করোটির গভীরের ষড়যন্ত্র – সত্যান্বেষী সঙ্গীত |

করোটির গভীরের ষড়যন্ত্র ফিচার ইমেজ

করোটির গভীরের ষড়যন্ত্র

সিরিজ: সত্যান্বেষী সঙ্গীত (পর্ব – ৯) | কলমে: সঙ্গীত দত্ত

ভূমিকা: কানের পর্দা যেখানে অপ্রয়োজনীয়

আমরা কান দিয়ে শুনি—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিজ্ঞান বলে, শোনার জন্য কানের পর্দার প্রয়োজন নেই। মাথার খুলি বা হাড়ের মাধ্যমেও শব্দ সোজা মস্তিষ্কে পৌঁছে দেওয়া যায়। এই প্রযুক্তি চিকিৎসা বিজ্ঞানের আশীর্বাদ। কিন্তু যখন এই আশীর্বাদকেই অপরাধের হাতিয়ার করা হয়? যখন কাউকে পাগল প্রতিপন্ন করার জন্য তার মাথার ভেতরে এমন আওয়াজ ঢোকানো হয় যা আর কেউ শোনে না? সত্যান্বেষী সঙ্গীতের নবম গল্পে উন্মোচিত হবে ‘বোন কন্ডাকশন’ (Bone Conduction) প্রযুক্তির এক অন্ধকার দিক।

***

অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মৃণাল সেনশর্মার বাড়িটা আলিপুরের এক শান্ত রাস্তায়। বিশাল লাইব্রেরি, প্রাচীন আসবাব আর নিস্তব্ধতা। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতাই এখন মৃণাল বাবুর কাছে বিভীষিকা। তাঁর নাতনি, তিতির, আমাদের ডেকে পাঠিয়েছে।

আমরা যখন ড্রয়িংরুমে বসলাম, মৃণাল বাবুকে দেখে বেশ অসহায় লাগল। বয়স পঁচাত্তর পেরিয়েছে, কানে একটি অত্যাধুনিক হিয়েরিং এইড।

“মিস্টার সেন, ওরা বলছে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমি স্পষ্ট শুনতে পাই! কেউ একজন ফিসফিস করে বলে—’উইলটা বদলে ফেলো… মরে যাও… তোমার সময় শেষ’। অথচ তখন ঘরে কেউ থাকে না।” মৃণাল বাবু কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন।

সঙ্গীত জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি কানে আঙুল দিয়ে বন্ধ করলেও শব্দটা শুনতে পান?”

“হ্যাঁ! এমনকি আমি বাথরুমে শাওয়ারের নিচে থাকলেও ওই আওয়াজটা শুনতে পাই। মনে হয় যেন আওয়াজটা কানের বাইরে থেকে নয়, আমার মাথার ভেতর থেকে আসছে।”

তিতির পাশ থেকে বলল, “দাদুর সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. বোস বলছেন এটা ‘অডিটরি হ্যালুসিনেশন’। ডিমেনশিয়ার লক্ষণ। কাকারাও তাই বলছেন এবং দাদুকে মেন্টাল অ্যাসাইলামে পাঠানোর ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু দাদু মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ!”

সঙ্গীত মৃণাল বাবুর দিকে এগিয়ে গেল। “স্যার, আমি কি আপনার কানের যন্ত্রটা একবার দেখতে পারি?”

মৃণাল বাবু কান থেকে যন্ত্রটা খুলে দিলেন। সঙ্গীত খুব মনোযোগ দিয়ে যন্ত্রটা দেখল। ওটা সাধারণ হিয়েরিং এইড নয়, ওটা একটা ‘বোন কন্ডাকশন ইমপ্ল্যান্ট’ (Bone Conduction Implant) বা BAHA ডিভাইসের রিসিভার।

“এটা কি ব্লুটুথ এনাবেলড?” সঙ্গীত জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ, ডা. বোস গত মাসেই এটা আপগ্রেড করে দিয়েছেন যাতে আমি ফোন রিসিভ করতে পারি।”

সঙ্গীত যন্ত্রটা পকেটে রেখে বলল, “তিতির, আজ রাতে দাদু এই যন্ত্রটা পরবেন না। দেখি আওয়াজ আসে কি না।”

সেদিন রাতে আমরা মৃণাল বাবুর লাইব্রেরিতে অপেক্ষা করতে লাগলাম। রাত একটা নাগাদ মৃণাল বাবু শান্তিতে ঘুমোচ্ছেন। কোনো আওয়াজ নেই। হঠাৎ পাশের ঘর থেকে একটা খসখস শব্দ। সঙ্গীত ইশারা করল চুপ থাকার জন্য।

ডা. বোস এবং মৃণাল বাবুর ছোট ছেলে সুমিত চুপিচুপি ঘরে ঢুকলেন। সুমিতের হাতে একটা ট্যাবলেট।

“বাবা কি যন্ত্রটা পরেছেন?” সুমিত ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

“নিশ্চয়ই, আমি তো ওনাকে বলেছি রাতে না খুলতে,” ডা. বোস বললেন।

সুমিত ট্যাবলেটে কিছু একটা টিপলেন। সাথে সাথে সঙ্গীতের হাতে থাকা মৃণাল বাবুর হিয়েরিং এইডটা হালকা ভাইব্রেট করে উঠল। সঙ্গীত সেটা আমার কপালে ঠেকাল।

আমি শিউরে উঠলাম! কানের পর্দা দিয়ে নয়, আমার কপালের হাড়ের মাধ্যমে সোজা মস্তিষ্কে একটা যান্ত্রিক, ভৌতিক গলার স্বর ভেসে এল— “মৃণাল… তুমি একা… মরে যাও…”

সঙ্গীত আলো জ্বালিয়ে দিল। “গুড ইভিনিং জেন্টলমেন। নাটক শেষ।”

সুমিত আর ডা. বোস পালানোর পথ পেলেন না। সঙ্গীত যন্ত্রটা তুলে ধরে বলল,

“আপনারা বোন কন্ডাকশনের সুযোগ নিয়েছিলেন। এই প্রযুক্তিতে শব্দ বাতাসের মাধ্যমে কানের পর্দায় ধাক্কা দেয় না, বরং স্কাল বা খুলির হাড়ের মাধ্যমে সরাসরি ইনার ইয়ারে (Cochlea) পৌঁছায়। তাই কানে তুলো দিলেও বা জলের নিচে থাকলেও এই শব্দ শোনা যায়। আপনারা ব্লুটুথ হ্যাক করে মৃণাল বাবুর মাথার ভেতরে এই অডিও ফাইল স্ট্রিম করছিলেন যাতে উনি নিজেকে পাগল ভাবেন এবং আপনারা সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে পারেন।”

বোন কন্ডাকশন (Bone Conduction)

বেটোফেন যখন বধির হয়ে গিয়েছিলেন, তিনি পিয়ানোর সাথে একটি রড দাঁতে কামড়ে ধরে সুর অনুভব করতেন। এটাই বোন কন্ডাকশন। আধুনিক যুগে সেনাবাহিনীর হেডসেট এবং বিশেষ হিয়েরিং এইডে এটি ব্যবহৃত হয় যাতে কানের ছিদ্র খোলা থাকে এবং পারিপার্শ্বিক শব্দও শোনা যায়। হ্যাকাররা যদি এই ডিভাইসের ফ্রিকোয়েন্সি হ্যাক করে, তবে তারা ভিক্টিমের মস্তিষ্কে সরাসরি বার্তা পাঠাতে পারে যা ভিক্টিম ছাড়া আর কেউ শুনতে পাবে না। একে বলা হয় ‘ভয়েস অব গড’ অ্যাটাক।

মৃণাল বাবু সব শুনে ছেলেকে বললেন, “আমি পাগল হইনি সুমিত, কিন্তু লোভ তোকে অন্ধ আর বধির করে দিয়েছে।”

***

কেস মিটে যাওয়ার পর আমি নিজের কান দুটো ভালো করে ডললাম।
সঙ্গীত হাসল, “কি রে, ভয় পাচ্ছিস?”

আমি বললাম, “ভয় তো লাগবেই। টেকনোলজি এখন আমাদের হাড়ের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে গেছে!”

“হাড়ের ভেতর ঢুকুক, কিন্তু বিবেকের ভেতর যেন না ঢোকে। সেটাই আসল চ্যালেঞ্জ।”

নোটবুকে লিখে রাখলাম নবম রহস্য—’করোটির গভীরের ষড়যন্ত্র’। যেখানে শব্দ এসেছিল বাতাস চিরে নয়, হাড়ের কম্পনে।

Scroll to Top