
নিষিদ্ধ তরঙ্গের মায়াজাল
ভূমিকা: কানের ভেতর দিয়ে মস্তিষ্কের দখল
আমরা গান শুনি মন ভালো করার জন্য। কিন্তু সেই গানই যদি আপনার মনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়? সত্যান্বেষী সঙ্গীতের চতুর্থ কেস এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক রহস্য নিয়ে। শহরে হঠাৎ করে বেড়েছে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ঘুমের ঘোরে হাঁটার প্রবণতা বা ‘স্লিপওয়াকিং’। আপাতদৃষ্টিতে এটি কোনো অসুখ মনে হলেও, সঙ্গীত সেন খুঁজে পেল এর পেছনে লুকিয়ে থাকা এক ভয়ঙ্কর ডিজিটাল ষড়যন্ত্র।
এবারের গল্প ‘বাইনরাল বিটস’ (Binaural Beats) বা ডিজিটাল ড্রাগ নিয়ে। যেখানে কোনো ইনজেকশন বা ওষুধ নয়, কেবল একটি নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ দিয়েই মানুষকে দাবার ঘুঁটির মতো চালনা করা সম্ভব।
রাত তখন প্রায় দুটো। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। আমি আর সঙ্গীত স্টুডিওতে বসে পুরনো একটা স্পুল রেকর্ডার সারাই করছিলাম। হঠাৎ সঙ্গীতের মোবাইলটা বেজে উঠল। অবেলায় ফোন দেখে সঙ্গীত একটু অবাক হলো। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে এক আর্তনাদ শোনা গেল।
“সঙ্গীত বাবু! দয়া করে আমার ছেলেকে বাঁচান! ও ছাদ থেকে লাফ দিতে যাচ্ছে!”
ফোনটা করেছিলেন মিসেস রায়, আমাদের পাড়ারই এক ভদ্রমহিলা। আমরা এক মুহূর্ত দেরি না করে রেইনকোট চাপিয়ে দৌড় দিলাম। ওদের বাড়িটা কাছেই।
গিয়ে দেখি এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য। তিনতলার কার্নিশে দাঁড়িয়ে আছে বছর সতেরোর ছেলে আয়ন। চোখ দুটো খোলা, কিন্তু দৃষ্টি ঘোলাটে। সে বৃষ্টির মধ্যে ভিজছে, কিন্তু কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কানে একটা ব্লুটুথ হেডফোন। মিসেস রায় আর তাঁর স্বামী নিচে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছেন, কিন্তু আয়ন যেন অন্য জগতে।
সঙ্গীত আমাকে ইশারা করল নিচে থাকতে। ও খুব সাবধানে পাইপ বেয়ে উঠে গেল। আয়ন ঠিক লাফ দেওয়ার জন্য যেই পা বাড়িয়েছে, সঙ্গীত এক ঝটকায় ওকে জাপটে ধরে ছাদের দিকে টেনে নিল। ধস্তাধস্তির সময় আয়নের কান থেকে হেডফোনটা ছিটকে পড়ল। আর অদ্ভুত ব্যাপার, হেডফোন খোলার সাথে সাথেই আয়ন জ্ঞান হারাল।
পরদিন সকালে। আয়ন এখন সুস্থ, কিন্তু কাল রাতের কোনো স্মৃতি ওর মনে নেই। সঙ্গীত ওর সেই হেডফোন আর মোবাইলটা নিয়ে স্টুডিওতে বসে আছে সকাল থেকে। আমি কফি নিয়ে ঢুকলাম।
“কি রে, কিছু পেলি? ছেলেটা কি কোনো নেশা করত?”
সঙ্গীত কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, “নেশা তো বটেই, তবে মদের নেশা নয়। একে বলে ‘ডিজিটাল ড্রাগ’ বা ‘ই-ডোজিং’।”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম। “সেটা আবার কি?”
সঙ্গীত ল্যাপটপের স্ক্রিনটা আমার দিকে ঘুরিয়ে দিল। “আয়ন কাল রাতে একটা অ্যাপ ব্যবহার করছিল, নাম ‘ডিপ স্লিপ মেডিটেশন’। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে বৃষ্টির শব্দ বা রিলাক্সিং মিউজিক। কিন্তু আমি যখন ওয়েভফর্ম বিশ্লেষণ করলাম, দেখলাম এর মধ্যে লুকিয়ে আছে ‘বাইনরাল বিটস’।”
বাইনরাল বিটস কী?
সঙ্গীত বোঝাল, “যখন দুই কানে দুটি ভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ শোনানো হয়, তখন মস্তিষ্ক সেই দুই শব্দের পার্থক্য মেটানোর জন্য একটি তৃতীয় কাল্পনিক শব্দ তৈরি করে। ধর, বাম কানে ৪০০ হার্টজ আর ডান কানে ৪১০ হার্টজ বাজানো হলো। ব্রেন তখন ১০ হার্টজের একটা বিট তৈরি করবে। এই ১০ হার্টজ হলো ‘আলফা ওয়েভ’, যা মানুষকে হিপনোটিক বা আচ্ছন্ন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে।”
“কিন্তু এতে ছাদ থেকে লাফ দেওয়ার কি সম্পর্ক?” আমি জানতে চাইলাম।
সঙ্গীত গম্ভীর হয়ে বলল, “সাধারণ বাইনরাল বিট ক্ষতি করে না। কিন্তু এই অ্যাপটাতে এমন একটি নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করা হয়েছে যা মানুষের মস্তিষ্কের ‘ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ বা বিচার-বিবেচনার অংশকে অবশ করে দেয় এবং ‘মোটর কর্টেক্স’ বা চলাফেরার অংশকে সক্রিয় রাখে। একে বলা হয় ‘প্যারাডক্সিক্যাল স্লিপ’। এর সাথে সাবলিমিনাল মেসেজ বা অবচেতন মনের নির্দেশ জুড়ে দেওয়া ছিল—’উড়ে যাও’, ‘মুক্ত হও’।”
তদন্তে নামল সঙ্গীত। অ্যাপটির আইপি অ্যাড্রেস ট্রেস করে জানা গেল, এর সার্ভার শহরেরই এক পরিত্যক্ত সাইবার ক্যাফে থেকে অপারেট করা হচ্ছে। পুলিশ নিয়ে আমরা সেখানে হানা দিলাম।
সেখানে পাওয়া গেল এক ধুরন্ধর হ্যাকারকে, নাম রনি। জেরার মুখে সে স্বীকার করল, এটা ছিল একটা ডার্ক ওয়েব চ্যালেঞ্জ। কে কতজন কিশোর-কিশোরীকে দিয়ে অদ্ভুত কাজ করাতে পারে, তার ওপর বাজি ধরা হতো। লক্ষ লক্ষ টাকার বিটকয়েনের খেলা।
রনি গ্রেফতার হলো। কিন্তু সঙ্গীতের মুখ ভার। ফেরার পথে আমি বললাম, “কি হলো? কেস তো সলভড।”
সঙ্গীত বলল, “রনি তো শুধু দাবার ঘুঁটি। এই ফ্রিকোয়েন্সি ডিজাইন করার ক্ষমতা ওর নেই। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো বড় নিউরো-সায়েন্টিস্ট আছে, যে মানুষের মস্তিষ্ক হ্যাক করতে চায়। আজ আমরা আয়নকে বাঁচিয়েছি, কিন্তু প্লে-স্টোরে এমন হাজারটা অ্যাপ আছে। মানুষ যতক্ষণ না বুঝবে যে কান দিয়েও বিষ ঢোকে, ততক্ষণ এই বিপদ কাটবে না।”
রাতে বাড়ি ফিরে হেডফোনটা কানে দিতে গিয়েও থমকে গেলাম। মনে পড়ে গেল সঙ্গীতের কথা— “নিষিদ্ধ তরঙ্গের মায়াজাল বড় ভয়ঙ্কর।” হেডফোনটা নামিয়ে রাখলাম। বাইরে বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে। সত্যিকারের বৃষ্টির শব্দ।