
শূন্য ডেসিবেলের রহস্য
ভূমিকা: নিঃশব্দ বিস্ফোরণ
আমরা জানি, বন্দুকের গুলি চললে বিকট শব্দ হবেই। সাইলেন্সার ব্যবহার করলেও একটা নির্দিষ্ট মাত্রার শব্দ শোনা যায়। কিন্তু যদি এমন হয় যে, ভরদুপুরে একটি জনাকীর্ণ অডিটোরিয়ামে গুলি চলল, মানুষটি লুটিয়ে পড়ল, অথচ কেউ কোনো শব্দই শুনতে পেল না? কোনো জাদুকরের কারসাজি নয়, বরং শব্দের বিজ্ঞানের এক চরম উৎকর্ষ বা অপব্যবহার। সত্যান্বেষী সঙ্গীতের দ্বাদশ অভিযান এক ‘অ্যান্টি-সাউন্ড’ বা বিপরীত শব্দের মারণাস্ত্র নিয়ে।
শহরের বিখ্যাত সাউন্ড ল্যাব ‘অরোভিল অডিটোরিয়াম’-এ আজ নতুন অডিও সিস্টেমের ট্রায়াল ছিল। মঞ্চে ছিলেন কোম্পানির ডিরেক্টর মিস্টার সেনগুপ্ত। সামনে দর্শকাসনে প্রায় পঞ্চাশ জন ইঞ্জিনিয়ার এবং টেকনিশিয়ান। হঠাৎ মিস্টার সেনগুপ্ত বক্তৃতার মাঝখানে বুকে হাত দিয়ে লুটিয়ে পড়লেন। রক্তে ভেসে গেল মঞ্চ।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো—কেউ কোনো গুলির আওয়াজ শোনেনি। এমনকি মিস্টার সেনগুপ্তর জামায় গান-পাউডারের চিহ্ন থাকলেও, সাইলেন্সারের সেই পরিচিত ‘ফুত’ শব্দটুকুও হয়নি।
আমরা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছলাম, তখন পুলিশ লাশ সরিয়ে নিয়ে গেছে। এসিপি রাঠোর আমাকে আর সঙ্গীতকে স্টেজে নিয়ে গেলেন।
“সঙ্গীত, এটা অসম্ভব! সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে সেনগুপ্ত স্যারের ঠিক সামনে থেকে কেউ গুলি করেছে। কিন্তু স্টেজে উনি একা ছিলেন। আর শব্দের ব্যাপারটা তো আরও গোলমেলে। পঞ্চাশ জন সাক্ষী বলছে পিনপতন নিস্তব্ধতা ছিল।”
সঙ্গীত অডিটোরিয়ামের বিশাল স্পিকারগুলোর দিকে তাকাল। মঞ্চের চারদিকে প্রায় ২০টা বিশাল সাব-উফার এবং অ্যারে স্পিকার বসানো।
“আজ কি টেস্ট হচ্ছিল এসিপি সাহেব?”
“অ্যাক্টিভ নয়েজ ক্যানসেলেশন (ANC) সিস্টেমের টেস্ট। বাইরের কোলাহল যাতে অডিটোরিয়ামে না ঢোকে।”
সঙ্গীতের চোখ চকচক করে উঠল। ও সোজা সাউন্ড কনসোলের দিকে গেল। সেখানে বসে ছিলেন চিফ ইঞ্জিনিয়ার অয়নাব। ভয়ে জুবুথুবু।
“অয়নাব বাবু, সিস্টেমের লগ ফাইলটা দেখান। বিশেষ করে অ্যাক্সিডেন্টের ঠিক আগের ১০ সেকেন্ডের।”
লগ ফাইলে দেখা গেল, ঘটনার ঠিক ০.৫ সেকেন্ড আগে স্পিকারগুলো থেকে একটি অদ্ভুত হাই-পাওয়ার ফ্রিকোয়েন্সি জেনারেট হয়েছে।
সঙ্গীত বলল, “এসিপি সাহেব, খুনি কোনো সাইলেন্সার ব্যবহার করেনি। সে ব্যবহার করেছে ‘ফেস ক্যানসেলেশন’ (Phase Cancellation) বা অ্যান্টি-সাউন্ড।”
অ্যাক্টিভ নয়েজ ক্যানসেলেশন ও ফেস ক্যানসেলেশন
শব্দ হলো বাতাসের ঢেউ। যদি একটি শব্দের ঢেউয়ের ঠিক উল্টো ঢেউ (Inverted Wave) একই সময়ে তৈরি করা যায়, তবে দুটি ঢেউ একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে মিলিয়ে দেয়। একে বলে ‘Destructive Interference’। ফলাফল—সম্পূর্ণ নীরবতা বা শূন্য ডেসিবেল। নয়েজ ক্যানসেলিং হেডফোন এই প্রযুক্তিতেই কাজ করে। খুনি জানত গুলির শব্দের ফ্রিকোয়েন্সি এবং টাইমিং। সে অডিটোরিয়ামের স্পিকার হ্যাক করে গুলির শব্দের ঠিক উল্টো শব্দ (Anti-Sound) বাজিয়েছিল ঠিক সেই মুহূর্তটিতে। ফলে গুলির বিকট আওয়াজ বাতাসের মধ্যেই ‘গায়েব’ হয়ে গেছে।
“কিন্তু গুলির শব্দের ফ্রিকোয়েন্সি আগে থেকে জানা সম্ভব?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“হ্যাঁ, যদি বন্দুকটি এবং গুলিটি কাস্টম মেড হয়। এবং সিস্টেমটি যদি অটোমেটিক ট্রিগারের সাথে সিঙ্ক করা থাকে।”
সঙ্গীত মঞ্চের পোডিয়ামটা পরীক্ষা করল। সেখানে লুকানো একটি ছোট মাইক্রোফোন এবং ট্রিগার মেকানিজম পাওয়া গেল। তদন্তে বেরিয়ে এল, সেনগুপ্তের পার্টনার মিস্টার ভাটরাই এই সিস্টেম ডিজাইন করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন পারফেক্ট সাইলেন্সের ডেমোনস্ট্রেশন দিতে, কিন্তু তার আড়ালে তিনি নিজের পথের কাঁটা সরিয়ে দিলেন। তিনি জানতেন, এই ‘নিঃশব্দ মৃত্যু’ সবাই প্রযুক্তির চমক হিসেবেই দেখবে।
ভাটরা গ্রেফতার হলেন। তার ল্যাপটপে পাওয়া গেল সেই ‘অ্যান্টি-সাউন্ড’ ওয়েভ ফাইলটি।
ফেরার পথে অডিটোরিয়ামের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। শহরের কোলাহল কানে এল।
সঙ্গীত বলল, “জানিস তো, শব্দ মানুষকে মারে না, কিন্তু নিস্তব্ধতা মাঝে মাঝে বড় ভয়ংকর হয়। আজ বিজ্ঞান প্রমাণ করল, শূন্য ডেসিবেলেও মৃত্যু লুকিয়ে থাকতে পারে।”
আমার ডায়েরির দ্বাদশ পাতা পূর্ণ হলো। কেসের নাম—’শূন্য ডেসিবেলের রহস্য’। যেখানে শব্দকে হত্যা করা হয়েছে শব্দ দিয়েই।