অস্থি ভাস্কর
দ্বিতীয় অধ্যায়: নখের আঁচড় ও জ্যামিতিক ধাঁধা

রাত তখন দুটো। বাইরে একটানা ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। জানলার কাচে বৃষ্টির ছাঁট আর দূরের রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো মিলেমিশে এক অদ্ভুত ভুতুড়ে ছায়ার সৃষ্টি করেছে রুদ্রর স্টাডি টেবিলে। টেবিলের ঠিক মাঝখানে রাখা সেই হাড়ের টুকরোটা। হিউমারাস বা হাতের ওপরের অংশের হাড়। ল্যাব থেকে লুকিয়ে এটা বাড়িতে নিয়ে আসা বেআইনি, কিন্তু রুদ্র জানে, এই হাড়ের মধ্যে যে রহস্য লুকিয়ে আছে, তা ল্যাবের চড়া আলোয় ধরা পড়বে না। দরকার নিস্তব্ধতা আর গভীর মনোযোগ।
রুদ্র পেশায় ফরেনসিক অ্যানথ্রোপলজিস্ট। হাড়গোড় দেখে মানুষের বয়স, লিঙ্গ, মৃত্যুর কারণ বের করা তার বা হাতের খেলা। কিন্তু গত চব্বিশ ঘণ্টায় তার সেই আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেছে।
ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা চোখের সামনে ধরল সে। হাড়টা বেশ পুরনো মনে হলেও কার্বন ডেটিং রিপোর্ট বলছে ভিন্ন কথা। মানুষটা মারা গেছে মাত্র সাত দিন আগে। অথচ হাড়ের রং তামাটে, যেন মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল অন্তত পঞ্চাশ বছর। আর সবচেয়ে অদ্ভুত হলো হাড়ের গায়ে খোদাই করা ওই নকশাগুলো। কোনো ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে এলোমেলো আঘাত নয়, খুব সুক্ষ্ম কোনো যন্ত্র দিয়ে জ্যামিতিক নকশা খোদাই করা হয়েছে। একটা ত্রিভুজ, তার মাঝখানে একটা চোখের মতো চিহ্ন, আর তার চারপাশে সর্পিল কিছু রেখা।
“অস্থি ভাস্কর…” বিড়বিড় করে উঠল রুদ্র। গত পরশু পাওয়া বেনামী চিঠিতে এই নামটাই লেখা ছিল। চিঠিতে লেখা ছিল,
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। এই অসময়ে ফোন! স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠল—ইনস্পেক্টর সলিল।
“হ্যালো, সলিল? এত রাতে?” রুদ্রর গলাটা একটু খসখসে।
ওপাশ থেকে সলিলের উত্তেজিত গলা ভেসে এল, “রুদ্র, এখুনি একবার মর্গে আসতে হবে তোমায়। আরেকটা বডি পাওয়া গেছে। বা বলা ভালো, বডি নয়, একটা ‘মডেল’ পাওয়া গেছে।”
“মডেল মানে?”
“তুমি এসেই দেখো। আর হ্যাঁ, গত পরশু যে হাড়টা পাওয়া গিয়েছিল, তার গায়ে কি কোনো চিহ্ন ছিল? ত্রিভুজ টাইপের?”
রুদ্রর মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। সে হাড়টার দিকে তাকাল। “হ্যাঁ সলিল, আছে। আমি আসছি। পনেরো মিনিটের মধ্যে।”
গাড়িটা ঝড়ের বেগে চালিয়ে যখন সে মেডিকেল কলেজের মর্গে পৌঁছল, তখন বৃষ্টি কিছুটা ধরে এসেছে। মর্গের সামনে পুলিশের জিপ আর অ্যাম্বুলেন্সের ভিড়। নীল বাতির ঝলকানি মরা মানুষগুলোর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে যেন।
সলিল দাঁড়িয়ে ছিল গেটের কাছেই। রুদ্রকে দেখে এগিয়ে এল। মুখে চিন্তার ভাঁজ। “এসো আমার সাথে।”
ভেতরে কড়া ফিনাইলের গন্ধ ছাপিয়ে একটা পচা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে এল। স্ট্রেচারের ওপর সাদা চাদরে ঢাকা কিছু একটা।
“তৈরি থেকো,” সলিল চাদরটা সরাল।
রুদ্র চমকে উঠল না, কিন্তু তার চোখ দুটো ছোট হয়ে এল। স্ট্রেচারে কোনো মানুষের মৃতদেহ নেই। আছে হাড় দিয়ে তৈরি একটা অদ্ভুত ভাস্কর্য। মানুষের পা, পাঁজর, আর হাতের হাড়গুলোকে তার দিয়ে জুড়ে একটা অদ্ভুত আকৃতি দেওয়া হয়েছে। আকৃতিটা অনেকটা মানুষের মতো, কিন্তু হাতগুলো অস্বাভাবিক লম্বা, আর মাথাটা… মাথাটা নেই। সেখানে বসানো আছে একটা গরুর খুলি।
“এটা কোথায় পেলেন?” রুদ্র প্রশ্ন করল।
“দমদমের একটা পরিত্যক্ত কারখানার ভেতরে,” সলিল বলল। “লোকাল পলিটিক্যাল পার্টির ছেলেরা আড্ডা দিতে গিয়ে এটা দেখতে পায়। প্রথমে ভেবেছিল কোনো তান্ত্রিকের কাজ। কিন্তু ভালো করে দেখো রুদ্র, জয়েন্টগুলো।”
রুদ্র গ্লাভস পরে কাছে এগিয়ে গেল। গরুর খুলিটা খুব সাবধানে জোড়া লাগানো হয়েছে মানুষের মেরুদণ্ডের ওপর। সে পকেট থেকে ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা বের করে পাঁজরের হাড়গুলোর দিকে তাকাল।
হ্যাঁ, ঠিক যেমনটা সে ভেবেছিল। পাঁজরের তিন নম্বর হাড়টাতে সেই একই সুক্ষ্ম কারুকাজ। সেই ত্রিভুজ, সেই চোখের চিহ্ন। কিন্তু এবার নকশাটা একটু আলাদা। সর্পিল রেখাগুলো ত্রিভুজের ভেতরে ঢুকছে না, বরং বেরিয়ে আসছে।
“এটা কোনো সাধারণ খুনির কাজ নয়, সলিল,” রুদ্র সোজা হয়ে দাঁড়াল। “লোকটা অ্যানাটমি খুব ভালো বোঝে। হাড়গুলোকে এমনভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে যে কোথাও একটুও মাংস লেগে নেই। আর এই হাড়গুলো…” সে একটু থামল, “এগুলো সব একজন মানুষের নয়।”
সলিল চমকে উঠল, “মানে? তুমি বলতে চাইছ এখানে একাধিক ভিক্টিম আছে?”
“কমপক্ষে তিনজন,” রুদ্র একটা ফিমার বা উরুর হাড় দেখিয়ে বলল, “এই হাড়টার দৈর্ঘ্য আর ঘনত্ব বলছে এটা কোনো পুরুষের, যার উচ্চতা অন্তত ছয় ফুট। আর এই যে পেলভিস বা কোমরের হাড়টা দেখছ, এটা কোনো অল্পবয়েসী মেয়ের। আর পাঁজরের হাড়গুলো… এগুলো বেশ বয়স্ক কারোর।”
মর্গের ঘরটা হঠাৎ করেই খুব নিস্তব্ধ মনে হল। বাইরের বৃষ্টির শব্দও যেন কানে আসছে না। তিনজন মানুষ! গত এক সপ্তাহে শহরে তিনজন নিখোঁজ হওয়ার ডায়েরি কি হয়েছে?
সলিল নোটবুক বের করল। “গত সাত দিনে চারজন মিসিং। তার মধ্যে একজন আর্ট কলেজের ছাত্র, একজন জিমন্যাস্টিকস টিচার, আর একজন রিটায়ার্ড স্কুল মাস্টার।”
“আর্ট কলেজের ছাত্র…” রুদ্র বিড়বিড় করল। “অস্থি ভাস্কর… সে কি কোনো বার্তা দিতে চাইছে?”
হঠাৎ রুদ্রর চোখ পড়ল গরুর খুলিটার মুখের ভেতর। দাঁতের ফাঁকে কিছু একটা চকচক করছে। সে ফরসেপটা হাতে নিল। খুব সাবধানে দাঁতের ফাঁক থেকে জিনিসটা বের করে আনল।
একটা ছোট্ট মেমোরি কার্ড। প্লাস্টিকের জিপলক ব্যাগে মোড়া। সলিল আর রুদ্র একে অপরের দিকে তাকাল।
“ল্যাপটপটা গাড়িতে আছে?” রুদ্র জিজ্ঞেস করল।
মর্গের অফিস রুমে বসে ওরা ল্যাপটপে কার্ডটা ঢোকাল। ফোল্ডারে একটাই ভিডিও ফাইল। ফাইলের নাম—’Lesson 2′ (দ্বিতীয় পাঠ)।
ভিডিওটা চালু হতেই একটা অন্ধকার ঘরের দৃশ্য ভেসে উঠল। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে বেহালার একটা করুণ সুর। মোজার্টের ‘রেকুয়েম’ কি? রুদ্র নিশ্চিত হতে পারল না। স্ক্রিনে দেখা গেল এক জোড়া হাত। গ্লাভস পরা, হাতে একটা ধারালো স্ক্যাল্পেল। একটা হাড়ের ওপর খুব যত্ন করে খোদাই করা হচ্ছে।
একটা যান্ত্রিক, বিকৃত স্বর ভেসে এল ভিডিও থেকে।
ক্যামেরাটা জুম করল হাড়ের ওপর। সেই ত্রিভুজ চিহ্নটা ফুটে উঠছে।
“রুদ্র প্রতাপ চৌধুরী,” ভয়েসটা হঠাৎ নাম ধরে ডাকল। রুদ্রর হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। “তুমি হাড়ের ভাষা বোঝো, তাই না? আমার প্রথম ভাস্কর্যটা তোমার কেমন লাগল? ওটা ছিল ‘ভয়’। এবার আমি তৈরি করছি ‘বেদনা’। তৃতীয় ভাস্কর্যটা হবে ‘পাপ’। আর সেটা তৈরি হবে এমন কারো হাড় দিয়ে, যাকে তুমি খুব ভালো করে চেনো।”
ভিডিওটা ঝিলমিল করে বন্ধ হয়ে গেল। স্ক্রিনটা কালো।
সলিল ল্যাপটপটা দড়াম করে বন্ধ করে দিল। “এটা তো সরাসরি থ্রেট! রুদ্র, তোমার পরিবারের কেউ…”
“আমার কেউ নেই সলিল, তুমি জানো,” রুদ্রর গলাটা শান্ত, কিন্তু চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। “ও আমাকে ভয় দেখাতে চাইছে না। ও আমাকে চ্যালেঞ্জ করছে। ও চায় আমি ওর খেলাটা খেলি।”
“কিন্তু ‘যাকে তুমি চেনো’ বলতে ও কাকে বোঝাল?”
রুদ্রর মনে হঠাৎ একটা মুখের ছবি ভেসে উঠল। নীলাঞ্জনা। ওর প্রাক্তন ছাত্রী এবং এখনকার অ্যাসিস্ট্যান্ট। নীলাঞ্জনা আজ দুদিন ছুটিতে আছে। বলেছিল গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে।
রুদ্র পকেট থেকে ফোনটা বের করল। হাতটা কি সামান্য কাঁপছে? সে নীলাঞ্জনার নাম্বারে ডায়াল করল।
রিং হচ্ছে… রিং হচ্ছে…
“আপনার ডায়াল করা নম্বরটি এই মুহূর্তে ব্যস্ত আছে…”
রুদ্র আবার ডায়াল করল। এবার ফোনটা কেটে দেওয়া হলো। সাথে সাথে একটা মেসেজ এল। আননোন নাম্বার থেকে।
মেসেজে কোনো লেখা নেই। শুধু একটা ছবি।
একটা পুরনো বাড়ির দরজার ছবি। দরজার ওপর খোদাই করা আছে সেই একই প্রতীক—ত্রিভুজ আর চোখ। আর দরজার নিচে পড়ে আছে নীলাঞ্জনার সেই প্রিয় নীল স্কার্ফটা, যেটা রুদ্র তাকে গত জন্মদিনে উপহার দিয়েছিল।
“সলিল,” রুদ্র উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এখন আর কোনো ক্লান্তি নেই। আছে শিকারির মতো তীক্ষ্ণতা। “গাড়ি বের করো। আমি জানি ও কোথায়।”
“কোথায়?”
“ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে খেয়াল করেছ? বেহালার সুরের সাথে সাথে একটা ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছিল। খুব নির্দিষ্ট একটা ছন্দ। ওটা শিয়ালদহ মেইন লাইনের কোনো লেভেল ক্রসিংয়ের আওয়াজ নয়। ওটা পুরনো স্টিম ইঞ্জিনের আওয়াজ, যা এখন শুধু রেল মিউজিয়ামের আশেপাশেই শোনা সম্ভব। আর ওই দরজার ছবিটা… ওটা হাওড়ার ডলপুতুল বাড়ি। অনেক বছর আগে আমি ওখানে একটা কেসের তদন্তে গিয়েছিলাম।”
সলিল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। “তুমি নিশ্চিত?”
“আমি হাড় চিনি সলিল, আর চিনি পুরোনো কলকাতা। এই ‘ভাস্কর’ যেই হোক না কেন, সে একটা ভুল করেছে। সে আমাকে তার স্টুডিওতে নিমন্ত্রণ জানিয়েছে। আর আমি খালি হাতে ফিরব না।”
বাইরে বাজ পড়ল বিকট শব্দে। বিদ্যুতের আলোয় রুদ্রর মুখটা ক্ষণিকের জন্য দেখা গেল। সেখানে আতঙ্কের ছাপ নেই, আছে প্রতিহংসার আগুন। খেলা জমে উঠেছে। অস্থি ভাস্কর তার ক্যানভাস সাজিয়েছে, কিন্তু রং হিসেবে এবার সে ব্যবহার করতে চাইছে রুদ্রর খুব কাছের মানুষের রক্ত।
রুদ্র পকেট থেকে সেই গরুর খুলির দাঁত থেকে পাওয়া মেমোরি কার্ডটা সলিলের হাতে দিল। “এটা ফরেনসিকে পাঠাও। আর টিম রেডি করো। আজ রাতেই আমরা ডলপুতুল বাড়িতে হানা দেব।”
গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার শব্দে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। বৃষ্টির বেগ আবার বেড়েছে। অন্ধকারের বুক চিরে হেডলাইটের আলো এগিয়ে চলল এক অজানা গন্তব্যে, যেখানে অপেক্ষা করছে হাড়, রক্ত আর এক উন্মাদ শিল্পীর মরণফাঁদ।
(সমাপ্তি – দ্বিতীয় অধ্যায়)