
ছদ্মবেশী সুরের ধাঁধা
ভূমিকা: সুর যেখানে সংকেত
সত্যান্বেষী সঙ্গীতের পঞ্চম কেস। এবার আর কোনো অতিপ্রাকৃত ভয় বা মনস্তাত্ত্বিক খেলা নয়, বরং আধুনিক সাইবার অপরাধের এক নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে। আমরা গান শুনি আনন্দের জন্য, কিন্তু অপরাধীরা সেই গানকেই ব্যবহার করছে তাদের গোপন যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে।
এবারের গল্প ‘অডিও স্টেগানোগ্রাফি’ (Audio Steganography) নিয়ে। যেখানে একটি জনপ্রিয় পপ গানের ভেতরে লুকিয়ে পাচার করা হচ্ছে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য। খালি কানে যা কেবলই একটি সাধারণ গান, প্রযুক্তির চোখে তা এক জটিল মানচিত্র। সঙ্গীত সেন কি পারবে এই লুকানো সুরের পাঠোদ্ধার করতে?
লালবাজারের স্পেশাল ব্রাঞ্চের অফিসার সমীরণ বাবু যখন আমাদের স্টুডিওতে এলেন, তখন তার হাতে কোনো ফাইল নেই, শুধু একটা পেনড্রাইভ। সঙ্গীত তখন তার ভায়োলিনটা টিউন করছিল।
“সমীরণ দা, এত সকালে? নতুন কোনো মার্ডার মিস্ট্রি?” সঙ্গীত ভায়োলিনটা নামিয়ে রেখে জিজ্ঞেস করল।
সমীরণ বাবু চেয়ারে বসে কপালে হাত বুলিয়ে বললেন, “খুন নয় সঙ্গীত, তার চেয়েও বড় সমস্যা। শহরে একটা আন্তর্জাতিক অ্যান্টিক স্মাগলিং গ্যাং সক্রিয় হয়েছে। আমরা জানি ওরা কবে কোথায় ডেলিভারি দিচ্ছে, কিন্তু কিভাবে খবর আদান-প্রদান করছে তা কিছুতেই ধরতে পারছি না। ওদের ফোন ট্যাপ করেছি, ইমেইল হ্যাক করেছি—কিচ্ছু নেই। শুধু একটা জিনিস অদ্ভুত।”
“কি?”
“গ্যাংয়ের মূল পান্ডা ভিকি, যে গত সপ্তাহে ধরা পড়েছে, তার ফোনে আমরা কোনো মেসেজ পাইনি। শুধু তার স্পটিফাই (Spotify) প্লে-লিস্টে একটা নির্দিষ্ট গান বারবার চালানো হয়েছে। গানটা আজকাল খুব ভাইরাল—’নিয়ন রাতের স্বপ্ন’, গায়ক ডিজে রুদ্র।”
সঙ্গীতের চোখ চকচক করে উঠল। “গানটা আমাকে দিন।”
পেনড্রাইভ থেকে গানটা সিস্টেমে লোড করা হলো। ডিজে রুদ্রর গান, বেশ জম্পেশ বিট, প্রচুর বেস আর সিন্থেসাইজার। আমি বললাম, “এ তো সাধারণ পার্টি সং। এর মধ্যে সংকেত থাকবে কি করে?”
সঙ্গীত কোনো কথা না বলে মনিটরের দিকে তাকিয়ে রইল। গানটা বাজছে। সঙ্গীত একবার হেডফোন খুলছে, একবার পরছে। তারপর হঠাৎ গানটা বন্ধ করে দিল।
“সমীরণ দা, ভিকি কি গানটা পুরোটা শুনত? নাকি মাঝপথে বন্ধ করে দিত?”
“লগ বলছে সে ৩ মিনিট ১২ সেকেন্ড পর্যন্ত শুনেই বন্ধ করে দিত।”
সঙ্গীত কিবোর্ডে খটখট করে টাইপ করতে শুরু করল। “সঙ্গীত দত্ত, ভালো করে দেখ। এটাকে বলে অডিও স্টেগানোগ্রাফি।”
অডিও স্টেগানোগ্রাফি (Audio Steganography)
সঙ্গীত ব্যাখ্যা করল: “সাধারণত আমরা অডিও ফাইলকে ‘ওয়েভফর্ম’ (Waveform) হিসেবে দেখি। কিন্তু যদি এটাকে ‘স্পেকট্রোগ্রাম’ (Spectrogram) মোডে ফেলা হয়, তবে শব্দের কম্পাঙ্ককে ছবির মতো দেখা যায়। হ্যাকাররা গানের উচ্চ কম্পাঙ্কের (High Frequency) লেয়ারে, যা মানুষের কানে শোনা যায় না (১৬ কিলোহার্টজের উপরে), সেখানে ছবি বা টেক্সট লুকিয়ে রাখতে পারে।”
সঙ্গীত সফটওয়্যারে গানটির স্পেকট্রোগ্রাম ভিউ অন করল। স্ক্রিনে রঙের বিচিত্র খেলা ফুটে উঠল। লাল, হলুদ, নীল রঙের হিজিবিজি প্যাটার্ন। কিন্তু সঙ্গীত যখন গানটির ৩ মিনিট ১২ সেকেন্ডের মাথায় জুম করল, আমরা চমকে উঠলাম।
সেখানে সাউন্ড ওয়েভগুলো এমনভাবে সাজানো যা দেখতে অবিকল একটি কিউআর কোড (QR Code)-এর মতো!
“অবিশ্বাস্য!” সমীরণ বাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
সঙ্গীত ফোন দিয়ে সেই স্ক্রিনের কিউআর কোডটা স্ক্যান করল। সাথে সাথে একটা গুগল ম্যাপের লোকেশন ভেসে উঠল—খিদিরপুর ডক, ওয়ারহাউস নম্বর ৭। আর নিচে একটা সময়—আজ রাত ১২টা।
“ডিজে রুদ্র শুধু গায়ক নন, তিনি এই গ্যাংয়ের কমিউনিকেশন এক্সপার্ট,” সঙ্গীত বলল। “তিনি গানের বিটের আড়ালে, হাই-ফ্রিকোয়েন্সি রেঞ্জে এই কোড লুকিয়ে রিলিজ করেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ গান শুনছে, কিন্তু কোডটা ডিকোড করছে শুধু ভিকির মতো লোকরা।”
সেদিন রাতেই পুলিশ খিদিরপুর ডকে হানা দিল। হাতেনাতে ধরা পড়ল কয়েক কোটি টাকার চোরাই মূর্তি। ডিজে রুদ্রকেও তার স্টুডিও থেকে গ্রেফতার করা হলো। তার কম্পিউটার থেকে পাওয়া গেল আরও অনেক এনক্রিপ্টেড গানের ফাইল।
কেস সলভ হওয়ার পর আমরা কফি হাউসে বসেছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা সঙ্গীত, তুই কি করে বুঝলি যে ৩ মিনিট ১২ সেকেন্ডেই কিছু আছে?”
সঙ্গীত কফির কাপে চুমুক দিয়ে হাসল। “খুব সহজ। ওই সময়টাতে গানের রিদম বা ছন্দে একটা খুব সূক্ষ্ম ‘গ্লিচ’ বা ডিজিটাল নয়েজ ছিল। সাধারণ কানে মনে হবে ওটা স্টাইল, কিন্তু আমার কানে ওটা ছিল বেসুরো। পৃথিবীতে নিখুঁত অপরাধ বলে কিছু হয় না রে, কোথাও না কোথাও একটা তাল কাটবেই। সত্যান্বেষীর কাজ শুধু সেই বেসুরো তালটা খুঁজে বের করা।”
আমি পকেট থেকে নোটবুক বের করলাম। পঞ্চম কেস—’ছদ্মবেশী সুরের ধাঁধা’। সত্যান্বেষী সঙ্গীতের জয়ের মুকুটে আরও একটি পালক।