মৃত জোনাকির গান – সত্যান্বেষী সঙ্গীত | ডিপফেক অডিও রহস্য

মৃত জোনাকির গান ফিচার ইমেজ

মৃত জোনাকির গান

সিরিজ: সত্যান্বেষী সঙ্গীত (পর্ব – ১৪) | কলমে: সঙ্গীত দত্ত

ভূমিকা: বিশ্বাস যখন অবিশ্বাসের কারণ

একজন মায়ের কাছে সন্তানের গলার স্বর, কিংবা প্রেমিকের কাছে প্রেমিকার কন্ঠস্বর—পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত শব্দ। আমরা চোখ বন্ধ করে শুধু কন্ঠস্বর শুনেই বলে দিতে পারি মানুষটি কে। কিন্তু যদি বিজ্ঞান সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরায়? যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মৃত মানুষের কন্ঠ হুবহু ফিরিয়ে আনে? সত্যান্বেষী সঙ্গীতের চতুর্দশ গল্পে উন্মোচিত হবে ‘ডিপফেক অডিও’ (Deepfake Audio)-র এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র, যেখানে এক মৃত গায়িকা ফোন করে গান শোনায় তার স্বামীকে।

***

জনপ্রিয় ফোক গায়িকা জোনাকি দেবনাথ মারা গেছেন প্রায় এক বছর হলো। রোড অ্যাক্সিডেন্ট। তাঁর স্বামী, মিউজিক ডিরেক্টর অনিন্দ্য সেন, শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি অনিন্দ্য বাবু পাগল হওয়ার উপক্রম।

আমাদের স্টুডিওতে যখন তিনি এলেন, তাঁর চোখ বসে গেছে। তিনি কাঁপাকাঁপা হাতে তাঁর ফোনটা সঙ্গীতের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।

“শুনুন সঙ্গীত বাবু। জোনাকি আমাকে ফোন করছে। গত তিন দিন ধরে, ঠিক রাত বারোটায়।”

সঙ্গীত ভ্রু কুঁচকে কল রেকর্ডটা প্লে করল। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এল এক মায়াবী কন্ঠস্বর।

“অনিন্দ্য… কেন তুমি আমার শেষ গানটা রিলিজ করছ না? আমি কষ্ট পাচ্ছি… রিলিজ করে দাও…” তারপরই সেই চেনা সুরে গুনগুন করে গান।

আমি শিউরে উঠলাম। জোনাকির গান আমি প্রচুর শুনেছি। এই গলা অবিকল জোনাকির। সেই একই টান, একই আবেগ।

“কিন্তু স্যার, জোনাকি তো মারা গেছে! এটা নিশ্চয়ই কোনো প্র্যাঙ্ক?” আমি বললাম।

অনিন্দ্য বাবু মাথা নাড়লেন। “আমিও তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু এই গানটা… এই গানটা জোনাকি অ্যাক্সিডেন্টের আগের রাতে সুর করেছিল। লিরিক্সটা শুধু ও আর আমি জানতাম। ওটা কোথাও রেকর্ড করা হয়নি। কোনো ডায়েরিতেও লেখা ছিল না। তাহলে অন্য কেউ জানবে কি করে?”

রহস্যটা বেশ জটিল। রেকর্ড করা হয়নি, অথচ মৃত গায়িকার গলায় সেই নতুন গান বাজছে! সঙ্গীত ফোনটা নিয়ে বলল, “আমি অডিও ফাইলটা অ্যানালিসিস করব।”

ল্যাবে ফিরে সঙ্গীত স্পেকট্রোগ্রাম (Spectrogram) সফটওয়্যারে অডিওটা ফেলল। শব্দের তরঙ্গগুলো স্ক্রিনে ভেসে উঠল। সঙ্গীত খুব মনোযোগ দিয়ে হেডফোন কানে গুঁজে শুনতে লাগল।

এক ঘণ্টা পর সঙ্গীত হাসল। “অনিন্দ্য বাবু, ভূত নেই। আছে কম্পিউটার।”

“মানে?”

“এটা ‘এআই ভয়েস ক্লোনিং’ বা ‘অডিও ডিপফেক’। জোনাকি দেবীর পুরনো শত শত গানের ইন্টারভিউ এবং রেকর্ডিং থেকে ডেটা নিয়ে এআই (AI) মডেলকে শেখানো হয়েছে ওঁর কথা বলার ভঙ্গি।”

“কিন্তু লিরিক্স? সুর? সেটা এআই জানল কি করে?” অনিন্দ্য বাবু অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন।

সঙ্গীত বলল, “সেটাই আসল প্রশ্ন। আপনার ঘরে এমন কেউ আছে যে ওই সুরটা শুনেছিল। আচ্ছা, আপনাদের বাড়িতে স্মার্ট স্পিকার বা অ্যালেক্সা জাতীয় কিছু আছে?”

অনিন্দ্য বাবু জানালেন, হ্যাঁ, তাঁদের বেডরুমে একটা স্মার্ট স্পিকার আছে।

তদন্তে জানা গেল, জোনাকির মৃত্যুর আগের রাতে যখন তাঁরা গানটা প্র্যাকটিস করছিলেন, স্মার্ট স্পিকারটি অ্যাক্টিভ ছিল এবং সেই সেশনটি ক্লাউডে রেকর্ড হয়েছিল। অনিন্দ্য বাবুর সহকারী, প্রীতম, যিনি টেকনোলজিতে এক্সপার্ট, ওই ক্লাউড অ্যাকাউন্ট হ্যাক করেন। তিনি জানতেন জোনাকির শেষ অ্যালবাম রিলিজ হলে কোটি টাকার ব্যবসা হবে। কিন্তু অনিন্দ্য বাবু আবেগের কারণে সেটা আটকাচ্ছিলেন। তাই প্রীতম এআই ব্যবহার করে জোনাকির গলায় এই ভুতুড়ে ফোন কল তৈরি করেন যাতে অনিন্দ্য বাবু ভয় পেয়ে গানটা রিলিজ করে দেন।

সঙ্গীতের প্রমাণ ছিল অকাট্য।

“দেখুন অনিন্দ্য বাবু,” সঙ্গীত স্ক্রিনে একটা গ্রাফ দেখাল। “মানুষ যখন কথা বলে বা গান গায়, তখন মাঝেমধ্যে শ্বাস নেয়। এই শ্বাসের শব্দের একটা ন্যাচারাল রিদম থাকে। এআই জেনারেটেড ভয়েস খুব নিখুঁত হয়, কিন্তু এই ‘মাইক্রো-ব্রেথ’ (Micro-breath) বা শ্বাসের শব্দগুলো ঠিকমতো নকল করতে পারে না। এই অডিওতে জোনাকির গলা আছে, কিন্তু জোনাকির ‘শ্বাস’ নেই। এটা পুরোটাই সিন্থেটিক।”

অডিও ডিপফেক (Audio Deepfake)

বর্তমান প্রযুক্তিতে মাত্র ৩ সেকেন্ডের ভয়েস স্যাম্পল পেলেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) হুবহু সেই মানুষের কন্ঠস্বর তৈরি করতে পারে। একে ‘ভয়েস ক্লোনিং’ বলে। স্ক্যামাররা এখন আত্মীয়ের গলা নকল করে ফোনে টাকা চাইছে, যাকে ‘ভিশিং’ (Vishing) বলা হয়। তবে ফরেনসিক অ্যানালিসিসে ‘ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ’ এবং ‘শ্বাস-প্রশ্বাসের অসঙ্গতি’ দেখে বোঝা যায় কোনটি আসল আর কোনটি এআই।

প্রীতম গ্রেফতার হলো। অনিন্দ্য বাবু স্বস্তি পেলেন, কিন্তু তাঁর চোখে জল।

***

“প্রযুক্তি মানুষকে অমর করতে পারে, তাই না সঙ্গীত?” অনিন্দ্য বাবু যাওয়ার সময় বললেন।

সঙ্গীত মাথা নাড়ল। “প্রযুক্তি মানুষকে রিপিট (Repeat) করতে পারে স্যার, কিন্তু ফিল (Feel) করতে পারে না। জোনাকি দেবীর গানটা আপনিই রিলিজ করুন, কিন্তু এআই দিয়ে নয়, ওঁর অসমাপ্ত রেকর্ডিং দিয়েই। ওটাই ওঁর আসল অস্তিত্ব।”

ডায়েরিতে চতুর্দশ কেস লিখলাম—’মৃত জোনাকির গান’। যেখানে কণ্ঠস্বর ছিল, কিন্তু প্রাণ ছিল না।

Scroll to Top