
নিঃশব্দ শিসের মায়াজাল
বিশিষ্ট শিল্পপতি মিস্টার ধাওয়ানের ব্যক্তিগত জীবন বলে আর কিছু নেই। তিনি অত্যন্ত গোপনীয় ব্যবসায়িক মিটিংয়ে যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই তাঁর প্রতিপক্ষ কোম্পানির লোকজন আগে থেকে পৌঁছে যাচ্ছে। এমনকি তিনি যখন স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে একান্ত গোপনে কোনো রিসোর্টে যাচ্ছেন, সেখানেও পাপারাজ্জিরা হাজির হচ্ছে।
মিস্টার ধাওয়ান নিশ্চিত যে তাঁর ফোন হ্যাক করা হয়েছে। তিনি ফোন বদলেছেন, নম্বর বদলেছেন, এমনকি মিটিংয়ের সময় ফোন সুইচ অফ করে রাখছেন। গাড়িতে জিপিএস ট্র্যাকার আছে কিনা তা পরীক্ষা করিয়েছেন—সবই নেগেটিভ। কিন্তু তবু ছায়ার মতো কেউ তাঁকে অনুসরণ করছে। বাধ্য হয়ে তিনি শরণাপন্ন হলেন সত্যান্বেষী সঙ্গীতের। সঙ্গীতের প্রাথমিক ধারণা, মিস্টার ধাওয়ানের ওপর নজরদারি করছে কোনো মানুষ নয়, বরং তাঁর চারপাশের পরিবেশ নিজেই।
১. ১৮ কিলোহার্টজের গুপ্তচর
সঙ্গীত মিস্টার ধাওয়ানের নতুন কেনা স্মার্টফোনটি হাতে নিল। একদম সাধারণ ফোন, খুব বেশি অ্যাপও নেই। শুধু কয়েকটা নিউজ অ্যাপ আর গেম।
“মিস্টার ধাওয়ান, আপনি শেষ কবে কোথায় গিয়েছিলেন যেখানে আপনার লোকেশন লিক হয়েছে?” সঙ্গীত জিজ্ঞেস করল।
“গতকাল বিকেলে। আমি পার্ক স্ট্রিটের একটা কফি শপে গিয়েছিলাম। জিপিএস, ব্লুটুথ সব বন্ধ ছিল। তবুও বাড়ি ফেরার আগেই আমার রাইভাল কোম্পানি জেনে গেল আমি কার সাথে দেখা করতে গেছি।”
সঙ্গীত কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, “ওই কফি শপে কি টিভি বা মিউজিক সিস্টেম চলছিল?”
“হ্যাঁ, টিভিতে ক্রিকেট ম্যাচ চলছিল আর ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বাজছিল।”
সঙ্গীত তৎক্ষণাৎ তার অডিও অ্যানালাইজার গিয়ার নিয়ে ওই কফি শপে ছুটল। কফি শপের স্পিকার থেকে ভেসে আসা গানের সুরের মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কিন্তু সঙ্গীতের মিটারের কাঁটা ১৮ কিলোহার্টজ (18 kHz) থেকে ২০ কিলোহার্টজের মধ্যে লাফালাফি করতে লাগল।
২. যন্ত্র যখন কথা বলে যন্ত্রের সাথে
সঙ্গীত অফিসে ফিরে মিস্টার ধাওয়ানকে বলল, “মিস্টার ধাওয়ান, আপনার জিপিএস-এর দরকার নেই। আপনার ফোন ‘শিস’ শুনেই বলে দিচ্ছে আপনি কোথায় আছেন।”
মিস্টার ধাওয়ান আকাশ থেকে পড়লেন। “শিস? আমি তো কিছু শুনিনি!”
সঙ্গীত ব্যাখ্যা করল, “আপনার কানে শোনা সম্ভব নয়। কফি শপের টিভি বা স্পিকার থেকে বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে মানুষের শ্রুতিসীমার বাইরে একটি উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ বা ‘আল্ট্রাসনিক বিকন’ (Ultrasonic Beacon) ছড়ানো হচ্ছে। আপনার ফোনের ওই নিউজ অ্যাপগুলোর মধ্যে এমন একটি ট্র্যাকার লুকিয়ে আছে যা মাইক্রোফোন দিয়ে সারাক্ষণ এই শব্দটা শোনার জন্য অপেক্ষা করে।”
আল্ট্রাসনিক ক্রস-ডিভাইস ট্র্যাকিং (uXDT)
বিজ্ঞাপনী সংস্থারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে। টিভিতে চলা কোনো বিজ্ঞাপনে একটি ইনঅডিবল (মানুষের অগোচরে) আল্ট্রাসাউন্ড সিগন্যাল জুড়ে দেওয়া হয়। আপনার ফোনের কোনো অ্যাপ যদি সেই সিগন্যাল শুনতে পায়, তবে সে সার্ভারকে জানিয়ে দেয় যে—’এই ফোনটি এখন এই টিভিটার সামনে আছে’। এর মাধ্যমে হ্যাকাররা বা কোম্পানিরা আপনার টিভি দেখার অভ্যাস এবং আপনি কোন শপিং মল বা কফি শপে আছেন (যেখানে ওই বিশেষ সাউন্ড বাজছে), তা জিপিএস ছাড়াই নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করতে পারে। একেই বলে ‘ক্রস-ডিভাইস ট্র্যাকিং’ বা uXDT।
৩. শিসের উৎস সন্ধানে
তদন্তে জানা গেল, মিস্টার ধাওয়ানের প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি একটি অসাধু মার্কেটিং এজেন্সির সাথে হাত মিলিয়েছিল। তারা শহরের প্রধান প্রধান মিটিং স্পটগুলোর পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে বা টিভিতে এই ‘আল্ট্রাসনিক বিকন’ ছড়িয়ে রেখেছিল। মিস্টার ধাওয়ানের ফোনের একটি জনপ্রিয় গেম অ্যাপ সেই বিকন ডিটেক্ট করলেই লোকেশন পাঠিয়ে দিত।
সঙ্গীত মিস্টার ধাওয়ানের ফোন থেকে সেই অ্যাপটির পারমিশন চেক করে দেখল—সেটি অকারণে ‘মাইক্রোফোন’ পারমিশন নিয়ে রেখেছে, যদিও গেম খেলতে মাইকের কোনো দরকার নেই। এটাই ছিল কালপ্রিট।
অ্যাপটি ডিলিট করতেই ট্র্যাকিং বন্ধ হলো। মিস্টার ধাওয়ান হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
সঙ্গীত বলল, “আমরা ভাবি দেয়ালের কান আছে। কিন্তু এখনকার দিনে দেয়ালের কান থাকার দরকার নেই, আমাদের পকেটের যন্ত্রগুলোই একে অপরের সাথে গোপনে কথা বলে নেয়। আমরা মাঝখান থেকে শুধু পণ্য হয়ে যাই।”
আমার ডায়েরির সপ্তদশ পাতা পূর্ণ হলো। কেসের নাম—’নিঃশব্দ শিসের মায়াজাল’। যেখানে শব্দ শোনা যায় না, কিন্তু সেই শব্দই আমাদের পরিচয় ফাঁস করে দেয়।