
অদৃশ্য তরঙ্গের মৃত্যু
ভূমিকা: নিস্তব্ধতারও কি শব্দ আছে?
সত্যান্বেষী সঙ্গীত বিশ্বাস করে, নীরবতা বলে কিছু নেই। আমরা যা শুনতে পাই না, তা আমাদের মস্তিষ্কে গভীর প্রভাব ফেলে। প্রথম গল্পে আমরা দেখেছিলাম ‘রেজোন্যান্স’ বা অনুনাদের খেলা। এবারের গল্পটি আরও জটিল। যেখানে হত্যাকারী কোনো মানুষ নয়, কোনো অস্ত্র নয়—বরং এমন একটি শব্দতরঙ্গ যা মানুষের কান শুনতে পায় না, কিন্তু হৃদয় অনুভব করে।
সঙ্গীত সেন এবং তার বন্ধু লেখক সঙ্গীত দত্তর এই দ্বিতীয় অভিযান আপনাকে নিয়ে যাবে আধুনিক রেকর্ডিং স্টুডিওর এক অন্ধকার জগতে, যেখানে প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক মারণ ফাঁদ।
শীতের সন্ধ্যা। পার্ক সার্কাসের কাছে সঙ্গীতের স্টুডিওতে বসে আছি। সঙ্গীত আজ খুব ব্যস্ত, নতুন একটা ‘সাউন্ড আইসোলেশন’ ফোম নিয়ে পরীক্ষা করছে। আমি সোফায় বসে অলসভাবে ম্যাগাজিন উল্টাচ্ছিলাম।
হঠাৎ সঙ্গীতের ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠল। এই ল্যান্ডফোনটা কেবল বিশেষ ক্লায়েন্ট বা পুলিশের জন্যই রাখা। সঙ্গীত রিসিভার তুলল। কয়েক মুহূর্ত শোনার পর ওর ভুরু কুঁচকে গেল।
“কি বলছেন ইন্সপেক্টর? হার্ট অ্যাটাক? তাহলে আমাকে কেন?… ওহ! রেকর্ডিং চলাকালীন? ঠিক আছে, আমি আসছি।”
ফোন রেখে সঙ্গীত জ্যাকেটটা গায়ে চাপাতে চাপাতে বলল, “চল, সল্টলেক যেতে হবে। ‘ভয়েস অফ আর্ট’ স্টুডিওতে।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “সে কি! ওটা তো বিখ্যাত বাচিক শিল্পী অরুণা রায়ের স্টুডিও। কি হয়েছে?”
“অরুণা রায় আর নেই। আজ বিকেলে রেকর্ডিং বুথের ভেতরেই তিনি মারা গেছেন। পুলিশ বলছে হার্ট অ্যাটাক, কিন্তু স্টুডিওর সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার বলছে মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে মিটারে একটা অদ্ভুত স্পাইক বা কম্পন দেখা গিয়েছিল, যেটা কোনো মানুষের গলার স্বর নয়।”
স্টুডিওতে পৌঁছে দেখলাম পুলিশ জায়গাটা ঘিরে রেখেছে। ইন্সপেক্টর সোমনাথ আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন।
“আসুন মিস্টার সেন। খুব অদ্ভুত কেস। অরুণা দেবী একটা হরর অডিও স্টোরি রেকর্ড করছিলেন। বুথ ভেতর থেকে লক ছিল, সাউন্ডপ্রুফ। কাঁচের বাইরে থেকে ওঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং ওঁর সৎ ছেলে বিমল সব দেখছিল। হঠাৎ অরুণা দেবী নিজের গলা চেপে ধরেন, চোখেমুখে তীব্র আতঙ্কের ছাপ, আর তারপরই সব শেষ।”
সঙ্গীত সরাসরি রেকর্ডিং বুথের দিকে গেল। একটা ছোট কাঁচঘেরা ঘর। ভেতরে একটা দামী মাইক্রোফোন, হেডফোন আর একটা স্ক্রিপ্ট রাখা। সঙ্গীত হেডফোনটা হাতে নিয়ে খুব ভালো করে দেখল। তারপর কনসোল রুমে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ারকে বলল,
“আমাকে লাস্ট রেকর্ডিংটা শোনান। কিন্তু প্রসেস করা ফাইল নয়, র-ফাইল (Raw file)।”
ইঞ্জিনিয়ার ফাইলটা প্লে করলেন। স্পিকারে অরুণা দেবীর ভরাট গলা শোনা গেল। তিনি একটা ভৌতিক গল্পের ক্লাইমেক্স পড়ছিলেন। হঠাৎ… একটা অস্ফুট গোঙানির শব্দ, তারপর ভারী কিছু পড়ে যাওয়ার আওয়াজ। আর তারপর পিনপতন নিস্তব্ধতা।
সবাই চুপ। কিন্তু সঙ্গীতের চোখ ল্যাপটপের স্ক্রিনের ওয়েভফর্মের (Waveform) দিকে স্থির। ও আঙুল দিয়ে একটা জায়গা দেখিয়ে বলল, “দেখুন। ঠিক অরুণা দেবী পড়ে যাওয়ার আগের ৫ সেকেন্ড। ওয়েভফর্মটা দেখুন।”
আমি ভালো করে তাকালাম। সাধারণ কথার ওয়েভফর্ম যেমন আঁকাবাঁকা হয়, এটা তেমন নয়। নিচে একটা খুব ধীর লয়ের মোটা লাইন চলে গেছে।
“এটা কি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সঙ্গীত গম্ভীর গলায় বলল, “এটা ইনফ্রাসাউন্ড (Infrasound)। ১৯ হার্টজের (19Hz) কাছাকাছি ফ্রিকোয়েন্সি। এটাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ফিয়ার ফ্রিকোয়েন্সি’ বা ভয়ের কম্পাঙ্ক।”
ইন্সপেক্টর সোমনাথ অবাক হয়ে বললেন, “সেটা আবার কি?”
সঙ্গীত ব্যাখ্যা করল, “মানুষের কান ২০ হার্টজের নিচের শব্দ শুনতে পায় না। কিন্তু আমাদের শরীর সেটা অনুভব করতে পারে। ১৯ হার্টজের শব্দতরঙ্গ মানুষের চোখের মণি কাঁপিয়ে দেয়, হ্যালুসিনেশন তৈরি করে এবং মস্তিষ্কে তীব্র ভয়ের সঞ্চার করে। যার হার্ট দুর্বল, এই শব্দ তার জন্য মারণাস্ত্র হতে পারে।”
সঙ্গীত এবার ঘুরে তাকাল কোণে দাঁড়িয়ে থাকা অরুণা দেবীর সৎ ছেলে বিমলের দিকে। বিমল ঘামছিল।
“মিস্টার বিমল, আপনিই তো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটা সেট করেছিলেন, তাই না?”
বিমল তোতলামি করে বলল, “হ্যাঁ… কিন্তু আমি তো শুধু ভয়ের আবহ সঙ্গীত বাজিয়েছিলাম।”
সঙ্গীত হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই। ও কনসোলে বসে ব্যাকগ্রাউন্ড ট্র্যাকটা আলাদা করল। তারপর একটা স্পেকট্রাম অ্যানালাইজার সফটওয়্যার ওপেন করল।
“ইন্সপেক্টর, দেখুন। মিউজিকের আড়ালে লুকিয়ে রাখা আছে এই ১৮.৯ হার্টজের একটি লুপ। এটা সাধারণ স্পিকারে বাজলে কেউ বুঝবে না। কিন্তু অরুণা দেবী কানে হাই-কোয়ালিটি নয়েজ ক্যান্সেলেশন হেডফোন পরে ছিলেন। পুরো সাউন্ড প্রেশারটা সরাসরি ওঁর মস্তিষ্কে আঘাত করেছে। ওঁর হার্টের কন্ডিশন খারাপ ছিল, সেটা বাড়ির লোক হিসেবে আপনি জানতেন বিমলবাবু।”
বিমল পালানোর চেষ্টা করতেই কনস্টেবলরা তাকে ধরে ফেলল। জেরার মুখে সে স্বীকার করল, সম্পত্তির লোভে সে চেয়েছিল অরুণা দেবীকে ভয় দেখিয়ে হার্ট অ্যাটাক করাতে, যাতে মনে হয় তিনি প্রাকৃতিকভাবেই মারা গেছেন। সে ইন্টারনেট থেকে এই ‘ঘোস্ট ফ্রিকোয়েন্সি’ ডাউনলোড করে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের সাথে মিক্স করে দিয়েছিল।
কেস সলভ করে যখন আমরা ফিরছি, রাত তখন গভীর। গাড়িতে আমি সঙ্গীতকে বললাম, “শব্দ যে মানুষ মারতে পারে, এটা বিশ্বাসই হতো না।”
সঙ্গীত জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল, “শব্দই ব্রহ্ম, আবার শব্দই বিনাশ। বেসুরো নোট শুধু কানে লাগে না রে, মাঝে মাঝে প্রাণও কেড়ে নেয়। তবে ভালোই হলো, শেষ বয়সে ভদ্রমহিলাকে অন্তত ভয়ংকর কোনো কষ্ট পেতে হলো না, শুধু একরাশ অদৃশ্য ভয় তাঁকে মুক্তি দিয়ে গেল।”
আমি ডায়েরিতে নোট নিলাম—’অদৃশ্য তরঙ্গের মৃত্যু’। সত্যান্বেষী সঙ্গীতের মুকুটে আরও একটি পালক যুক্ত হলো।