
অদৃশ্য আলোর গোপন সংকেত
শহরের সবচেয়ে নিরাপদ ডেটা সেন্টার হিসেবে পরিচিত ‘ফর্ট্রেস ভল্ট’-এ এক অদ্ভুত চুরির ঘটনা ঘটেছে। ভল্টের ভেতর থাকা কম্পিউটারটি ‘এয়ার-গ্যাপড’ (Air-gapped), অর্থাৎ সেটির সাথে বাইরের পৃথিবীর ইন্টারনেট, ওয়াই-ফাই বা ব্লুটুথের কোনো সংযোগ নেই। এমনকি ইউএসবি পোর্টগুলোও সিল করা। শুধুমাত্র উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বায়োমেট্রিক স্ক্যান করে সেই ঘরে ঢুকতে পারেন।
তবুও গত এক সপ্তাহে দুবার অত্যন্ত গোপনীয় এনক্রিপটেড ফাইল সেই কম্পিউটার থেকে চুরি হয়ে গেছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, চুরির সময়ে ঘরে কেউ ছিল না। কম্পিউটারটি নিজে থেকেই চালু ছিল, কিন্তু কোনো পেনড্রাইভ গোঁজা হয়নি। পুলিশ এবং সাইবার বিশেষজ্ঞরা হতভম্ব। তার বিহীন, নেটওয়ার্ক বিহীন একটি কম্পিউটার থেকে কয়েক গিগাবাইট ডেটা বাতাসে মিলিয়ে গেল কী করে? অবশেষে ডাক পড়ল সত্যান্বেষী সঙ্গীতের। সঙ্গীতের সন্দেহ, চোর কোনো মানুষ নয়, চোর লুকিয়ে আছে এই ঘরেরই আলো-বাতাসের মধ্যে।
১. নিশ্ছিদ্র অন্ধকূপের রহস্য
আমরা যখন ভল্টের ভেতরে ঢুকলাম, ঘরটা বেশ ঠান্ডা। কোনো জানলা নেই, শুধু কাঁচের দেয়াল দিয়ে ঘেরা, যেখান থেকে বাইরের করিডোর দেখা যায়। সঙ্গীত সবার আগে ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকাল। সেখানে কয়েকটা উজ্জ্বল এলইডি (LED) প্যানেল জ্বলছে।
“মিস্টার রয়, চুরির সময় কি এই কম্পিউটারটি কোনো কাজ করছিল?” সঙ্গীত ডেটা সেন্টারের হেডকে জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, নাইট শিফটের অপারেটর কিছু ডেটা প্রসেসিংয়ের কাজ চালিয়ে রেখে গিয়েছিল। স্ক্রিন অন ছিল,” মিস্টার রয় উত্তর দিলেন।
সঙ্গীত পকেট থেকে তার ফোন বের করল, কিন্তু ক্যামেরা অন করে ভিডিও মোডে দিয়ে কম্পিউটারের ওপরের এলইডি লাইটগুলোর দিকে তাক করল।
“অদ্ভুত! খালি চোখে আলোটা স্থির মনে হচ্ছে, কিন্তু আমার ফোনের ক্যামেরায় দেখুন, আলোটা খুব দ্রুত কাঁপছে বা ফ্লিকার করছে।”
২. আলোক যখন ভাষা হয়ে কথা বলে
সঙ্গীত করিডোরের কাঁচের দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেল। দেয়ালের ঠিক উল্টো দিকে, প্রায় পঞ্চাশ ফুট দূরে অন্য একটি বিল্ডিংয়ের জানলা দেখা যাচ্ছে। সঙ্গীত বাইনোকুলার দিয়ে সেই জানলার দিকে তাকাল।
“পেয়েছি! মিস্টার রয়, আপনার কম্পিউটারে কোনো ইন্টারনেট নেই ঠিকই, কিন্তু আপনার মাথার ওপরের ওই এলইডি লাইটটিই হলো চোরের মডেম।”
আমরা সবাই অবাক। লাইট বালব দিয়ে ডেটা চুরি?
সঙ্গীত ব্যাখ্যা করল, “কম্পিউটারে আগে থেকেই একটি ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ম্যালওয়্যারটি কম্পিউটারের ডিসপ্লের ব্রাইটনেস বা ঘরের স্মার্ট এলইডি কন্ট্রোলারকে নিয়ন্ত্রণ করছিল। মানুষের চোখ সেকেন্ডে ৬০ বারের বেশি কম্পন ধরতে পারে না, তাই আমরা আলো স্থির দেখি। কিন্তু ওই ম্যালওয়্যারটি আলোর তীব্রতাকে সেকেন্ডে হাজার হাজার বার কমিয়ে-বাড়িয়ে বাইনারি কোড (0 এবং 1) তৈরি করেছে। এই প্রযুক্তিকে বলে ‘ভিসিবল লাইট কমিউনিকেশন’ (VLC) বা লাই-ফাই।”
ভিসিবল লাইট কমিউনিকেশন (VLC)
আমরা সাধারণত রেডিও ওয়েভ (Wi-Fi) দিয়ে ডেটা পাঠাই। কিন্তু আলোক তরঙ্গ ব্যবহার করেও ডেটা পাঠানো সম্ভব। একে Li-Fi বলে। হ্যাকাররা কম্পিউটারের হার্ড ড্রাইভের এলইডি ইন্ডিকেটর বা স্ক্রিনের ব্রাইটনেস কন্ট্রোল হ্যাক করে আলোর দ্রুত কম্পনের মাধ্যমে ডেটা বাইরে পাচার করতে পারে। যদি জানলার বাইরে কেউ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টেলিস্কোপ বা রিসিভার নিয়ে বসে থাকে, তবে সে ওই আলোর কম্পন রেকর্ড করে পুনরায় ডেটায় রূপান্তর করতে পারবে।
৩. শিকার যখন শিকারী
সঙ্গীতের কথামতো পুলিশ উল্টো দিকের বিল্ডিংয়ে হানা দিল। সেখানে একটি অন্ধকার ঘরে ট্রাইপডের ওপর বসানো একটি শক্তিশালী অপটিক্যাল সেন্সর পাওয়া গেল, যা সোজা ভল্টের এলইডি লাইটের দিকে তাক করা ছিল। গ্রেফতার করা হলো কোম্পানিরই এক প্রাক্তন টেকনিশিয়ানকে, যে কয়েক মাস আগে মেইনটেনেন্সের নাম করে কম্পিউটারে ওই ম্যালওয়্যারটি ইনস্টল করে গিয়েছিল।
সে জানত, পেনড্রাইভ বা ইন্টারনেট ব্লক করা থাকলেও, আলো আটকানোর কোনো ফায়ারওয়াল এই কোম্পানিতে নেই। কাঁচের দেয়ালই ছিল তার সুযোগ।
কেস সলভ করে আমরা যখন ফিরছি, তখন শহরের রাস্তায় সোডিয়াম আলোর সারি। সঙ্গীত বলল, “অন্ধকারকে আমরা ভয় পাই, কিন্তু দেখ, আজকের যুগে আলোই হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক। প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতা তত বাড়ছে। আগে চোর সিঁধ কাটত, এখন চোর আলোর কণার পিঠে চড়ে জানলা দিয়ে বেরিয়ে যায়।”
আমি নোটবুক বের করলাম। ষোড়শ কেস—’অদৃশ্য আলোর গোপন সংকেত’। যেখানে দেওয়ালেরও কান থাকার দরকার নেই, যদি জানলার চোখ খোলা থাকে।