
শেষ ঘরের শব্দ
কিছু ভয় দেখানো যায় না। কারণ সেই সত্য একবার দেখলে, মানুষ আর বাঁচে না। কিছু সত্য লেখাও যায় না। কারণ লিখলেই, তা বাস্তবে পরিণত হয়। এই গল্পটা তাই লেখা উচিত ছিল না। কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
১. হাতুড়ির শব্দ
আমি আর ঘুমাই না। ঘুম মানেই ওরা আসে। চোখ বন্ধ করলেই বুঝতে পারি—আমি আর আমার শরীরের একমাত্র বাসিন্দা নই।
ডাক্তার বলেছিলেন, “আপনি স্লিপ ডিপ্রাইভেশনে হ্যালুসিনেট করছেন।”
আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “হ্যালুসিনেশন কি হাতুড়ির শব্দ করে ডাক্তার?”
সে উত্তর দেয়নি। কারণ ঠিক তখনই তার ডেস্কের নিচ থেকে শব্দটা এসেছিল।
টুক… টুক… টুক…ডাক্তার জমে গিয়েছিল। আমি জানতাম—সে-ও শুনেছে।
২. ভেতরের দেয়াল
এক রাতে হঠাৎ টের পেলাম, আমার বুকের ভেতর অসহ্য চাপ। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। হাত দিয়ে বুক চেপে ধরতেই মনে হলো… ভেতরে কিছু শক্ত জিনিস দানা বাঁধছে।
বাথরুমে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। দেখলাম, নিজের বুকের চামড়া আস্তে আস্তে ফুলে উঠছে। তারপর ফুটে উঠল খুব পাতলা একটা রেখা। যেন কেউ ভেতর থেকে নখ দিয়ে চিহ্ন এঁকেছে।
হঠাৎ সেই শব্দটা। টুক।
আমার শরীর কেঁপে উঠল। রেখাটা ফেটে গেল। কিন্তু কোনো রক্ত বেরোল না। বেরোল শুকনো কাঠের গুঁড়ো। আমি চিৎকার করতে পারিনি। কারণ তখন বুঝে গেছি—এই চিৎকারটা ওদের দরকার নেই। ওরা ঘর বানাচ্ছে।
৩. নিষিদ্ধ গ্রাম
অনলাইনে খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, অনেকেই একই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছে। একই শব্দ। একই সময়—রাত ৩:১৭। কিন্তু সব পোস্ট হঠাৎ ডিলিট হয়ে গেছে। শুধু একটা ফোরামে একজন লিখেছিল—
“ওরা প্রথমে ঘর বানায়। তারপর ঘরের মধ্যে দেয়াল। তারপর… জানালা।”
শেষ লাইনটা ছিল অসম্পূর্ণ। সেই রাতেই আমি জানালাটা অনুভব করি। আমার বুকের ভেতর দিয়ে হিমশীতল হাওয়া বইছিল। উত্তরের খোঁজে আমি আবার বৈরাগীপুরে যাই। গ্রামটা আছে, কিন্তু মানুষ নেই। সব বাড়ির দরজা খোলা। ভেতরে খাবার পচে আছে, চুলার আগুন নিভে গেছে বহুদিন আগেই।
‘শেষ ঘরে’ ঢুকেই আমি থমকে যাই। এবার কোনো ছায়া নেই, কোনো কণ্ঠ নেই। শুধু দেয়াল। আর দেয়ালের গায়ে মানুষ বসানো। পেরেক দিয়ে নয়, তারা নিজেরাই দেয়ালের অংশ হয়ে গেছে। তাদের চোখ খোলা, মুখে অদ্ভুত এক শান্তি।
একজনকে চিনতে পারলাম। সেই ডাক্তার। তার বুকটা ফাঁকা। ভেতরে ছোট্ট একটা কাঠের ঘর। সেই ঘরের ভেতর বসে আছে আরেকজন। ভালো করে তাকালাম। ওটা অন্য কেউ নয়… ওটা আমি।
৪. শেষ সিদ্ধান্ত
ওরা আমাকে শেষ সত্যটা দেখাল। শেষ ঘর কোনো আত্মার জায়গা নয়। ওটা একটা প্রক্রিয়া। মানুষ যখন খুব বেশি ভয় পায়, ভয় তার শরীর ছেড়ে যায় না। ভয় স্থায়ী কিছু চায়। তাই সে ঘর বানায়।
একজন মানুষ = একটি ঘর।
একটি ঘর = অসংখ্য ডাক।
যারা শব্দ শোনে, তারা ইট। যারা লেখে, তারা দরজা। আমি লেখক ছিলাম। এটাই আমার অপরাধ। আমাকে বলা হলো— “তুমি পুরোপুরি আমাদের হতে পারো। অথবা… অন্যদের জন্য দরজা খুলে দিতে পারো।”
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “যদি না করি?”
ওরা বলেছিল, “তাহলে তোমার ভেতরের ঘরে আমরা নিজেরাই ঢুকব।”
তাই আমি কলম তুলেছি। এই গল্প লিখছি। কারণ এখন আপনি পড়ছেন। আর পড়া মানেই— আপনি শুনছেন।
খুব হালকা। প্রায় নিজের নিঃশ্বাসের মতো।
টুক…এটা শব্দ নয়। এটা মাপ। আপনার ভেতরে ঘর বানানোর জায়গা মাপা হচ্ছে।
শেষ কথা
যদি এখনই বুকের ভেতর একটু ঠান্ডা লাগে—
অভিনন্দন।
আপনাকে নির্বাচিত করা হয়েছে।