অভিশপ্ত কাকতাড়ুয়া ও মধ্যরাতের বাঁশি | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী

অভিশপ্ত কাকতাড়ুয়া ও মধ্যরাতের বাঁশি | গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ২
গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী – পর্ব ২

অভিশপ্ত কাকতাড়ুয়া ও মধ্যরাতের বাঁশি

লিখেছেন: সঙ্গীত দত্ত | স্থান: সোনাঝুরি গ্রাম, বাঁকুড়া
ভৌতিক কাকতাড়ুয়া - কাল্পনিক চিত্র

শীতের রাতে গ্রামের ধানক্ষেতগুলো কুয়াশার চাদরে মুড়ে থাকে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সাদা ধোঁয়ার সমুদ্র। সোনাঝুরি গ্রামের একপ্রান্তে, লোকালয় থেকে অনেকটা দূরে, একটি বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত রয়েছে। গ্রামবাসীরা দিনের আলোতেও ওই ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে একা হাঁটতে ভয় পায়। কারণ, ক্ষেতের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে একটি অদ্ভুত দর্শন কাকতাড়ুয়া। সাধারণ খড় আর মাটির হাড়ি দিয়ে তৈরি হলেও, এর দিকে তাকালে মনে হয় ওটা আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে। আমি, সৌভিক, ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার হিসেবে এসেছিলাম গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য লেন্সবন্দি করতে। কিন্তু কে জানত, আমার ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়বে এমন কিছু, যা প্রকৃতির নিয়মের বাইরে?

১. তিন লণ্ঠন আর পাগলা গণেশ

গ্রামের বুড়োরা বলে, ওই কাকতাড়ুয়াটা নাকি সাধারণ কোনো পুতুল নয়। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে ‘বিশু ডাকাত’ নামে এক কুখ্যাত অপরাধীকে গ্রামবাসীরা পিটিয়ে মেরে ওই ক্ষেতেই পুঁতে দিয়েছিল। তার গায়ের রক্তমাখা কুর্তাটা পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল ওই কাকতাড়ুয়াকে। সেই থেকে প্রতি অমাবস্যায় নাকি বিশুর আত্মা জেগে ওঠে।

আমি এসব গল্পে বিশ্বাস করি না। তাই বিকেলের দিকে ক্যামেরা নিয়ে সোজা চলে গিয়েছিলাম ওই ক্ষেতের আলে। কাকতাড়ুয়াটার ছবি তোলার সময় ভিউ-ফাইন্ডারে চোখ রাখতেই চমকে উঠলাম। মাটির হাড়িতে আঁকা চোখদুটো যেন নড়ে উঠল! মনের ভুল ভেবে ইগনোর করলাম। ফেরার পথে গ্রামের পাগল গণেশ আমার পথ আটকাল। সে ফিসফিস করে বলল, “বাবা, ওটা মানুষ নয়, ওটা শয়তান। রাতে ওর বাঁশি শুনলে জানলা খুলিস না। খুললেই মৃত্যু!” আমি হেসে তাকে পাশ কাটিয়ে গেস্ট হাউসে ফিরে এলাম।

২. জানলার ওপারে কে?

রাত তখন প্রায় দুটো। গেস্ট হাউসের চারপাশ শুনশান। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল এক অদ্ভুত শব্দে। মনে হলো অনেক দূর থেকে কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে। সুরটা খুব করুণ, কিন্তু তার মধ্যে একটা হিংস্রতা আছে। সুরটা ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে। কৌতূহলবশত আমি বিছানা ছেড়ে জানলার কাছে গেলাম।

বাইরে তখন ঘন কুয়াশা আর চাঁদের মরা আলো। আমার ঘর থেকে ধানক্ষেতটা প্রায় তিনশো মিটার দূরে। আমি জানলার গ্রিলে মুখ ঠেকিয়ে তাকালাম। আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। বিকেলের দেখা সেই কাকতাড়ুয়াটা এখন আর ক্ষেতের মাঝখানে নেই। সেটা এখন ক্ষেতের সীমানা পেরিয়ে গেস্ট হাউসের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে! তার দুহাত দুদিকে ছড়ানো, ঠিক যেমনটা মাঠে ছিল। কিন্তু সে নড়ছে না, হাওয়ায় তার পরনের সেই জরাজীর্ণ কুর্তাটা শুধু উড়ছে। আর সেই বাঁশির শব্দটা… ওটা কোনো বাঁশি নয়, ওটা বাতাসের শব্দ যা ওই কাকতাড়ুয়ার ফাঁপা শরীরের ভেতর দিয়ে বের হচ্ছে।

৩. লেন্সের ভেতরের বিভীষিকা

আমি কাঁপতে কাঁপতে ক্যামেরাটা বের করলাম। জুম লেন্স লাগিয়ে শিউর হতে চাইলাম ওটা সত্যিই সেই কাকতাড়ুয়া কিনা। লেন্সে ফোকাস করতেই আমি ছিটকে সরে এলাম। ওটা কোনো মাটির হাড়ি নয়! হাড়ির বদলে ওটা একটা পচা, গলিত মানুষের মুণ্ডু, যার চামড়া খসে পড়ছে। আর সেই কোটরের ভেতর দুটো জ্যান্ত চোখ জ্বলজ্বল করছে—সরাসরি আমার জানলার দিকে তাকিয়ে!

মুহূর্তের মধ্যে আমার দরজায় টোকা পড়ল। ‘ঠক… ঠক… ঠক…’। খুব ধীর, কিন্তু ভারী হাতের টোকা। বাঁশির শব্দটা থামল। দরজার ওপাশ থেকে একটা খসখসে যান্ত্রিক গলায় কেউ বলে উঠল, “ছবি তুলবি না? আমার ছবি তুলবি না?” গলার স্বরটা মানুষের নয়, শুকনো খড় ঘষলে যেমন শব্দ হয়, ঠিক তেমন। আমি পেছাতে পেছাতে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দিলাম। দরজাটা ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল…

পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা গেস্ট হাউসের দরজা খোলা পায়। সৌভিক সেখানে ছিল না। তার দামী ক্যামেরাটা মাটিতে পড়ে ছিল, আর শেষ তোলা ছবিতে দেখা যাচ্ছিল শুধু অন্ধকার আর দুটো লাল চোখ।

তবে সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো অন্য জায়গায়। গ্রামের লোকেরা যখন ধানক্ষেতে গেল, তারা দেখল কাকতাড়ুয়াটা আবার তার নিজের জায়গায় ফিরে গেছে। কিন্তু আজ তার গায়ে বিশু ডাকাতের পুরনো কুর্তাটা নেই। তার বদলে কাকতাড়ুয়াটার গায়ে পরানো আছে সৌভিকের সেই দামী ডেনিম জ্যাকেটটা, আর গলায় ঝুলছে সৌভিকের ক্যামেরার লেন্স ক্যাপ। বাতাসের দোলায় কাকতাড়ুয়াটা যেন গ্রামবাসীদের দেখে মুচকি হাসছে।

© ২০২৪ গ্রাম বাংলার ভৌতিক কাহিনী সিরিজ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
Scroll to Top