কিবোর্ডের গোপন প্রতিধ্বনি – সত্যান্বেষী সঙ্গীত |

কিবোর্ডের গোপন প্রতিধ্বনি ফিচার ইমেজ

কিবোর্ডের গোপন প্রতিধ্বনি

সিরিজ: সত্যান্বেষী সঙ্গীত (পর্ব – ৮) | কলমে: সঙ্গীত দত্ত

ভূমিকা: প্রতিটি অক্ষরের নিজস্ব সুর আছে

আমরা যখন কম্পিউটারে টাইপ করি, তখন ভাবি আমরা শুধু শব্দ লিখছি। কিন্তু সত্যান্বেষী সঙ্গীত জানে, প্রতিটি কি-স্ট্রোকের (Key-stroke) নিজস্ব একটা সুর আছে, একটা আলাদা সিগনেচার আছে। আধুনিক সাইবার অপরাধীরা এখন আর পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করতে ব্রুট-ফোর্স অ্যাটাক করে না, তারা শুধু কান পেতে শোনে।

সত্যান্বেষী সঙ্গীতের অষ্টম গল্পে আমরা মুখোমুখি হব এক অভিনব হ্যাকিং কৌশলের, যার নাম ‘অ্যাকোস্টিক কি-লগিং’ (Acoustic Keylogging)। যেখানে ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই, শুধুমাত্র টাইপিং-এর খটখট শব্দ বিশ্লেষণ করে চুরি করা হচ্ছে রাষ্ট্রের অতি গোপনীয় তথ্য।

***

বিখ্যাত ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট রূপক দাশ যখন আমাদের স্টুডিওতে এলেন, তখন তাঁকে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। গত এক সপ্তাহ ধরে তিনি একটি বড় কেলেঙ্কারির এক্সপোজ লিখছেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তিনি যা লিখছেন, তা ছাপার আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় লিক হয়ে যাচ্ছে।

“সঙ্গীত বাবু, আমি পাগল হয়ে যাব! আমি ইন্টারনেট ব্যবহার করছি না। আমি একটা পুরনো আমলের অফলাইন ডেস্কটপ কম্পিউটারে লিখছি, যাতে কোনো ওয়াই-ফাই বা ব্লুটুথ কার্ড নেই। পেনড্রাইভও লাগাই না। তবুও আমার লেখাগুলো হুবহু লিক হচ্ছে কি করে?” রূপক বাবু হতাশ হয়ে বললেন।

সঙ্গীত ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “আপনার ঘরে সিসিটিভি বা আড়ি পাতার যন্ত্র নেই তো?”

“অসম্ভব! আমি রোজ ডিটেক্টর দিয়ে চেক করি। কোনো ক্যামেরা বা মাইক্রোফোন নেই।”

সঙ্গীত বলল, “চলুন, আপনার ওয়ার্ক-স্টেশনটা একবার দেখা যাক।”

রূপক বাবুর বাড়ি সল্টলেকের এক নিরিবিলি পাড়ায়। তাঁর স্টাডি রুমটা চারতলায়। ঘরে ঢুকে দেখলাম সত্যিই নিরাপত্তার কড়াকড়ি। কম্পিউটারটি পুরনো, ইন্টারনেটের তার নেই। জানলাগুলো মোটা পর্দা দিয়ে ঢাকা।

সঙ্গীতের চোখ পড়ল কম্পিউটারের কিবোর্ডটার দিকে। একটা দামী, ভারী ‘মেকানিক্যাল কিবোর্ড’ (Mechanical Keyboard)।

“বাঃ! খুব সুন্দর কিবোর্ড। ব্লু-সুইচ মনে হচ্ছে?” সঙ্গীত কিবোর্ডটায় কয়েকটা চাপ দিয়ে বলল। ঘরটা নিস্তব্ধ বলে ‘খট-খট’ শব্দটা বেশ জোরেই হলো।

রূপক বাবু হাসলেন, “হ্যাঁ, টাইপরাইটারের মতো শব্দ হয় বলে এটা আমার খুব প্রিয়। লিখতে ফিল পাওয়া যায়।”

সঙ্গীত ঘরটা ভালো করে স্ক্যান করল। কিছুই পাওয়া গেল না। তারপর সে রূপক বাবুকে বলল, “আপনি যখন কাজ করেন, তখন আপনার মোবাইল ফোনটা কোথায় থাকে?”

“কেন? টেবিলেই থাকে। কিন্তু আমি তো ফ্লাইট মোড অন করে রাখি না, তবে ডেটা অফ থাকে। আর ফোনটা তো লক করাই থাকে।”

সঙ্গীত রূপক বাবুর ফোনটা হাতে নিল। “আপনার ফোনে কি এমন কোনো অ্যাপ আছে যা আপনি সম্প্রতি ইন্সটল করেছেন? ধরুন কোনো টর্চ লাইট অ্যাপ বা ক্যালকুলেটর?”

রূপক বাবু ভাবলেন। “হ্যাঁ, একটা ‘ভয়েস নোট’ অ্যাপ নামিয়েছিলাম ইন্টারভিউ রেকর্ড করার জন্য।”

সঙ্গীত ল্যাপটপ বের করে ফোনটা কানেক্ট করল। কয়েক মিনিট পর ওর মুখে হাসি ফুটল।

“রূপক বাবু, চোর আপনার কম্পিউটারে নেই, আপনার টেবিলে শুয়ে আছে। এবং সে আপনার পাসওয়ার্ড দেখেনি, শুনেছে।”

আমরা অবাক হয়ে তাকালাম। সঙ্গীত ব্যাখ্যা শুরু করল।

“এটাকে বলে ‘অ্যাকোস্টিক সাইড-চ্যানেল অ্যাটাক’। আপনার এই মেকানিক্যাল কিবোর্ডের প্রতিটি ‘কি’ (Key) বা বোতাম টেপা হলে সামান্য আলাদা শব্দ হয়। ‘A’ বোতামের শব্দের সাথে ‘Q’ বোতামের শব্দের মাইক্রোস্কোপিক পার্থক্য আছে। আপনার ফোনের ওই ম্যালওয়্যার যুক্ত অ্যাপটা ব্যাকগ্রাউন্ডে মাইক্রোফোন অন করে রাখত। সে আপনার টাইপিংয়ের ওই ‘খট-খট’ শব্দ রেকর্ড করে সার্ভারে পাঠাত। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ওই শব্দ বিশ্লেষণ করে টেক্সট তৈরি করে নিত।”

অ্যাকোস্টিক কি-লগিং (Acoustic Keylogging)

গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্টফোন বা স্মার্ট স্পিকারের মাইক্রোফোন ব্যবহার করে ৯৫% নির্ভুলতার সাথে টাইপিং ডিকোড করা সম্ভব। বিশেষ করে মেকানিক্যাল কিবোর্ডের শব্দ অনেক বেশি স্পষ্ট এবং প্রতিটি সুইচের মেকানিজম বা স্প্রিং-এর শব্দ আলাদা হয়, যা সাধারণ কানে এক মনে হলেও কম্পিউটারের কাছে আলাদা নোটের মতো। একেই হ্যাকাররা কাজে লাগায়।

রূপক বাবু বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। “তার মানে আমার প্রিয় কিবোর্ডের শব্দই আমার শত্রু হলো?”

“ঠিক তাই। এবং আপনার ফোনটা টেবিলের ওপর থাকায়, শব্দটা খুব স্পষ্টভাবে রেকর্ড হয়েছে। হ্যাকাররা আপনার স্ক্রিন দেখার প্রয়োজনই মনে করেনি।”

সঙ্গীতের বুদ্ধিতে সেই ম্যালওয়্যার অ্যাপের সোর্স ট্রেস করে জানা গেল, রূপক বাবুর প্রতিদ্বন্দ্বী এক মিডিয়া হাউস এই অ্যাপটি কৌশলে ওঁর ফোনে ইন্সটল করিয়েছিল।

***

স্টুডিওতে ফিরে আমি নিজের ল্যাপটপের দিকে তাকালাম। মেমব্রেন কিবোর্ড, শব্দ হয় না বললেই চলে।
সঙ্গীত আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, “ভয় নেই, সাইলেন্ট কিবোর্ডে এই হ্যাকিং কঠিন। তবে মনে রাখবি, শব্দ যেখানে আছে, তথ্য সেখানেও আছে। আজকের দিনে দেয়ালের কান নয়, বাতাসেরও স্মৃতিশক্তি আছে।”

আমি নোটবুক খুললাম। অষ্টম কেস—’কিবোর্ডের গোপন প্রতিধ্বনি’। যেখানে শব্দই হলো চাবি, আবার শব্দই হলো চোর।

Scroll to Top