
নির্বাক আদেশের রহস্য
ভূমিকা: দেয়ালেরও কান আছে, এখন তা সত্যি
আমরা বলি ‘দেয়ালের কান আছে’, কিন্তু এখন দেয়াল শুধু শোনে না, কথাও বলে। আমাদের আধুনিক জীবনযাপনে ‘স্মার্ট হোম’ এক নতুন সংযোজন। যেখানে আলো, পাখা, এমনকি দরজার তালাও খোলে আমাদের গলার আওয়াজে। কিন্তু এই প্রযুক্তিই যদি আপনার শত্রুতে পরিণত হয়? সত্যান্বেষী সঙ্গীতের ষষ্ঠ অভিযান এমন এক রহস্যময় চুরির ঘটনা নিয়ে, যেখানে চোর কোনো শব্দ না করেই, বাড়ির মালিকের নিজের গলা ব্যবহার করে সিন্দুক খুলেছে। অথচ মালিক তখন গভীর ঘুমে।
শব্দহীন শব্দের মারণাস্ত্র আর ‘আল্ট্রাসাউন্ড’-এর এক অদ্ভুত মায়াজাল নিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের গল্প—’নির্বাক আদেশের রহস্য’ (The Mystery of Silent Command)।
নিউ টাউনের বিলাসবহুল আবাসন ‘স্কাই ভিউ’-এর পেন্টহাউসে যখন আমরা পৌঁছলাম, তখন সকাল দশটা। বাড়ির মালিক, বিখ্যাত সফটওয়্যার ডেভেলপার মিস্টার অনিকেত বসু, সোফায় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। ঘরটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে মোড়া। কোনো সুইচবোর্ড নেই, সব কিছুই ভয়েস কন্ট্রোলড।
“মিস্টার সেন, আমি শেষ হয়ে গেলাম! আমার সারা জীবনের গবেষণার ব্লু-প্রিন্ট চুরি হয়ে গেছে।” অনিকেত বাবু কান্নাজড়িত গলায় বললেন।
সঙ্গীত ঘরটা ভালো করে দেখছিল। “আপনার সিন্দুকটা কোথায়?”
“আমার স্টাডি রুমে। ওটা কোনো সাধারণ সিন্দুক নয়। ওটা খুলতে গেলে আমার ভয়েস কমান্ড লাগে এবং একটা নির্দিষ্ট পাসফ্রেজ বলতে হয়—’ওপেন সিসেম প্রজেক্ট আলফা’। কিন্তু কাল রাতে আমি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছিলাম। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে রাত ৩টেয় সিন্দুকটা নিজে থেকেই খুলে যাচ্ছে! অথচ ঘরে কেউ নেই!”
সঙ্গীত স্টাডি রুমে ঢুকল। টেবিলের ওপর একটা গোলাকার স্মার্ট স্পিকার রাখা। এটাই বাড়ির মূল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র বা ‘স্মার্ট হাব’। সঙ্গীত সিসিটিভি ফুটেজটা চাইল।
ফুটেজে দেখা গেল, রাত ৩টে বেজে ৫ মিনিট। ঘর অন্ধকার। হঠাৎ স্মার্ট স্পিকারের নীল আলো জ্বলে উঠল, যেন সে কারোর নির্দেশ শুনছে। তারপরই যান্ত্রিক স্বরে বলল, “ভয়েস ম্যাচ কনফার্মড। আনলকিং সেফ।” আর সাথে সাথেই সিন্দুকের দরজা খুলে গেল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ফুটেজে কোনো মানুষের গলা শোনা গেল না!
আমি অবাক হয়ে বললাম, “এ তো ভূতুড়ে ব্যাপার! অনিকেত বাবু কথা বললেন না, অথচ স্পিকার ওঁর গলা শুনল?”
সঙ্গীত স্মার্ট স্পিকারটা হাতে তুলে নিল। “ভূত নয় রে, বিজ্ঞান। অনিকেত বাবু, আপনার জানলাটা কি কাল রাতে খোলা ছিল?”
“একটু ফাঁক করা ছিল হাওয়ার জন্য। কেন?”
সঙ্গীত জানলার কাছে গেল। জানলা থেকে উল্টো দিকের ফ্ল্যাটের দূরত্ব খুব বেশি নয়। ও পকেট থেকে একটা লেজার পয়েন্টার বের করে দূরত্বটা মাপল। তারপর হাসল।
“কেসটা ইন্টারেস্টিং। চোর ঘরে ঢোকেনি, চোর কোনো শব্দও করেনি যা মানুষের কানে শোনা যায়। সে ব্যবহার করেছে ‘ডলফিন অ্যাটাক’।”
ডলফিন অ্যাটাক (Dolphin Attack)
সঙ্গীত ব্যাখ্যা করল: “মানুষের কান ২০ কিলোহার্টজের ওপরের শব্দ বা আল্ট্রাসাউন্ড শুনতে পায় না। কিন্তু স্মার্ট স্পিকারের মাইক্রোফোন তা পারে। হ্যাকাররা ভয়েস কমান্ডকে আল্ট্রাসাউন্ড ফ্রিকোয়েন্সিতে কনভার্ট করে। এরপর লেজার বিম বা হাই-পাওয়ার স্পিকার দিয়ে দূর থেকে সেই ‘নীরব আদেশ’ স্মার্ট ডিভাইসে পাঠায়। মানুষের কানে তা পিনপতন নিস্তব্ধতা, কিন্তু মেশিনের কাছে তা স্পষ্ট নির্দেশ।”
অনিকেত বাবু আকাশ থেকে পড়লেন। “তার মানে কেউ বাইরে থেকে আমার স্পিকারে কমান্ড পাঠিয়েছে? কিন্তু আমার গলা নকল করল কি করে?”
“আপনার গলা নকল করার দরকার নেই। আপনার কোনো পুরনো ভয়েস রেকর্ডিং বা ইন্টারভিউ থেকে ‘ওপেন’, ‘প্রজেক্ট’—এই শব্দগুলো কেটে জোড়া লাগিয়ে সিন্থেসাইজ করা হয়েছে। তারপর সেটা আল্ট্রাসাউন্ডে কনভার্ট করে জানলা দিয়ে বিম করা হয়েছে।”
সঙ্গীত এবার জানলার বাইরের কার্নিশটা পরীক্ষা করল। সেখানে সামান্য পোড়া দাগ। “এখানেই ট্রান্সমিটারটা বসানো হয়েছিল। অনিকেত বাবু, আপনার কোম্পানিতে সম্প্রতি কাকে ছাঁটাই করেছেন?”
অনিকেত বাবু চমকে উঠলেন। “রবিকান্ত! ও আমার চিফ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ছিল। আমি ওকে গত সপ্তাহে বের করে দিই কারণ ও প্রজেক্টের তথ্য পাচার করছিল।”
পুলিশ যখন রবিকান্তের ফ্ল্যাটে হানা দিল, তখন সে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তার ল্যাপটপে পাওয়া গেল সেই আল্ট্রাসাউন্ড ফাইলগুলো এবং চুরি যাওয়া ব্লু-প্রিন্ট।
ফেরার পথে আমি সঙ্গীতকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, প্রযুক্তির এত উন্নতি কি ভালো, না খারাপ?”
সঙ্গীত জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল, “আগুন দিয়ে রান্নাও হয়, আবার ঘরও পোড়ে। প্রযুক্তিও তাই। স্মার্ট হোম আমাদের জীবন সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের গোপনীয়তার দেয়ালটাও কাঁচের মতো স্বচ্ছ করে দিয়েছে। যে কেউ সঠিক ফ্রিকোয়েন্সি জানলে সেই কাঁচ ভেঙে ফেলতে পারে। সত্যান্বেষীর কাজ হলো সেই ফ্রিকোয়েন্সির উৎস খুঁজে বের করা।”
আমি নোটবুক বন্ধ করলাম। ষষ্ঠ কেস—’নির্বাক আদেশের রহস্য’। মানুষ যখন নীরব থাকে, তখনও তার প্রযুক্তি কথা বলে—আর সেটাই তার পতনের কারণ হতে পারে।