
গ্রামের নাম কালিপুর। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও, সন্ধ্যার পর আজও এখানে এক আদিম অন্ধকার রাজত্ব করে। অমাবস্যার রাতে যখন বাঁশবাগানের মাথার ওপর দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বয়ে যায়, তখন মনে হয় বাতাস যেন ফিসফিস করে কিছু বলতে চাইছে। আমি, অর্ণব, শহুরে কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে পৈতৃক ভিটায় এসেছিলাম মাত্র দুদিনের জন্য। কিন্তু আমি জানতাম না, এই গ্রামের মাটিতে মিশে আছে এক শতাব্দীর পুরনো অভিশাপ। গ্রামের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী বটগাছটি নাকি আজও সাক্ষী দেয় সেই অমানবিক ঘটনার। স্থানীয়রা বলে, রাত বারোটার পর ওই গাছের নিচে দিয়ে হেঁটে যাওয়া তো দূরের কথা, জানলা খুলে তাকানোও মানা। কারণ, ঠিক ওই সময়েই নাকি বাতাসে ভেসে আসে নুপুরের শব্দ আর এক করুণ কান্নার সুর। সেই কান্না শুনলে নাকি জ্যান্ত মানুষের রক্ত হিম হয়ে যায়। আমার যুক্তিবাদী মন এসব গল্প হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কালিপুরের সেই প্রথম রাত আমার বিশ্বাসের ভিত চিরতরে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
১. নিষিদ্ধ বারান্দা ও পুরনো ডায়েরি
আমাদের বাড়িটা গ্রামের একেবারে উত্তর প্রান্তে। বিশাল বড় দোতলা পুরনো আমলের জমিদার বাড়ি, যাকে স্থানীয়রা ‘বড় তরফ’-এর বাড়ি বলে চেনে। বাড়ির কেয়ারটেকার হরিপদ কাকা আমাকে বারবার সাবধান করে দিয়েছিলেন, “দাদাবাবু, যা করবেন করবেন, কিন্তু দোতলার উত্তরের বারান্দায় রাতে ভুলেও যাবেন না। ওটা তালাবন্ধ থাকে, ওটা ওমনই থাক।”
হরিপদ কাকার চোখে এক অদ্ভুত ভয় ছিল, যা উপেক্ষা করা কঠিন। কিন্তু মানুষের কৌতূহল বড়ই বিচিত্র। নিষেধের বেড়াজাল টপকানোর এক অদম্য ইচ্ছা আমাকে পেয়ে বসল। রাত তখন প্রায় এগারোটা। লোডশেডিং হওয়ায় চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। মোমবাতির আলোয় আমি আমার প্রপিতামহের লাইব্রেরি রুম ঘাঁটছিলাম। হঠাৎ একটি ধুলোমাখা জরাজীর্ণ ডায়েরি আমার হাতে এল। ডায়েরির মলাটটা লাল কাপড়ে মোড়ানো, অনেকটা রক্তের রঙের মতো। পাতা উল্টাতেই চোখে পড়ল গোটা গোটা অক্ষরে লেখা— “১৩৪৫ বঙ্গাব্দ, জ্যৈষ্ঠ মাস। আজ রাতে ওরা সুমিত্রাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলল ওই পলাশ গাছের নিচে। ওর অপরাধ ছিল ও ভালোবেসেছিল। মৃত্যুর আগে ও বলে গেছে, এই বংশের শেষ প্রদীপ যতক্ষণ জ্বলবে, ও ততক্ষণ মুক্তি পাবে না।”
পড়তে পড়তে আমার মেরুদণ্ড দিয়ে এক ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। সুমিত্রা কে? আর কেনই বা তাকে এভাবে হত্যা করা হয়েছিল? ঠিক সেই মুহূর্তে, জানলার বাইরে একটা দমকা হাওয়া বইল, আর সাথে সাথেই নিভে গেল মোমবাতিটা। অন্ধকারের মধ্যে নাকে এল এক তীব্র পচা ফুলের গন্ধ—ঠিক যেন বাসি রক্তপলাশের গন্ধ।
২. নূপুরের শব্দ আর ছায়ামূর্তি
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আমি স্পষ্ট অনুভব করলাম, ঘরে আমি একা নই। কেউ একজন আমার খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে। এতটাই কাছে যে তার নিশ্বাসের শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছি না, কিন্তু তার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছি। আমি পকেট থেকে লাইটারটা বের করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু হাত কাঁপছে। ঠিক তখনই বারান্দা থেকে ভেসে এল সেই শব্দ— ‘ছম… ছম… ছম…’।
ভারী নূপুরের শব্দ। কেউ যেন খুব ধীর পায়ে করিডোর ধরে আমার ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। যুক্তিবাদী মন বলল, “হয়তো বিড়াল বা ইঁদুর।” কিন্তু নূপুরের ছন্দের মধ্যে একটা সম্মোহনী শক্তি ছিল। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। দরজা খুলতেই দেখলাম লম্বা করিডোরটা চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, জানলা দিয়ে আসা আলোয় মেঝেতে কোনো ছায়া পড়ছে না, অথচ নূপুরের শব্দটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে।
হঠাৎ খেয়াল করলাম, করিডোরের শেষ প্রান্তে, ঠিক সেই নিষিদ্ধ উত্তরের বারান্দার দরজার সামনে একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে। সাদা শাড়ি পরা এক নারীমূর্তি, যার দীর্ঘ কালো চুল প্রায় মাটি স্পর্শ করেছে। সে আমার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি অস্ফুট স্বরে ডাকলাম, “কে? কে ওখানে?”
মূর্তিটি ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরাতে শুরু করল। হাড় হিম করা এক ক্যাঁচক্যাঁচে শব্দ হলো, যেন কোনো পুরনো যান্ত্রিক পুতুল ঘাড় ঘোরাচ্ছে। যখন সে পুরোটা ঘুরল, আমি আতঙ্কে চিৎকার করতে গিয়েও পারলাম না। তার কোনো মুখ ছিল না। মুখের জায়গায় শুধুই এক দলা অন্ধকার, আর সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে দুটো জ্বলন্ত আগুনের গোলার মতো চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সে হাত ইশারা করে আমাকে ডাকল। তার হাতে ধরা ছিল একগুচ্ছ টকটকে লাল পলাশ ফুল।
৩. দিঘির পাড়ের মরণফাঁদ
আমি জানি না কখন আমি ঘর থেকে বেরিয়ে ওই মূর্তির পিছু নিয়েছিলাম। আমার নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। মনে হচ্ছিল অদৃশ্য কোনো সুতোয় আমাকে কেউ টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা যখন বাড়ির পিছনের জঙ্গলে পৌঁছালাম, তখন চারপাশ নিস্তব্ধ। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকও যেন ভয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে। সামনেই সেই অভিশপ্ত দিঘি। দিঘির জল কালচে, যেন গলিত আলকাতরা।
ছায়ামূর্তিটি দিঘির জলের ওপর দিয়ে ভেসে ভেসে মাঝখানে চলে গেল। আমি পাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ দিঘির জল তোলপাড় হতে শুরু করল। জল থেকে উঠে এল শত শত হাত। কঙ্কালসার, পচা মাংস লেগে থাকা সেই হাতগুলো আমার দিকে ধেয়ে আসতে লাগল। আমি পালাতে চাইলাম, কিন্তু আমার পা যেন মাটির সাথে গেঁথে গেছে।
বাতাসে এক অট্টহাসি ভেসে এল, “রক্তের ঋণ রক্ত দিয়েই শোধ করতে হয়, অর্ণব! তোর পূর্বপুরুষরা আমার সুখ কেড়ে নিয়েছিল, আজ আমি তোর প্রাণ নেব।” সেই নারী কণ্ঠস্বর ছিল একই সাথে মিষ্টি এবং ভয়ানক। আমি বুঝলাম, ডায়েরিতে লেখা সেই সুমিত্রাই এই অতৃপ্ত আত্মা। সে আমাকে জলের দিকে টানতে শুরু করল। আমার চোখের সামনে তখন শুধুই মৃত্যুর অন্ধকার। আমি জ্ঞান হারানোর আগে শেষ যেটা দেখলাম, তা হলো—সেই নারীমূর্তি আমার দিকে এগিয়ে আসছে, আর তার হাতে ধরা পলাশ ফুলগুলো থেকে ফোঁটা ফোঁটা তাজা রক্ত ঝরছে।
পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা আমাকে দিঘির পাড়ে অজ্ঞান অবস্থায় খুঁজে পায়। হরিপদ কাকা আমাকে উদ্ধার করেন। সবাই ভাবল আমি হয়তো ভয় পেয়ে জ্ঞান হারিয়েছি। কিন্তু আসল রহস্যটা আমার ডান হাতে ধরা ছিল। আমার হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা ছিল একগুচ্ছ তাজা রক্তপলাশ, অথচ এই গ্রামে এখন পলাশ ফোটার সিজন নয়।
ডাক্তাররা বললেন এটা হ্যালুসিনেশন। কিন্তু আমি জানি এটা সত্যি ছিল। শহরে ফিরে আসার পর থেকে রোজ রাতে আমি জানলার বাইরে সেই নূপুরের শব্দ পাই। আর আয়নার সামনে দাঁড়ালে মাঝে মাঝে নিজের প্রতিবিম্বের বদলে সেই মুখহীন নারীমূর্তিকে দেখতে পাই। সে আমাকে ছাড়েনি, সে শুধু আমার সাথে শহরে চলে এসেছে। অভিশাপ কখনো কোনো ভৌগোলিক সীমানা মানে না, পাপের ছায়া প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ধেয়ে আসে।