
পাপের উত্তরাধিকার
কলকাতার বালিগঞ্জ পার্কের অভিজাত এলাকা। রাত তখন আড়াইটা। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে। ডিটেকটিভ অরিজিৎ বসুর জিপ যখন প্রাচীন স্থাপত্যের ‘চৌধুরী ম্যানশন’-এর গেট দিয়ে ঢুকল, তখন বিদ্যুতের ঝলকানি বাড়িটাকে কোনো ভৌতিক প্রাসাদের মতো দেখাচ্ছিল।
বাড়িটির মালকিন, ৭২ বছর বয়সী মিসেস মালবিকা চৌধুরী খুন হয়েছেন।
ঘটনাস্থলে ইনস্পেকটর সেন আগেই উপস্থিত ছিলেন। তিনি অরিজিৎকে নিয়ে সোজা দোতলায় মালবিকার বেডরুমে গেলেন। ঘরটি ভিতর থেকে বন্ধ ছিল না, কিন্তু বিছানায় মালবিকার দেহটি অদ্ভুতভাবে বেঁকে আছে। তার চোখের মণি উল্টে গেছে, মুখ দিয়ে গ্যাজলা বেরোচ্ছে।
অরিজিৎ ঘরের চারপাশটা ভালো করে দেখলেন। বেডসাইড টেবিলে এক গ্লাস দুধ অর্ধেক খাওয়া। ঘরের কার্পেটে দামী কাঁচের ফুলদানি ভাঙা। ঘরের এক কোণায় থাকা সিন্দুকটা খোলা, কিন্তু ভেতরে হীরে-জহরত সব অক্ষত আছে। শুধু একটা ফাইলের তাক ফাঁকা।
"বিষ," অরিজিৎ বিড়বিড় করলেন। "আর্সেনিক হতে পারে। স্লো পয়জন। কিন্তু ইনস্পেকটর, সিন্দুক খোলা কেন? চোর কি টাকা না নিয়ে ফাইল নিতে আসবে?"
সন্দেহের তালিকায় যারা
-
১. বিক্রম চৌধুরী (ভাইপো): মালবিকার মৃত স্বামীর ভাইয়ের ছেলে। বয়স ৩৫, মদ্যপ এবং জুয়াড়ি।
সে ঘামতে ঘামতে বলল, "আমি আমার ঘরেই ছিলাম। পিসিমনির চিৎকার শুনে দৌড়ে আসি। বিশ্বাস করুন, আমি টাকা চাইতাম ঠিকই, কিন্তু খুন করার সাহস আমার নেই।" -
২. ডা. সান্যাল (পারিবারিক ডাক্তার): গত ৩০ বছর ধরে এই পরিবারের সঙ্গে যুক্ত।
তিনি বললেন, "মালবিকা সন্ধেবেলা ফোন করে বলেছিল ওর শরীর খারাপ লাগছে। আমি এসেছিলাম। ওনার হার্টের কন্ডিশন ভালো ছিল না। কিন্তু বিষ... এটা আমি ভাবতেও পারছি না।" -
৩. মিস্টার দস্তিদার (আইনজীবী):
তিনি জানালেন, "আজ সকালেই মালবিকা দেবী উইল পরিবর্তন করার জন্য আমাকে ডেকেছিলেন। তিনি তার বর্তমান উইল বাতিল করে সমস্ত সম্পত্তি একটি ট্রাস্টকে দান করে দিতে চেয়েছিলেন। বাড়ির কাউকে এক পয়সাও দিতে চাননি।" -
৪. সুহাসিনী (কেয়ারটেকার ও সেক্রেটারি): বয়স ৪০-এর কোঠায়। শান্ত, গম্ভীর, এবং খুব ব্যক্তিত্বময়ী। সে গত ১৫ বছর ধরে মালবিকার সেবা করছে।
সুহাসিনী বলল, "রোজ রাতে দুধ আমিই দিই। কিন্তু আমি ওনাকে মারব কেন? উনি মারা গেলে আমার তো চাকরিটাই যাবে।"
তদন্তের মোড় ও ময়নাতদন্ত
সকালে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এল। দুধে সায়ানাইড মেশানো ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ডা. সান্যাল মালবিকাকে যে ঘুমের ওষুধ দিয়েছিলেন, তার মধ্যেও বিষ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, কেউ নিশ্চিত করতে চেয়েছিল যে মালবিকা যেন কোনোভাবেই না বাঁচে।
অরিজিৎ আবার ক্রাইম সিনে ফিরে গেলেন। ভাঙা ফুলদানির টুকরোগুলো ল্যাবরেটরি থেকে পরীক্ষা করে জানা গেল, ওতে বিক্রমের রক্ত লেগে আছে। অরিজিৎ বিক্রমকে চেপে ধরলেন।
"সত্যিটা বলো বিক্রম! ফুলদানি ভাঙল কী করে?"
বিক্রম ভেঙে পড়ল। "আমি... আমি চুরি করতে ঢুকেছিলাম। পিসিমনির সিন্দুক খোলা ছিল। আমি হীরের নেকলেসটা নিতে গিয়েছিলাম। তখন পিসিমনি জেগে ওঠেন। আমাকে দেখে ফুলদানিটা ছুড়ে মারেন। আমি ভয় পেয়ে পালিয়ে যাই। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি যখন পালাই, উনি বেঁচে ছিলেন! আমি বিষ দিইনি!"
পুরনো ডায়েরি এবং আসল সত্য
অরিজিতের চোখ গেল সুহাসিনীর দিকে। মহিলাটি বড্ড বেশি শান্ত। অরিজিৎ গোপনে সুহাসিনীর সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে তল্লাশি চালানোর নির্দেশ দিলেন। সেখানে বিছানার তলা থেকে পাওয়া গেল একটা পুরনো, জরাজীর্ণ ডায়েরি আর কিছু হলুদ হয়ে যাওয়া চিঠি। ডায়েরিটা মালবিকার প্রয়াত স্বামী, মিস্টার চৌধুরীর।
ডায়েরির পাতা উল্টাতে উল্টাতে অরিজিতের চোখ কপালে উঠল।
অরিজিৎ বুঝলেন, এই মেয়েটিই সুহাসিনী!
সুহাসিনী আসলে কেয়ারটেকার নয়, সে এই বিশাল সম্পত্তির আসল অংশীদার, মিস্টার চৌধুরীর নিজের মেয়ে! মালবিকা তাকে সারা জীবন নিজের চোখের সামনে রেখে তিলে তিলে অপমান করেছেন। নিজের বাবার বাড়িতে তাকে ঝি-এর মতো থাকতে বাধ্য করেছেন।
শেষের সেওঁতি
অরিজিৎ সবাইকে ড্রইংরুমে ডাকলেন। বাইরে তখনো মেঘের গর্জন। অরিজিৎ সুহাসিনীর দিকে তাকিয়ে বললেন, "মিস সুহাসিনী, বা বলা ভালো—মিস সুহাসিনী চৌধুরী?"
সবাই চমকে উঠল। সুহাসিনীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল。
অরিজিৎ বলতে শুরু করলেন, "মালবিকা দেবী আজ সকালে উইল পরিবর্তন করতে যাচ্ছিলেন। উনি ঠিক করেছিলেন, ট্রাস্টে সব সম্পত্তি দিয়ে দেবেন। এটা হলে আপনি, সুহাসিনী দেবী, সারা জীবনের মতো রাস্তায় এসে দাঁড়াতেন। আপনার বাবার সম্পত্তি, যা আপনার অধিকার ছিল, তা চোখের সামনে অন্য কেউ নিয়ে যাবে—এটা আপনি মেনে নিতে পারেননি।"
অরিজিৎ পকেট থেকে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট বের করলেন। তাতে একটা ছোট ওষুধের শিশি। "এটা আপনার ঘরের ময়লার ঝুড়িতে পাওয়া গেছে। সায়ানাইডের শিশি। আর সবচেয়ে বড় প্রমাণ—আপনার হাতের আঙুলে একটা আংটি ছিল কাল। আজ নেই কেন? কারণ ধস্তাধস্তির সময় ওটা মালবিকা দেবীর খাটের পায়ার নিচে গড়িয়ে গিয়েছিল। ওটাতে আপনার নাম খোদাই করা আছে—'এস.সি' (Suhasini Chowdhury)।"
সুহাসিনী হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসিতে যেন ৩০ বছরের জমে থাকা ক্ষোভ।
"হ্যাঁ! আমি মেরেছি! কেন মারব না?" সুহাসিনীর চোখ দিয়ে আগুন বেরোচ্ছে। "এই বুড়ি ডাইনিটা আমাকে সারা জীবন কী যন্ত্রণা দিয়েছে জানেন? আমার বাবা যখন মারা যান, তখন আমার বয়স দশ। আমি বাবার পায়ে পড়ে কেঁদেছিলাম। বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এই মহিলা দেননি। আমাকে দিয়ে বাবার এঁটো থালা পরিষ্কার করাতো! আমাকে রোজ মনে করাতো যে আমি একটা 'পাপ'-এর ফসল।"
সুহাসিনী বিক্রমের দিকে আঙুল তুলল, "এই মাতালটা, যার শরীরে চৌধুরীদের এক ফোঁটা রক্ত নেই, সে পেত রাজার সম্মান। আর আমি? আমি নিজের বাড়িতে চোরের মতো থাকতাম। আজ যখন শুনলাম ও উইল বদলে সব দান করে দেবে, আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল। আমার যা পাওনা, তা আমি ছিনিয়ে নিয়েছি!"
হঠাৎ সুহাসিনী তার শাড়ির আঁচল থেকে একটা ছোট পিস্তল বের করল। "কেউ আমার কাছে আসবে না! আমি এখান থেকে বেরোবো, আর এই সম্পত্তি আমার!"
ইনস্পেক্টর সেন বন্দুক তাক করলেন, কিন্তু সুহাসিনী তখন মরিয়া। সে অরিজিতের দিকে গুলি চালাতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে বিক্রম—যে ভীরু এবং মাতাল ছিল—নিজের অজান্তেই বা হয়তো প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য অরিজিতের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। গুলিটা বিক্রমের কাঁধে লাগল।
সেই সুযোগে ইনস্পেক্টর সেন সুহাসিনীর হাতে লাঠি দিয়ে আঘাত করলেন। পিস্তল ছিটকে পড়ে গেল। পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলল।
সুহাসিনীকে যখন পুলিশ ভ্যানে তোলা হচ্ছে, সে তখনো চিৎকার করছে, "এ বাড়ি আমার! আমি চৌধুরীদের রক্ত!"
বৃষ্টি থেমে গেছে। অরিজিৎ জিপে স্টার্ট দিলেন। তার মনে হলো, মালবিকা দেবী হয়তো মরে গিয়ে বেঁচে গেছেন, কিন্তু নিজের প্রতিহিংসার জন্য তিনি একটা মেয়েকে রাক্ষসীতে পরিণত করে গেলেন। রক্তের দাগ শুধু মেঝেতে থাকে না, সেটা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মনেও লেগে থাকে।