জীবন্ত হৃদস্পন্দনের সিন্দুক – সত্যান্বেষী সঙ্গীত | বায়োমেট্রিক হ্যাকিং রহস্য

জীবন্ত হৃদস্পন্দনের সিন্দুক ফিচার ইমেজ

জীবন্ত হৃদস্পন্দনের সিন্দুক

সিরিজ: সত্যান্বেষী সঙ্গীত (পর্ব – ১১) | কলমে: সঙ্গীত দত্ত

ভূমিকা: হৃদয়ের গোপন ভাষা

মানুষের পরিচয় কি শুধু তার নামে? নাকি তার শরীরের প্রতিটি স্পন্দনে লুকিয়ে আছে তার আসল পরিচয়? বিজ্ঞান বলে, আমাদের প্রত্যেকের হৃদস্পন্দনের একটি নির্দিষ্ট ছন্দ বা ‘রিদম’ আছে, যা আঙুলের ছাপের মতোই অনন্য। এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হয়েছে ‘হার্টবিট বায়োমেট্রিক সিকিউরিটি’। কিন্তু কোনো মানুষ মারা যাওয়ার পরেও কি তার হৃদস্পন্দন দিয়ে সিন্দুক খোলা সম্ভব? নাকি প্রযুক্তির সাথে প্রতারণা করে কেউ নকল করেছে সেই স্পন্দন? সত্যান্বেষী সঙ্গীতের একাদশ গল্পে উঠে এসেছে জীবন, মৃত্যু এবং শব্দের এক অদ্ভুত সমীকরণ।

***

শহরের বিখ্যাত অ্যান্টিক সংগ্রাহক রূপম চ্যাটার্জির মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না, আবার অস্বাভাবিকও বলা যাচ্ছে না। হার্ট অ্যাটাক। বয়স হয়েছিল, হার্টের অসুখও ছিল। কিন্তু সমস্যা হলো তাঁর সিন্দুক নিয়ে।

ইন্সপেক্টর সোমনাথ যখন আমাদের ডাকলেন, তখন রাত এগারোটা। রূপম বাবুর লাইব্রেরি ঘরে আমরা তিনজন—আমি, সঙ্গীত এবং ইন্সপেক্টর। ঘরের এক কোণে একটি বিশাল স্টিলের ভল্ট।

“সমস্যাটা কি ইন্সপেক্টর?” সঙ্গীত ভল্টটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

“সমস্যা হলো টাইমিং, সঙ্গীত। ডাক্তার বলছেন রূপম বাবু মারা গেছেন সন্ধ্যা ৭টায়। সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা যাচ্ছে উনি ৭টার সময় সোফায় এলিয়ে পড়ছেন। কিন্তু এই ভল্টের ডিজিটাল লগ বলছে, ভল্টটা খোলা হয়েছে রাত ৮টা বেজে ১৫ মিনিটে। অর্থাৎ মৃত্যুর সোয়া এক ঘণ্টা পর!”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “তাতে কি? পাসওয়ার্ড বা চাবি থাকলে তো যে কেউ খুলতে পারে।”

সোমনাথ বাবু মাথা নাড়লেন। “না। এটা কোনো সাধারণ ভল্ট নয়। এটা খুলতে গেলে রূপম বাবুর হাতের রিস্টব্যান্ড সেন্সরটা টাচ করতে হয়। এই সেন্সরটা ওঁর ‘লাইভ হার্টবিট’ বা জীবন্ত হৃদস্পন্দন ডিটেক্ট করলে তবেই লক খোলে। মৃত মানুষের হৃদস্পন্দন থাকে না, তাই ওটা খোলার কথা নয়।”

সঙ্গীত ভল্টের সেন্সর প্যানেলটা খুব ভালো করে দেখল। তারপর রূপম বাবুর মৃতদেহের হাতে থাকা স্মার্ট রিস্টব্যান্ডটা পরীক্ষা করল। “হুম, এনাইক্রোনোস (Nymi) প্রযুক্তির অ্যাডভান্সড ভার্সন। এটা ইসিজি (ECG) প্যাটার্ন রিড করে।”

ঘরে উপস্থিত ছিলেন রূপম বাবুর ব্যক্তিগত ডাক্তার ডা. স্যানাল এবং ওঁর ভাইপো অয়ন। দুজনেই সন্দেহের তালিকায়। কারণ ভল্ট থেকে গায়েব হয়েছে একটি দুষ্প্রাপ্য হীরের নেকলেস।

সঙ্গীত ভল্টের লগ ফাইল থেকে অডিও ডেটা এক্সট্র্যাক্ট করতে চাইল। এই ভল্ট প্রতিবার আনলক হওয়ার সময় অথেনটিসিটির জন্য হার্টবিটের সাউন্ড ওয়েভ রেকর্ড করে রাখে।

সঙ্গীত ল্যাপটপে সেই ৮টা ১৫ মিনিটের সাউন্ড ওয়েভটা প্লে করল। “লাব-ডাব… লাব-ডাব…” নিখুঁত হৃদস্পন্দনের শব্দ।

অয়ন উত্তেজিত হয়ে বলল, “তার মানে কাকা তখন বেঁচে ছিলেন! ডাক্তার ভুল টাইম অফ ডেথ বলেছেন!”

ডা. স্যানাল ঘামতে শুরু করলেন। “অসম্ভব! আমি নিজে পালস চেক করেছি।”

সঙ্গীত একমনে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। গ্রাফটা জুম করল। তারপর মুচকি হাসল। “ডাক্তারবাবু ঠিকই বলছেন। রূপম বাবু ৭টাতেই মারা গেছেন। কিন্তু ৮টা ১৫-তে ভল্টটা যে খুলেছে, সে কোনো মানুষ নয়, একটা স্পিকার।”

“মানে?” সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল।

সঙ্গীত গ্রাফের একটা অংশ দেখিয়ে বলল, “দেখুন। একটি জীবন্ত মানুষের হৃদস্পন্দনের শব্দে সামান্য অনিয়ম বা ‘অর্গানিক নয়েজ’ থাকে। কিন্তু এই ওয়েভফর্মটা দেখুন। একদম পারফেক্ট, এবং এর শেষে একটা খুব সূক্ষ্ম ‘কোয়ান্টাইজেশন নয়েজ’ (Quantization Noise) আছে। এটা তখনই হয় যখন কোনো অ্যানালগ সিগন্যালকে ডিজিটাল অডিও ফাইলে কনভার্ট করা হয়।”

বায়োমেট্রিক সোনিফিকেশন (Biometric Sonification)

সঙ্গীত ব্যাখ্যা করল: “ইসিজি (ECG) রিপোর্ট আসলে হার্টের ইলেকট্রিকাল ইমপালস-এর একটি গ্রাফ। এই গ্রাফের ডেটাকে যদি অডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে কনভার্ট করা হয় (যাকে Sonification বলে), তবে হুবহু সেই ব্যক্তির হার্টবিটের শব্দ তৈরি করা সম্ভব। হ্যাকাররা মেডিকেল রেকর্ড হ্যাক করে ইসিজি ডেটা চুরি করে এবং সেটাকে অডিও ফাইলে রূপান্তর করে হাই-ডেফিনিশন স্পিকার বা হ্যাপ্টিক ট্রান্সডিউসার দিয়ে সেন্সরকে ধোঁকা দেয়।”

সঙ্গীত ঘুরে দাঁড়াল অয়নের দিকে। “অয়ন বাবু, আপনি তো সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন, তাই না? আপনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি জানতেন কিভাবে ইসিজি গ্রাফকে অডিওতে কনভার্ট করতে হয়। আর কাকার মেডিকেল রিপোর্ট আপনার কাছেই থাকত।”

পুলিশের জেরার মুখে অয়ন ভেঙে পড়ল। ঋণের দায়ে সে কাকার পুরনো ইসিজি রিপোর্ট ব্যবহার করে একটি ‘ফেপ হার্টবিট’ ফাইল তৈরি করেছিল। কাকা মারা যাওয়ার পর, যখন সবাই ব্যস্ত, সে ওই রিস্টব্যান্ডের সেন্সরের কাছে একটা ছোট হ্যাপ্টিক স্পিকার ধরে সেই ফাইলটা প্লে করে ভল্ট খুলেছিল।

***

কেস সলভ করে ফেরার পথে আমি বললাম, “মানুষের হৃদয়ও এখন আর নিরাপদ নয় রে। ইমোশন তো চুরি হতোই, এখন মোশনও চুরি হচ্ছে।”

সঙ্গীত আকাশের দিকে তাকাল। “যন্ত্র হৃদস্পন্দন নকল করতে পারে, কিন্তু সেই স্পন্দনের পেছনের ‘প্রাণ’টাকে নকল করতে পারে না। মেশিনের হার্টবিটে সেই ডিজিটাল নয়েজটা থেকেই যায়, যেটা বলে দেয়—আমি নকল, আমি মৃত। সত্যের সুর সব সময় অর্গানিক হয়।”

ডায়েরি বন্ধ করলাম। একাদশ কেস—’জীবন্ত হৃদস্পন্দনের সিন্দুক’। যেখানে মৃত্যু হার মেনেছে শব্দের কারসাজির কাছে।

Scroll to Top