আলোর কম্পনে মৃত্যুর পরোয়ানা – সত্যান্বেষী সঙ্গীত |

আলোর কম্পনে মৃত্যুর পরোয়ানা ফিচার ইমেজ

আলোর কম্পনে মৃত্যুর পরোয়ানা

সিরিজ: সত্যান্বেষী সঙ্গীত (পর্ব – ১০) | কলমে: সঙ্গীত দত্ত

ভূমিকা: কাঁচের দেয়াল যখন বিশ্বাসঘাতক

আমরা জানি শব্দ চলাচলের জন্য মাধ্যম লাগে, আর শূন্যস্থানে শব্দ শোনা যায় না। তাই গোপন আলোচনার জন্য তৈরি করা হয় ‘সাউন্ডপ্রুফ’ ঘর। কিন্তু শব্দ কি শুধুই বাতাস কাঁপায়? না, শব্দ কঠিন বস্তুকেও কাঁপায়। সত্যান্বেষী সঙ্গীতের দশম অভিযান এমন এক হাই-প্রোফাইল রহস্য নিয়ে যেখানে একটি সম্পূর্ণ সাউন্ডপ্রুফ কাঁচের ঘরের ভেতরের আলোচনা বাইরে পাচার হয়ে গেছে। কোনো মাইক্রোফোন নেই, কোনো ট্রান্সমিটার নেই—আছে শুধু জানলার কাঁচ আর অদৃশ্য আলোর খেলা।

***

শহরের নামী ডিফেন্স রিসার্চ কোম্পানি ‘ঈগল আই’-এর সিইও মিস্টার শর্মার অফিসে যখন আমরা পৌঁছলাম, তখন তিনি মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তাঁর অফিসটি দশতলায়, চারদিক মোটা কাঁচ দিয়ে ঘেরা। এখান থেকে শহরের ভিউ চমৎকার, কিন্তু মিস্টার শর্মার চোখে এখন শুধুই আতঙ্ক।

“মিস্টার সেন, গতকাল এই ঘরে বসে আমি আর আমার পার্টনার দেশের নতুন ড্রোন প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করছিলাম। ঘরটি সম্পূর্ণ সাউন্ডপ্রুফ। দরজা বন্ধ ছিল। অথচ আজ সকালে জানলাম, আমাদের প্রতিপক্ষ কোম্পানি সেই প্রজেক্টের সব ডিটেলস জেনে গেছে! আমার অফিসে নিশ্চয়ই কেউ আড়ি পাতছে।”

সঙ্গীত ঘরটি খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। ও পকেট থেকে আরএফ ডিটেক্টর (RF Detector) বের করে পুরো ঘর স্ক্যান করল। কোনো গোপন ক্যামেরা বা মাইক্রোফোনের সংকেত নেই।

“মিস্টার শর্মা, আপনি কি ব্লুটুথ বা ফোন ব্যবহার করছিলেন?” সঙ্গীত জিজ্ঞেস করল।

“না। আমরা সব ইলেকট্রনিক ডিভাইস বাইরে রেখে ঢুকেছিলাম। এই ঘরটা ‘ফ্যারাডে কেজ’ (Faraday Cage) প্রযুক্তিতে তৈরি, অর্থাৎ এখানে কোনো মোবাইল নেটওয়ার্কও ঢোকে না।”

সঙ্গীত জানলার কাঁচের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ডবল-গ্লেজড গ্লাস। এখান থেকে উল্টো দিকের বিল্ডিংটা প্রায় তিনশো মিটার দূরে। সঙ্গীত নিজের হাই-পাওয়ার বাইনোকুলার বের করে উল্টো দিকের বিল্ডিংয়ের ছাদ দেখতে লাগল।

হঠাৎ ও চমকে উঠল। “পেয়েছি!”

আমি আর মিস্টার শর্মা ছুটে গেলাম। “কি হলো?”

সঙ্গীত জানলার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “মিস্টার শর্মা, আপনার সাউন্ডপ্রুফ ঘর শব্দ আটকাতে পারে, কিন্তু আলো আটকাতে পারে না। উল্টো দিকের বিল্ডিংয়ের ছাদে জলের ট্যাংকের আড়ালে দেখুন, একটা ট্রাইপডের ওপর টেলিস্কোপের মতো কিছু বসানো আছে।”

“ওটা কি?” মিস্টার শর্মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

“ওটা একটা ‘লেজার মাইক্রোফোন’ (Laser Microphone)।” সঙ্গীত গম্ভীরভাবে বলল।

সেদিন দুপুরেই পুলিশ ওই বিল্ডিংয়ে হানা দিল। হাতেনাতে ধরা পড়ল এক ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্পাই। তার কাছে পাওয়া ল্যাপটপে মিস্টার শর্মার গতকালের মিটিংয়ের অডিও রেকর্ডিং উদ্ধার হলো।

লেজার মাইক্রোফোন কী?

সঙ্গীত আমাদের বোঝাল: “আমরা যখন কথা বলি, তখন বাতাসের কম্পন গিয়ে জানলার কাঁচে ধাক্কা দেয়। ফলে কাঁচটি খুব সামান্য, যা খালি চোখে দেখা যায় না, কাঁপতে থাকে। স্পাইরা দূর থেকে একটি অদৃশ্য ইনফ্রারেড লেজার বিম (Laser Beam) সেই কাঁচে ফেলে। কাঁচের কম্পন অনুযায়ী সেই লেজার বিমটি প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। একটি রিসিভার সেই ফিরে আসা লেজারের কম্পন বিশ্লেষণ করে তাকে পুনরায় অডিও বা শব্দে রূপান্তর করে। অর্থাৎ, জানলার কাঁচটিই একটি বিশাল মাইক্রোফোনের কাজ করে।”

মিস্টার শর্মা হতবাক। “তার মানে আমার অফিসের জানলাই আমার শত্রু?”

“ঠিক তাই। তবে এর প্রতিকারও আছে,” সঙ্গীত পকেট থেকে একটা ছোট যন্ত্র বের করে জানলার কাঁচে লাগিয়ে দিল। যন্ত্রটা খুব মৃদু একটা ভোঁ-ভোঁ শব্দ বা ভাইব্রেশন তৈরি করতে লাগল।

“এটাকে বলে ‘অডিও জ্যামার’ বা ‘ট্রান্সডিউসার’। এটা কাঁচের ওপর একটা এলোমেলো কম্পন বা নয়েজ তৈরি করবে। ফলে বাইরে থেকে কেউ লেজার মারলেও তারা শুধু হট্টগোল শুনতে পাবে, আপনার কথা নয়।”

মিস্টার শর্মা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। “সঙ্গীত বাবু, আপনি না থাকলে আজ দেশের বড় ক্ষতি হয়ে যেত।”

***

অফিস থেকে বেরিয়ে লিফটে নামার সময় আমি সঙ্গীতকে বললাম, “আচ্ছা, মানুষ কি কোথাও নিরাপদ নয়? দেয়াল, জানলা, এমনকি বাতাস—সবাই কি গোয়েন্দা?”

সঙ্গীত মুচকি হাসল। “নিরাপত্তা একটা আপেক্ষিক শব্দ রে। বিজ্ঞান যেমন চোরকে তালা ভাঙার উপায় দেয়, তেমন গৃহস্থকে নতুন তালাও দেয়। আসল লড়াইটা চোর-পুলিশের নয়, আসল লড়াইটা বুদ্ধির। আর শব্দ যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই আলোর খেলা শুরু হয়। একজন সত্যান্বেষীকে কান এবং চোখ—দুটোই খোলা রাখতে হয়।”

আমার ডায়েরির দশম পাতা পূর্ণ হলো। কেসের নাম—’আলোর কম্পনে মৃত্যুর পরোয়ানা’।

Scroll to Top