নকল স্বরের জবানবন্দি – সত্যান্বেষী সঙ্গীত ‘

নকল স্বরের জবানবন্দি ফিচার ইমেজ

নকল স্বরের জবানবন্দি

সিরিজ: সত্যান্বেষী সঙ্গীত (পর্ব – ৩) | কলমে: সঙ্গীত দত্ত

ভূমিকা: প্রযুক্তির ছায়ায় মিথ্যের বসবাস

মানুষের পরিচয় তার কথায়, তার গলার স্বরে। কিন্তু সেই স্বরই যদি চুরি হয়ে যায়? আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI চোখের নিমেষে তৈরি করে দিতে পারে এমন কিছু, যা বাস্তব আর অবাস্তবের সীমারেখা মুছে দেয়। সত্যান্বেষী সঙ্গীতের এবারের কেস কোনো সাধারণ খুন বা চুরির নয়। এবারের রহস্য এমন এক জবানবন্দিকে ঘিরে, যা মৃত মানুষ দিয়ে গেছে—নাকি দেওয়ানো হয়েছে?

শব্দের কারিগর সঙ্গীত সেনকে এবার লড়তে হবে এক অদৃশ্য অ্যালগরিদমের বিরুদ্ধে। যেখানে প্রতিপক্ষ কোনো মানুষ নয়, বরং লক্ষ লক্ষ কোডের সমষ্টি।

***

সকালবেলা চায়ের কাপ হাতে খবরের কাগজ পড়ছিলাম। সঙ্গীত ল্যাবরেটরিতে ব্যস্ত তার নতুন অডিও প্রসেসর নিয়ে। হঠাৎ ডোরবেল বেজে উঠল। দরজা খুলতেই দেখলাম এক তরুণী দাঁড়িয়ে। চোখ মুখ ফোলা, যেন সারা রাত কেঁদেছেন।

“আমি শ্রেয়া। শ্রেয়া মল্লিক। ব্যবসায়ী অনিমেষ মল্লিকের মেয়ে। আমি কি মিস্টার সঙ্গীত সেনের সাথে কথা বলতে পারি?”

নামটা শুনেই চমকে উঠলাম। অনিমেষ মল্লিক—শহরের বিশিষ্ট শিল্পপতি। গতকাল রাতেই তার আত্মহত্যার খবর টিভিতে ব্রেকিং নিউজ হয়েছে। সঙ্গীত ভেতর থেকে বেরিয়ে এল।

“আসুন মিস শ্রেয়া। খবরের কাগজে আপনার বাবার মৃত্যুর খবরটা পড়লাম। পুলিশ তো বলছে এটি সুইসাইড। ঘটনাস্থল থেকে একটা অডিও নোটও পাওয়া গেছে।”

শ্রেয়া ব্যাগ থেকে একটা পেনড্রাইভ বের করে টেবিলে রাখলেন। তার গলা কাঁপছে।
“পুলিশ ওই অডিও নোট শুনেই কেস ক্লোজ করতে চাইছে। কিন্তু মিস্টার সেন, ওটা আমার বাবার গলা হলেও, ওটা আমার বাবা নন! বাবা কোনোদিন হার মানার মানুষ ছিলেন না। আর সবচেয়ে বড় কথা, বাবা আমাকে ‘মা’ বলে ডাকতেন, কিন্তু ওই রেকর্ডিং-এ…”

শ্রেয়া কান্নায় ভেঙে পড়লেন। সঙ্গীত পেনড্রাইভটা নিয়ে কম্পিউটারে লাগাল। স্পিকারে ভেসে এল এক গম্ভীর, ক্লান্ত কণ্ঠস্বর:
“আমি অনিমেষ। ঋণের চাপে আমি শেষ হয়ে গেছি। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। শ্রেয়া, আমাকে ক্ষমা করিস মা…”

রেকর্ডিং শেষ হতেই সঙ্গীত আমার দিকে তাকাল। ওর চোখে সেই পরিচিত বিদ্যুৎ খেলে গেল।
“সঙ্গীত দত্ত, তুই কিছু লক্ষ্য করলি?”

আমি মাথা নাড়লাম। “না তো! একদম স্পষ্ট অনিমেষ মল্লিকের গলা।”

সঙ্গীত মুচকি হাসল। “বড্ড বেশি স্পষ্ট। মানুষ যখন আবেগে ভেঙে পড়ে, যখন কেউ মৃত্যুর আগে শেষ কথা বলে, তখন তার নিশ্বাসের একটা অনিয়মিত ছন্দ থাকে। কিন্তু এখানে প্রতিটি শব্দের মাঝখানের গ্যাপ একদম মাপা। যেন কোনো রোবট কথা বলছে।”

শ্রেয়া আশার আলো দেখলেন। “তার মানে?”

“তার মানে মিস শ্রেয়া, আপনার সন্দেহ ঠিক হতে পারে। এটা ‘ভয়েস ক্লোনিং’। আজকাল AI দিয়ে কয়েক সেকেন্ডের স্যাম্পল ভয়েস পেলেই হুবহু নকল করা সম্ভব। কিন্তু মেশিন আবেগ বোঝে না, গণিত বোঝে। চলুন, আপনার বাবার অফিসে যাওয়া দরকার।”

***

অনিমেষ মল্লিকের অফিসটা বিশাল। পুলিশ সিল করে রেখেছিল, কিন্তু শ্রেয়ার বিশেষ অনুরোধে আমাদের ঢুকতে দেওয়া হলো। সঙ্গীত সোজা কম্পিউটার আর ল্যান্ডফোনের দিকে গেল।

“মিস শ্রেয়া, আপনার বাবার ব্যবসায়িক পার্টনার কে?”

“মিস্টার রাকেশ। উনি বাবার দীর্ঘদিনের বন্ধু। কিন্তু ইদানীং কোম্পানির শেয়ার নিয়ে দুজনের খুব ঝামেলা হচ্ছিল।”

সঙ্গীত পকেট থেকে তার স্পেশাল হাই-সেনসিটিভিটি মাইক্রোফোন বের করল। ঘরের এসিটা অন করল। এসির একটা হালকা ‘হুমম’ শব্দ হচ্ছে।
“ইন্সপেক্টর, আপনি কি ওই সুইসাইড নোটের অডিও ফাইলটা আমাকে আরেকবার দিতে পারবেন? আমি ‘স্পেকট্রাম অ্যানালিসিস’ করতে চাই।”

সঙ্গীত ল্যাপটপে গ্রাফ খুলল। একদিকে অফিসের এসির রিয়েল-টাইম সাউন্ড ওয়েভ, অন্যদিকে সুইসাইড নোটের ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ।

“দেখুন!” সঙ্গীত চিৎকার করে উঠল। “ম্যাজিকটা এখানেই। সুইসাইড নোটে ব্যাকগ্রাউন্ডে যে এসির আওয়াজ আছে, তার ফ্রিকোয়েন্সি ৫০ হার্টজ। কিন্তু লক্ষ্য করুন, প্রতি ৩ সেকেন্ড অন্তর ওয়েভফর্মে একটা সূক্ষ্ম ‘কাট’ বা ছেদ আছে। এটা লুপ করা হয়েছে! অর্থাৎ, কেউ অনিমেষ বাবুর গলার স্বর নকল করেছে, আর বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য ব্যাকগ্রাউন্ডে এসির আওয়াজ বসিয়েছে। কিন্তু তারা খেয়াল করেনি যে নয়েজটা লুপ করার সময় ফেজ (Phase) শিফট হয়ে গেছে।”

ইন্সপেক্টর হতভম্ব। “তার মানে এটা খুন?”

“ডেফিনেটলি। এবং খুনটা এমন কেউ করেছে যে অনিমেষ বাবুর ভয়েস স্যাম্পল বা ইন্টারভিউয়ের রেকর্ডিং সহজেই পেতে পারে। মিস্টার রাকেশ কি টেক-স্যাভি?”

ঠিক সেই সময় রাকেশ কেবিনে ঢুকলেন। আমাদের দেখে তিনি একটু থতমত খেয়ে গেলেন।
“আপনারা এখানে কি করছেন? শ্রেয়া, পুলিশ তো সব বলেই দিয়েছে।”

সঙ্গীত রাকেশের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। “মিস্টার রাকেশ, আপনি হয়তো জানতেন না যে ‘ডিফ-ফেক’ অডিও ধরা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। আপনি যে সফটওয়্যার দিয়ে ভয়েসটা জেনারেট করেছেন, সেটা মানুষের গলার ‘মাইক্রো-ট্রেসার’ বা স্বরযন্ত্রের কম্পন তৈরি করতে পারে না। আপনার তৈরি অডিওতে ‘শ্বাস নেওয়ার শব্দ’ বা ‘ব্রিদিং সাউন্ড’ গুলো কৃত্রিমভাবে বসানো। প্রকৃতি ওভাবে শ্বাস নেয় না।”

রাকেশের মুখ সাদা হয়ে গেল। পুলিশ তার ল্যাপটপ বাজেয়াপ্ত করতেই বেরিয়ে এল আসল সত্য। অনিমেষ বাবুকে বিষ দিয়ে মারার পর, সম্পত্তির লোভে রাকেশ এই অডিও তৈরি করেছিল যাতে সবাই ভাবে এটা আত্মহত্যা।

***

শ্রেয়া যখন আমাদের বিদায় জানাচ্ছিলেন, তার চোখে তখন কৃতজ্ঞতার জল।
“বাবা বলতেন, সত্য কখনো চাপা থাকে না। কিন্তু আজ বুঝলাম, সত্য দেখার জন্য শুধু চোখ নয়, কানও খোলা রাখতে হয়।”

গাড়িতে ফেরার পথে আমি সঙ্গীতকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, ভবিষ্যতে তো টেকনোলজি আরও উন্নত হবে। তখন কি করবি?”

সঙ্গীত জানলার বাইরে রাতের শহরের দিকে তাকিয়ে বলল, “মেশিন যতই নিখুঁত হোক রে, মানুষের অসম্পূর্ণতা, তার গলার সামান্য কাঁপা, আবেগের চড়াই-উতরাই—এগুলো কোনো অ্যালগরিদম নকল করতে পারবে না। ওটাই মানুষের সিগনেচার, ওটাই তার আত্মা। আর সত্যান্বেষীর কাজ হলো সেই আত্মার সুরটুকু খুঁজে বের করা।”

ডায়েরিটা খুললাম। নতুন কেস—’নকল স্বরের জবানবন্দি’। সমাপ্ত।

Scroll to Top