রক্তপলাশের অভিশাপ
লেখক: সঙ্গীত দত্ত

প্রথম পর্ব: অচেনা গ্রাম
কার্তিক মাসের শেষ দিক। হেমন্তের হিমেল হাওয়ায় একটা শিরশিরানি ভাব। কলকাতা থেকে প্রায় দুশো কিলোমিটার দূরে ‘হিজলতলী’ গ্রাম। ল্যান্ড রোভারটা যখন গ্রামের মোরাম বিছানো রাস্তায় ঢুকল, তখন সূর্য পাটে বসেছে। চারপাশ ঝপ করে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। অর্ক জানত না যে এই হিজলতলী গ্রামেই তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রাতটি অপেক্ষা করছে, যার নাম রক্তপলাশের অভিশাপ। অফিসের একটা সার্ভে প্রজেক্টের কাজে এখানে আসা। গ্রামের পুরনো জমিদার বাড়িটা নাকি হেরিটেজ হোটেল হবে। সাথে তার কলিগ সুজয় আসার কথা ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তার জ্বর হওয়ায় অর্ককে একাই আসতে হলো।
জমিদার বাড়ির কেয়ারটেকার সনাতন কাকা লণ্ঠন হাতে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিশাল লোহার গেট, তাতে জং ধরেছে। বাড়ির আনাচে-কানাচে জমে আছে শতাব্দীর অন্ধকার। অর্ককে দোতলার দক্ষিণ দিকের ঘরটা দেওয়া হলো। ঘরটা বেশ বড়, কিন্তু বাতাসে একটা গুমোট ভাব। সনাতন কাকা যাওয়ার সময় নিচু গলায় বললেন, “বাবা, রাত বাড়লে জানলাগুলো বন্ধ করে দেবেন। আর… যদি কেউ নাম ধরে ডাকে, খবরদার সাড়া দেবেন না।”
অর্ক হেসে উড়িয়ে দিল কথাটা। সে আধুনিক মানুষ, এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস নেই তার। কিন্তু সে জানত না, বিশ্বাস আর বাস্তবের মাঝখানের দেওয়ালটা এই বাড়িতে বড্ড নড়বড়ে।
দ্বিতীয় পর্ব: নিশির ডাক
রাত তখন দুটো। ল্যাপটপের আলোয় চোখটা জ্বালা করছে। চারপাশ নিঝুম, শুধু মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক। হঠাৎ ঘুমের ঘোরে অর্ক একটা শব্দ শুনল। খুব মিহি, কিন্তু স্পষ্ট।
রুনঝুন… রুনঝুন…
পায়ের নূপুরের শব্দ। শব্দটা করিডোর ধরে তার দরজার কাছে এসে থেমে গেল। বাতাসের গন্ধটাও কেমন পাল্টে গেল মুহূর্তের মধ্যে— পচা রজনীগন্ধা আর কর্পূরের গন্ধ মিশিয়ে এক বমি উদ্রেককারী গন্ধ।
তারপর খুব চেনা গলায় কেউ ডাকল, “অর্ক… ও অর্ক… দরজাটা খোল না রে।” গলার স্বরটা অবিকল সুজয়ের মতো! অর্ক চমকে উঠল। সুজয় তো কলকাতায় জ্বরে ভুগছে, সে এখানে আসবে কী করে? দরজার ওপাশ থেকে আবার আওয়াজ এল, এবার গলার স্বরটা একটু অন্যরকম, একটু বেশিই ভারী, “অর্ক, খুব ভয় করছে রে। দরজাটা খোল।”
অর্ক সাহস সঞ্চয় করে বিছানা থেকে উঠল। ল্যাপটপের আলোয় দেখল দরজার নিচে দিয়ে একটা কালো ধোঁয়ার মতো কিছু ঘরের ভেতর ঢুকছে। সে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। বারান্দায় কেউ নেই, শুধু অমাবস্যার অন্ধকারে জোনাকি জ্বলছে। কিন্তু তার মনের ভেতর কে যেন বলে উঠল, “দরজা খুলো না!”
তৃতীয় পর্ব: পলাশ তলায় ছায়া
হঠাৎ আবার সেই গন্ধ। পচা ফুল আর রক্তের গন্ধ আগের চেয়েও তীব্র। মোমবাতিটা দপ করে নিভে গেল। অর্ক স্পষ্ট অনুভব করল, তার ঘরের কোণে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে দুটো আগুনের মতো লাল চোখ জ্বলজ্বল করছে। অর্ক টর্চ জ্বালাতে গেল, কিন্তু হাত কাঁপছে। মেঝের ওপর একজোড়া ভেজা পায়ের ছাপ, যা জানলা থেকে শুরু হয়ে তার খাটের দিকে এগিয়ে এসেছে। আর ভয়ের ব্যাপার হলো, ছাপগুলো মানুষের পায়ের মতো নয়, উল্টো।
জানলার বাইরে থেকে আবার সেই ডাক। এবার কোনো পুরুষের গলায় নয়, এক নারীর হাহাকার মেশানো কণ্ঠে। “এসো… আমার কাছে এসো… আমার মুক্তি চাই…”
অর্ক যেন সম্মোহিত হয়ে গেল। তার নিজের শরীরের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ রইল না। সে যন্ত্রের মতো জানলার দিকে এগিয়ে গেল। নিচে দিঘির পাড়ে সেই পলাশ গাছটা দেখা যাচ্ছে। অদ্ভুত ব্যাপার, এই হেমন্তকালেও গাছটা লাল ফুলে ভর্তি। আর গাছের ডালে বসে আছে এক রমণী। পরনে লাল বেনারসি, কিন্তু সেটা শতছিন্ন, আর তার গা থেকে গড়িয়ে পড়ছে কালো রক্ত।
চতুর্থ পর্ব: মৃত্যুঞ্জয়ী লড়াই
অর্ক ঘোর লাগা চোখে নিচে নেমে এল। সদর দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল। পলাশ গাছের নিচে পৌঁছতেই সে থমকে গেল। গাছটা থেকে ফুলের বদলে টপটপ করে তাজা রক্ত ঝরে পড়ছে। সামনে দাঁড়িয়ে সেই রমণী। এবার তার রূপ স্পষ্ট। মুখের একপাশ পচে গলে গেছে, দাঁতগুলো হিংস্র পশুর মতো বেরিয়ে আছে, চোখের মণি নেই— শুধু দুটো কালো গর্ত। সে হাতছানি দিয়ে ডাকছে, “কতদিন পর… তাজা প্রাণ… আমাকে মুক্ত করো…”
মহিলাটি অর্কের গলার দিকে হাত বাড়াল। তার নখগুলো ছুরির মতো ধারালো। অর্ক চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। ঠিক সেই মুহূর্তে—
“জয় মা কালী! জয় মা তারা!” সনাতন কাকা! হাতে একটা জ্বলন্ত মশাল আর অন্য হাতে একটা ত্রিশূল। তিনি ঝড়ের বেগে ছুটে এসে ত্রিশূলটা মাটির ওপর সজোরে গেঁথে দিলেন এবং এক মুঠো মন্ত্রপুত ছাই ছুড়ে দিলেন প্রেতাত্মাটার দিকে। “পালা বাবা! দৌড়ান! পেছনে তাকাবেন না!”
ছাই গায়ে লাগতেই প্রেতাত্মাটা বিকট আর্তনাদ করে উঠল। মনে হলো হাজার হাজার কাক একসাথে ডেকে উঠল। অর্ক আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সনাতন কাকার হাত ধরে সোজা দৌড় দিল বাড়ির দিকে। পেছনে তখন শোনা যাচ্ছে গাছের ডাল ভাঙার আওয়াজ আর এক অমানবিক আক্রোশ।
শেষ পর্ব: বিদায়
সারা রাত তারা ঠাকুরদালানে কাটাল। ভোর হতেই অর্ক তার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিল। সনাতন কাকা তার হাতে একটা লাল সুতো বেঁধে দিলেন। তার চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে। তিনি বললেন, “পঞ্চাশ বছর আগে এই পলাশ গাছেই ছোটগিন্নি আত্মহত্যা করেছিলেন। সেই থেকে রক্তপলাশের অভিশাপ এই বংশকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। আপনি বেঁচে গেছেন, এটাই অলৌকিক।”
গাড়ি যখন গ্রামের সীমানা পার হয়ে হাইওয়েতে উঠল, অর্ক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। সূর্য উঠেছে, ভয়ের কালো ছায়া আর নেই। সে রিয়ার ভিউ মিররে নিজের মুখটা দেখল।
কিন্তু হঠাৎ তার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বয়ে গেল। সে দেখল, তার গাড়ির পেছনের সিটে একটা পলাশ ফুল পড়ে আছে। টকটকে লাল, একদম তাজা পলাশ ফুল… আর বাতাসে তখনো ভেসে বেড়াচ্ছে সেই পচা ফুলের আর রক্তের গন্ধ। গাড়িটা কি সে একাই চালাচ্ছে? নাকি পেছনের সিটে অন্য কেউ বসে আছে?
আরও পড়ুন রোমহর্ষক গল্প:
সমাপ্ত