অসীম সুরের সর্পিল ধাঁধা – সত্যান্বেষী সঙ্গীত | অডিও ইলিউশন রহস্য

অসীম সুরের সর্পিল ধাঁধা ফিচার ইমেজ

অসীম সুরের সর্পিল ধাঁধা

সিরিজ: সত্যান্বেষী সঙ্গীত (পর্ব -১৩) | কলমে: সঙ্গীত দত্ত

ভূমিকা: বিভ্রম যখন বাস্তবকে গ্রাস করে

চোখের ভুল বা অপটিক্যাল ইলউশন সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। কিন্তু কানের ভুল? শব্দ দিয়েও যে মানুষের মস্তিষ্কে এমন গোলকধাঁধা তৈরি করা যায়, যেখান থেকে বেরোনোর রাস্তা পাওয়া অসম্ভব, তা কি আপনারা জানেন? সত্যান্বেষী সঙ্গীতের একাদশ অভিযান এমন এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক রহস্য নিয়ে। যেখানে একটি সুর মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় এক অন্তহীন সিড়ি দিয়ে, যে সিড়ি শুধু ওপরেই ওঠে, কিন্তু কোথাও পৌঁছায় না।

এবারের গল্প ‘শেপার্ড টোন’ (Shepard Tone) নিয়ে—শব্দের এক মায়াবী কুহক, যা সুস্থ মানুষকেও উন্মাদ করে দিতে পারে।

***

সেদিন বিকেলে স্টুডিওতে বসে সঙ্গীত একটা গিটারের তার টিউন করছিল। কিন্তু কিছুতেই সে সন্তুষ্ট হতে পারছিল না। বারবার তারটা টাইট করছে, আবার ঢিল দিচ্ছে।

“উফ! টেনশনটা কিছুতেই মিলছে না,” সঙ্গীত বিরক্ত হয়ে গিটারটা নামিয়ে রাখল।

ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ঢুকলেন এক ভদ্রমহিলা। নাম সুজাতা মিত্র। পেশায় একজন স্থপতি। ওঁর চোখেমুখে চরম আতঙ্কের ছাপ।

“মিস্টার সেন, দয়া করে আমার স্বামীকে বাঁচান। উনি নিজেকে ঘরবন্দি করে রেখেছেন। বলছেন, উনি ফেটে যাবেন!”

আমরা অবাক হলাম। “ফেটে যাবেন মানে?”

“অনিকেত, মানে আমার স্বামী, একজন গেম ডেভেলপার। গত এক সপ্তাহ ধরে উনি একটা নতুন ‘পাজল গেম’ টেস্ট করছিলেন। গেমটার নাম ‘দ্য ইনফিনিটি লুপ’। কিন্তু গত দুদিন ধরে উনি অদ্ভুত আচরণ করছেন। বলছেন, গেমের মিউজিকটা থামছে না। ওটা ক্রমশ চড়ছে… চড়ছে… কিন্তু কিছুতেই ক্লাইমেক্সে পৌঁছাচ্ছে না। উনি বলছেন, ওঁর মাথার ভেতরের প্রেশার কুকারের মতো চাপ বাড়ছে। আর কিছুক্ষণ চললে ওঁর মাথার শিরা ছিঁড়ে যাবে।”

সঙ্গীত এক মুহূর্ত দেরি না করে উঠে দাঁড়াল। “চলুন, দেখা যাক।”

বালিগঞ্জের ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখি এক হুলুস্থুল কাণ্ড। অনিকেত বাবু স্টাডি রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে রেখেছেন। বাইরে থেকে ওঁর চিৎকার শোনা যাচ্ছে— “বন্ধ কর! সুরটা থামা! আর পারছি না!”

সঙ্গীত দরজায় কান পাতল। ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত মিউজিক ভেসে আসছে। খুব ধীর লয়ের সিন্থেসাইজার সাউন্ড। শুনলে মনে হচ্ছে সুরটা ক্রমাগত স্কেলের ওপরের দিকে উঠছে। দো… রে… মি… ফা… কিন্তু সারেগামাপা শেষ হচ্ছে না। সুরটা চড়ছে তো চড়ছেই। আমিও কেমন একটা অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করতে শুরু করল। মনে হচ্ছে এখনই ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটবে, কিন্তু ঘটছে না।

“দরজাটা ভাঙতে হবে!” আমি বললাম।

কিন্তু সঙ্গীত আমাকে থামাল। “না। জোর করে ঢুকলে উনি প্যানিক অ্যাটাকে হার্ট ফেইল করতে পারেন। আগে সাউন্ড সিস্টেমটা হ্যাক করতে হবে।”

সঙ্গীত সুজাতা দেবীর কাছ থেকে বাড়ির ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ড নিল। ল্যাপটপ খুলে দ্রুত হাতে টাইপ করতে লাগল। অনিকেত বাবুর স্মার্ট হোম স্পিকারের সাথে কানেক্ট করার চেষ্টা করছে ও।

“পেয়েছি! গেমটা ক্লাউড সার্ভার থেকে চলছে। আমি অডিও স্ট্রিমটা কাটছি।”

এন্টার বোতামে চাপ দিতেই স্টাডি রুমের সেই অদ্ভুত সুরটা থেমে গেল। এক লহমায় যেন ফ্ল্যাটের বাতাস হালকা হয়ে গেল। একটু পরেই দরজা খুলে টলতে টলতে বেরিয়ে এলেন অনিকেত বাবু। ঘামে ভিজে একাকার।

ওঁকে জল খাইয়ে শান্ত করার পর সঙ্গীত গেমের অডিও ফাইলটা বিশ্লেষণ করতে বসল।

“অনিকেত বাবু, আপনি কি ‘শেপার্ড টোন’-এর নাম শুনেছেন?” সঙ্গীত জিজ্ঞেস করল।

অনিকেত বাবু মাথা নাড়লেন। “না।”

“এই গেমের মিউজিক ডিরেক্টর আপনার সাথে এক নিষ্ঠুর খেলা খেলেছে। সে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরে ‘শেপার্ড টোন’ ব্যবহার করেছে।”

শেপার্ড টোন (Shepard Tone)

সঙ্গীত গ্রাফ দেখিয়ে বোঝাল: “এটি একটি অডিটরি ইলউশন বা শব্দের বিভ্রম। এখানে তিনটি আলাদা অক্টেভের সাইন ওয়েভ (Sine wave) একসাথে বাজানো হয়। যখন একটি সুর পিচের ওপরের দিকে ওঠে, তখন অন্যটি নিচ থেকে শুরু হয়। আমাদের মস্তিষ্ক শুধু ওপরের দিকে ওঠা সুরটাকেই ফোকাস করে। ফলে মনে হয় সুরটা অনন্তকাল ধরে চড়ছে, কিন্তু বাস্তবে তা একই ফ্রিকোয়েন্সিতে ঘুরপাক খায়। সিনেমার পরিচালকরা টেনশন তৈরি করতে এটা ব্যবহার করেন। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ এটা শুনলে মানুষের ব্রেন ‘রেজোলিউশন’ বা সমাপ্তি না পেয়ে চরম উৎকণ্ঠায় (Anxiety) ভুগতে শুরু করে।”

“কিন্তু কেন করবে এমন?” সুজাতা দেবী প্রশ্ন করলেন।

তদন্তে জানা গেল, অনিকেত বাবুর কোম্পানির এক প্রাক্তন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার, যাকে অনিকেত বাবু ছাঁটাই করেছিলেন, প্রতিশোধ নিতেই গেমের কোডে এই ‘অডিও লুপ’ ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল অনিকেত বাবুকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলা।

সেই ইঞ্জিনিয়ারকে গ্রেফতার করা হলো। অনিকেত বাবু এখন সুস্থ, কিন্তু তিনি আর কানে হেডফোন লাগাতে ভয় পান।

***

রাতে ফেরার পথে আমি সঙ্গীতকে বললাম, “মানুষের মন কত ঠুনকো, তাই না? সামান্য একটা আওয়াজ তাকে পাগল করে দিতে পারে।”

সঙ্গীত গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বলল, “মন ঠুনকো নয় রে, মন জটিল। আমাদের মস্তিষ্ক সবসময় প্যাটার্ন খোঁজে, সমাপ্তি খোঁজে। যখন সে সেটা পায় না, তখন সে ছটফট করে। জীবনের সুর হোক বা গানের সুর—সব কিছুরই একটা ‘সম’ বা শেষ থাকা দরকার। যেখানে শেষ নেই, সেখানেই গোলকধাঁধা।”

ডায়েরিতে লিখলাম ত্রেয়দশ কেস—’অসীম সুরের সর্পিল ধাঁধা’। সুর যেখানে শেষ হয় না, সেখান থেকেই শুরু হয় বিভ্রম।

Scroll to Top