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। কারণ একটাই—রাত হলেই নাকি কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে মন্ত্র পড়ে, একটা অদ্ভুত গুঞ্জন শুরু হয় যা মাথা খারাপ করে দেয়।
ব্যাপারটা কানে আসতেই সঙ্গীত আগ্রহী হয়ে উঠল। আমরা যখন রায় চৌধুরী ম্যানসনে পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যা নামছে। বাড়ির কেয়ারটেকার হরেন কাকা আমাদের দোতলার সেই ঘরটি দেখালেন। ঘরটি এখন ফাঁকা, শেষ ভাড়াটে গত পরশু ভয়ে পালিয়েছেন।
“বিশ্বাস করুন সঙ্গীত বাবু, আমি নিজে শুনেছি। ঠিক রাত বারোটা বাজলেই একটা ‘ ভোঁ-ও-ও’ শব্দ শুরু হয়। মনে হয় যেন মাথার ভেতর ড্রিল মেশিন চলছে। অথচ আমার স্ত্রী পাশের ঘরেই থাকে, সে কিচ্ছু শুনতে পায় না।” হরেন কাকা আতঙ্কিত গলায় বললেন।
সঙ্গীত ঘরটা খুব ভালো করে দেখল। জানলাগুলো সব বন্ধ। পুরনো আমলের মোটা দেয়াল। বাইরে থেকে শব্দ আসার সম্ভাবনা কম। ও পকেট থেকে একটা ‘নয়েজ মিটার’ বের করল। রিডিং স্বাভাবিক—৩০ ডেসিবেল।
“আজ রাতটা আমরা এখানে থাকব,” সঙ্গীত ঘোষণা করল।
রাত গভীর হলো। ঘড়িতে ঠিক বারোটা বাজতেই হঠাৎ আমি চমকে উঠলাম। কানের পর্দা যেন ফেটে যাচ্ছে! একটা খুব সরু, তীক্ষ্ণ অথচ ভারী গুঞ্জন (Humming Noise)। মনে হচ্ছে শব্দটা ঘরের কোনো স্পিকার থেকে নয়, বরং আমার মস্তিষ্কের ঠিক মাঝখান থেকে তৈরি হচ্ছে।
আমি দুই হাতে কান চেপে ধরলাম। “সঙ্গীত! বন্ধ কর এটা! সহ্য হচ্ছে না!”
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, সঙ্গীত খুব শান্ত হয়ে বসে আছে। ও আমাকে ইশারা করে ঘরের এক কোণে সরে যেতে বলল। যেই আমি কোণে গেলাম, শব্দটা ভোজবাজির মতো গায়েব হয়ে গেল! আবার ঘরের মাঝখানে আসতেই সেই অসহ্য যন্ত্রণা।
সঙ্গীত এবার জানলার দিকে এগিয়ে গেল। জানলাটা খুলতেই দেখা গেল উল্টো দিকের রাস্তায় একটা নতুন বহুতল আবাসন তৈরি হচ্ছে। কনস্ট্রাকশন সাইটটা এখন অন্ধকার।
“পেয়েছি!” সঙ্গীত জানলার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে টর্চ মারল। উল্টো দিকের বিল্ডিংয়ের ছাদে একটা কালো ডিশের মতো যন্ত্র বসানো।
“ওটা কি রে?” আমি হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলাম।
“ওটা একটা ‘প্যারামেট্রিক স্পিকার’ বা ‘অডিও স্পটলাইট’। একে ডিরেকশনাল সাউন্ড টেকনোলজিও বলা হয়।”
অডিও স্পটলাইট (Audio Spotlight)
সঙ্গীত বোঝাল: “সাধারণ স্পিকারের শব্দ আলোর বাল্বের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু অডিও স্পটলাইট লেজার লাইটের মতো কাজ করে। এটি আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহার করে শব্দকে একটি অত্যন্ত সরু বিমে পরিণত করে। এই বিম যার ওপর পড়ে, কেবল সেই শব্দ শুনতে পায়। তার ঠিক এক ফুট পাশে দাঁড়ানো মানুষটিও কিছু শুনতে পাবে না। মনে হবে শব্দটা তার কানের ভেতর থেকেই আসছে।”
পরদিন সকালে আমরা স্থানীয় কাউন্সিলর এবং পুলিশের সাথে কথা বললাম। তদন্তে জানা গেল, ওই নতুন বহুতলের প্রমোটার চাইছিলেন রায় চৌধুরী ম্যানসনের ভাড়াটেরা বাড়ি ছেড়ে চলে যাক, যাতে তিনি এই জমিটাও সস্তায় কিনতে পারেন। তাই তিনি ভাড়া করে এনেছিলেন এক টেকনিশিয়ানকে, যে প্রতি রাতে ওই অডিও স্পটলাইট তাক করত নির্দিষ্ট ভাড়াটের জানলার দিকে। লক্ষ্য ছিল ‘ইনফ্রাসনিক হিউমিলেশন’ বা শব্দ দিয়ে মানসিক নির্যাতন করা।
প্রমোটার গ্রেফতার হলেন। সেই কালো ডিশটি বাজেয়াপ্ত করা হলো।
ফেরার পথে আমি সঙ্গীতকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, মানুষ কেন নিজের বুদ্ধিকে অন্যের ক্ষতি করতে ব্যবহার করে?”
সঙ্গীত হাসল, কিন্তু তার চোখে বিষাদ। “শব্দব্রহ্ম নাদব্রহ্ম। আদিম যুগে মানুষ মন্ত্র দিয়ে বশীকরণ করত বলে শোনা যায়। আজ বিজ্ঞান সেই মন্ত্রকেই হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। কিন্তু মন্ত্র বা বিজ্ঞান—কোনোটাই খারাপ নয়, খারাপ হলো মানুষের লোভ। সেই লোভের ফ্রিকোয়েন্সি যখন বাড়ে, তখন সমাজের সুর কেটে যায়। একজন সত্যান্বেষী হিসেবে আমার কাজ শুধু সেই সুরটা আবার বেঁধে দেওয়া।”
ডায়েরিতে লিখে রাখলাম—সপ্তম কেস, ‘অভিশপ্ত গুঞ্জনের রাত’। যেখানে ভূত ছিল না, ছিল এক অদৃশ্য শব্দের তীর।