ভৌতিক কম্পনের ইশারা – সত্যান্বেষী সঙ্গীত | ইনফ্রাসাউন্ড রহস্য

ভৌতিক কম্পনের ইশারা ফিচার ইমেজ

ভৌতিক কম্পনের ইশারা

সিরিজ: সত্যান্বেষী সঙ্গীত (পর্ব – ১৫) | শব্দসংখ্যা: ৮০০+

কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত ‘নীলকুঠি লাইব্রেরি’ নিয়ে ইদানীং অদ্ভুত সব গুজব রটেছে। শতবর্ষের পুরনো এই লাইব্রেরির দোতলার রিডিং রুমে নাকি আর বসা যাচ্ছে না। যারাই সেখানে দীর্ঘক্ষণ পড়াশোনা করতে বসছেন, কিছুক্ষণ পরেই তাঁরা এক অহেতুক আতঙ্ক অনুভব করছেন। কেউ কেউ দাবি করেছেন, তাঁরা চোখের কোণ দিয়ে ছায়ামূর্তি বা ধূসর রঙের অবয়ব সরে যেতে দেখেছেন। অনেকে আবার বমি বমি ভাব এবং মাথা ঘোরার অভিযোগও করেছেন।

লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ ওঝা ডাকার ব্যবস্থা করছিলেন, কিন্তু ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মিস্টার সোম বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। তিনি শরণাপন্ন হলেন সত্যান্বেষী সঙ্গীতের। সঙ্গীতের কাছে ভূত মানেই ‘অমীমাংসিত বিজ্ঞান’। কিন্তু এবারের কেসটি একটু আলাদা, কারণ শত শত মানুষ একই অনুভূতির শিকার হচ্ছেন। তবে কি সত্যিই নীলকুঠির বাতাসে মিশে আছে কোনো অশরীরী অভিশাপ? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো সূক্ষ্ম ফ্রিকোয়েন্সির কারসাজি?

১. আতঙ্কের হিমশীতল স্রোত

আমরা যখন নীলকুঠি লাইব্রেরিতে পৌঁছলাম, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। দোতলার সেই বিশেষ রিডিং রুমটি বেশ বড়, চারদিকে মেহগনি কাঠের তাক ভর্তি পুরনো বই। ঘরে ঢুকতেই আমার কেমন যেন একটা অস্বস্তি হতে লাগল। মনে হলো বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে, অকারণে একটা বিষাদ আর ভয় গ্রাস করছে আমাকে।

সঙ্গীতের দিকে তাকালাম। ও খুব শান্ত। পকেট থেকে একটা ছোট বোতলে জল বের করে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর একদৃষ্টিতে জলের দিকে তাকিয়ে রইল।

“দেখছিস?” সঙ্গীত জলের বোতলটা দেখিয়ে ফিসফিস করে বলল।

আমি অবাক হয়ে দেখলাম, টেবিলটা স্থির, কিন্তু বোতলের জলের উপরিভাগে খুব সূক্ষ্ম একটা কম্পন বা ঢেউ খেলছে। যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি জলটাকে নাড়াচ্ছে। হঠাৎ আমার মনে হলো, ঘরের কোণে একটা ছায়া সরে গেল! আমি চমকে উঠলাম।

“ভয় পাস না, ওটা তোর মনের ভুল নয়, আবার ভূতও নয়,” সঙ্গীত বলল। ও ঘরটা জরিপ করতে শুরু করল। জানলা বন্ধ, বাইরে কোনো লরি বা বাস যাওয়ার শব্দ নেই। তবে এই কম্পন আসছে কোথা থেকে?

২. ১৯ হার্টজের অদৃশ্য ভূত

সঙ্গীত পকেট থেকে তার ‘স্পেকট্রাম অ্যানালাইজার’ যন্ত্রটি বের করল। যন্ত্রের স্ক্রিনে লাল দাগগুলো লাফালাফি করছে।

“যা ভেবেছিলাম,” সঙ্গীত যন্ত্রটা নিয়ে ঘরের এক কোণে রাখা বিশাল এক পুরনো ইন্ডাস্ট্রিয়াল একজস্ট ফ্যানের (Exhaust Fan) দিকে এগিয়ে গেল। ফ্যানটা খুব ধীরে ঘুরছে, কোনো আওয়াজ নেই বললেই চলে। কিন্তু সঙ্গীত সেটার দিকেই যন্ত্রটা তাক করল।

“মিস্টার সোম, এই ফ্যানটা কবে বসানো হয়েছে?”

“মাসখানেক আগে। পুরনোটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল বলে নতুন একটা হাই-পাওয়ার সাইলেন্ট ফ্যান লাগানো হয়েছে,” মিস্টার সোম জানালেন।

সঙ্গীত মুচকি হাসল। “এই ফ্যানটাই আপনাদের ভূত। এর ব্লেডগুলো ঘোরার সময় বাতাসের সাথে এমনভাবে ঘর্ষণ খাচ্ছে যে এটি একটি ‘ইনফ্রাসাউন্ড’ (Infrasound) তৈরি করছে। মিটারে দেখুন—১৮.৯৮ হার্টজ (Hz)।”

ইনফ্রাসাউন্ড বা ফিয়ার ফ্রিকোয়েন্সি

মানুষের কান ২০ হার্টজের নিচের শব্দ শুনতে পায় না। একে ইনফ্রাসাউন্ড বলে। কিন্তু শুনতে না পেলেও শরীর এই শব্দতরঙ্গ অনুভব করে। ১৮ থেকে ১৯ হার্টজের মধ্যের শব্দতরঙ্গ মানুষের চোখের মণির (Eyeball) রেজোন্যান্স ফ্রিকোয়েন্সির সাথে মিলে যায়। ফলে চোখের মণি কাঁপতে শুরু করে এবং মানুষ চোখের কোণে ঝাপসা ছায়া বা ‘ভূত’ দেখে। এছাড়া এই ফ্রিকোয়েন্সি মস্তিষ্কে অহেতুক ভীতি, বমি ভাব এবং প্যানিক অ্যাটাক তৈরি করে। একেই বিজ্ঞানের ভাষায় ‘The Fear Frequency’ বা ‘Ghost Frequency’ বলা হয়।

৩. ষড়যন্ত্রের জ্যামিতিক নকশা

মিস্টার সোম অবাক হয়ে বললেন, “তার মানে নিছক একটা যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য আমরা এত ভয় পাচ্ছিলাম?”

সঙ্গীত ফ্যানটার মোটর বক্সটা খুলল। “না, এটা যান্ত্রিক ত্রুটি নয়। এটা নাশকতা।”

মোটরের ভেতরে একটা ছোট অতিরিক্ত চিপ লাগানো ছিল, যা ফ্যানের গতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন এক নির্দিষ্ট আরপিএম-এ (RPM) বেঁধে রেখেছিল যাতে ঠিক ১৮.৯ হার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি তৈরি হয়। তদন্তে জানা গেল, লাইব্রেরির কেয়ারটেকার বলাই বাবু, যিনি সম্প্রতি প্রোমোটারদের সাথে গোপনে হাত মিলিয়েছিলেন, তিনিই এই চিপটি লাগিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ভুতুড়ে গুজব ছড়িয়ে লাইব্রেরিটিকে বন্ধ করে দেওয়া, যাতে প্রোমোটাররা সস্তায় এই হেরিটেজ বিল্ডিংটি কিনে নিতে পারে।

বলাই বাবুকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলো। ফ্যানটি বন্ধ করতেই ঘরের ভারী বাতাস মুহূর্তের মধ্যে হালকা হয়ে গেল। আমার বুকের ধড়ফড়ানিও নিমেষে উধাও।


লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিলাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে সঙ্গীত বলল, “মানুষ বড় অদ্ভুত প্রাণী রে। সে ভূতকে ভয় পায়, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভয়ংকর হলো মানুষের লোভ। ভূত অদৃশ্য হতে পারে, কিন্তু লোভের কম্পন ইনফ্রাসাউন্ডের চেয়েও বেশি বিধ্বংসী।”

আমি নোটবুক বের করলাম। পঞ্চদশ কেস—’ভৌতিক কম্পনের ইশারা’। যেখানে ভূত ছিল না, ছিল বিজ্ঞানের এক অপব্যবহার। মনের ভয় আসলে বাতাসেরই এক অদৃশ্য ঢেউ ছাড়া আর কিছুই নয়। আজ বুঝলাম, সব কম্পন কানে শোনা যায় না, কিছু কম্পন আত্মাকে নাড়িয়ে দেয়।

Scroll to Top