পঞ্চম সুরের রহস্য – সত্যান্বেষী সঙ্গীত | বাংলা গোয়েন্দা গল্প

পঞ্চম সুরের রহস্য ফিচার ইমেজ

পঞ্চম সুরের রহস্য

সিরিজ: সত্যান্বেষী সঙ্গীত | লেখক: সঙ্গীত দত্ত

ভূমিকা: সত্যান্বেষী সঙ্গীত ও এক নতুন অধ্যায়

বাংলা সাহিত্যে সত্যান্বেষীদের আনাগোনা কম নয়, কিন্তু ‘সঙ্গীত’ তাদের মধ্যে একটু আলাদা। তার পুরো নাম সঙ্গীত সেন, কিন্তু নিজেকে সে পরিচয় দেয় কেবল ‘সঙ্গীত’ নামে। পেশায় সে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু নেশায় সে সত্যের সন্ধানী। শব্দের ফ্রিকোয়েন্সি, গলার স্বরের কম্পন আর সামান্যতম নয়েজ—এসব বিশ্লেষণ করেই সে অপরাধীর মনের হদিস পায়। সঙ্গীত মনে করে, “পৃথিবীর সব অপরাধের পেছনেই একটা ছন্দপতন থাকে, একটা বেসুরো নোট বাজে। সেই নোটটা ধরতে পারলেই সিম্ফনি মিলে যায়।”

তার গল্পগুলো লিখে রাখে তার দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং সহকারী, লেখক সঙ্গীত দত্ত। আজকের গল্পটি এই সিরিজের প্রথম পদক্ষেপ।

***

কলকাতার আকাশটা আজ সকাল থেকেই মুখ ভার করে আছে। টিপটিপ বৃষ্টির সাথে একটা ভ্যাপসা গরম। কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে আমার আর সঙ্গীতের পুরনো আড্ডা, ‘কফি হাউস’-এর দোতলার কোণের টেবিলটা আজ ধোঁয়া ওঠা কফির কাপেও আমাদের মন ভালো করতে পারছিল না।

সঙ্গীত একমনে জানলার বাইরের ধূসর আকাশটার দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর ফর্সা কপালে চিন্তার ভাঁজ। আমি বললাম, “কি রে, এত কি ভাবছিস? নতুন কোনো সাউন্ড মিক্সিং-এর প্রজেক্ট নাকি?”

সঙ্গীত চোখ না সরাতেই উত্তর দিল, “না রে। ভাবছি শব্দের কথা। বৃষ্টির শব্দের মধ্যেও একটা অদ্ভুত প্যাটার্ন আছে, খেয়াল করেছিস? ঠিক যেন তবলার একটা ধীর লয়ের বোল।”

ওর এই অদ্ভুত সব চিন্তাভাবনা আমার কাছে নতুন নয়। ঠিক তখনই আমার মোবাইলে একটা আননোন নাম্বার থেকে ফোন এল। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে এক ভরাট কিন্তু আতঙ্কিত গলার স্বর ভেসে এল।

“হ্যালো? আমি কি মিউজিক ডিরেক্টর এবং প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর মিস্টার সঙ্গীত সেনের সাথে কথা বলতে পারি?”

আমি ফোনটা সঙ্গীতের দিকে বাড়িয়ে দিলাম। ও লাউড স্পিকারে দিল।
“বলছি। আপনি কে?”

“আমার নাম প্রতাপ চৌধুরী। বালিগঞ্জের চৌধুরী ভিলা থেকে বলছি। আমার বাড়িতে আজ সকালে একটা ভয়াবহ চুরির ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ডাকতে পারছি না, কারণ ব্যাপারটা পারিবারিক সম্মানের। কিন্তু জিনিসটা উদ্ধার করা আমার কাছে জীবন-মরণ সমস্যা। আপনি কি একবার আসতে পারবেন?”

সঙ্গীত এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “চুরিটা কি কোনো সাধারণ জিনিসের? নাকি এমন কিছু যার সাথে কোনো আওয়াজ বা সুর জড়িয়ে আছে?”

ওপাশ থেকে ভদ্রলোক চমকে উঠলেন, “আপনি কি করে জানলেন? হ্যাঁ, চুরি গেছে আমার দাদুর আমলের একটা অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য ‘গ্রামোফোন রেকর্ড’ এবং তার সাথে যুক্ত একটি পুরনো ডায়েরি।”

সঙ্গীত মুচকি হেসে বলল, “ঠিক আছে মিস্টার চৌধুরী। আমরা আসছি। এক ঘণ্টার মধ্যে।”

***

বালিগঞ্জের চৌধুরী ভিলা বেশ পুরনো আমলের বনেদি বাড়ি। বিশাল গেট, লম্বা ড্রাইভওয়ে আর সামনে সাজানো বাগান। কিন্তু বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই একটা থমথমে পরিবেশ টের পাওয়া গেল। প্রতাপ চৌধুরী ড্রয়িং রুমে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বয়স ষাটের কোঠায়, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, পরনে দামী সিল্কের পাঞ্জাবি।

“আসুন, আসুন মিস্টার সেন,” প্রতাপবাবু আমাদের সোফায় বসতে বললেন।

সঙ্গীত কোনো ভূমিকা না করেই সরাসরি প্রশ্নে গেল, “কি হয়েছে ঠিক করে বলুন। আর পুলিশ কেন ডাকতে চাইছেন না?”

প্রতাপবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “আসলে যা চুরি গেছে, তার বাজারমূল্য খুব বেশি নয়, কিন্তু ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। আমার দাদু, রায়বাহাদুর অঘোরনাথ চৌধুরী ছিলেন একজন বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ। শোনা যায়, ১৯৩০ সালে তিনি এমন এক রাগ সৃষ্টি করেছিলেন, যা শুনলে মানুষের মস্তিষ্ক সাময়িকভাবে হিপনোটাইজড হয়ে যেতে পারে। সেই রাগের নোটেশন লেখা ছিল একটা ডায়েরিতে, আর তার একমাত্র রেকর্ডিং ছিল ওই গ্রামোফোন রেকর্ডটিতে। ওটা ভুল মানুষের হাতে পড়লে বিপদ হতে পারে।”

লাইব্রেরি ঘরটা দোতলায়। ভেতরে ঢুকতেই একটা নিস্তব্ধতা গ্রাস করল আমাদের। দেওয়াল জুড়ে বইয়ের তাক, মাঝখানে একটা বিশাল মেহগনি কাঠের টেবিল। কোণে সেই কাঁচের শো-কেস। সঙ্গীত শো-কেসটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। খুব ভালো করে পরীক্ষা করল তালাটা।

“তালাটা খোলা হয়নি, কাঁচও কাটা হয়নি। অথচ জিনিসটা নেই,” সঙ্গীত বিড়বিড় করে বলল। এরপর সে পকেট থেকে একটা ছোট ইলেকট্রনিক ডিভাইস বের করল। এটা ওর নিজের তৈরি—সাউন্ড ওয়েভ ডিটেক্টর। ওটা দিয়ে সে সারা ঘর স্ক্যান করতে লাগল।

হঠাৎ জানলার কাছে এসে যন্ত্রটা ‘বিপ-বিপ’ করে উঠল। সঙ্গীত জানলার ভারী পর্দাটা সরাল। জানলাটা ভেতর থেকে ছিটকিনি দেওয়া। সঙ্গীত আমাদের নিয়ে বাগানে গেল। লাইব্রেরি রুমের জানলাটা ঠিক যেখানে, তার নিচে নরম মাটি। সেখানে কারোর পায়ের ছাপ নেই। কিন্তু জানলার কার্নিশে একটা খুব সরু তারের দাগ লক্ষ্য করল সঙ্গীত।

ও পকেট থেকে ম্যাগনিফাইং গ্লাস বের করে জানলার কাঁচের একটা কোণ পরীক্ষা করল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “সঙ্গীত দত্ত, নোট করো। ‘রেজোন্যান্স’ বা অনুনাদ।”

আমি অবাক হয়ে তাকালাম। “মানে?”

সঙ্গীত হাসল। “মানে হলো, চোর কোনো সাধারণ চোর নয়। সে ফিজিক্স এবং মিউজিক—দুটোই জানে।”

***

রাত গভীর। বাইরে আবার ঝিরঝির বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমি আর সঙ্গীত অন্ধকার লাইব্রেরি ঘরে ঘাপটি মেরে বসে আছি। হঠাৎ জানলার দিকে একটা খটখট শব্দ হলো। আমরা নিশ্বাস বন্ধ করে ফেললাম। জানলার কাঁচের বাইরে একটা ছায়া। খুব সাবধানে কেউ একজন জানলার কাঁচের ওপর একটা ছোট যন্ত্র বসাল।

জানলাটা নিঃশব্দে খুলে গেল। একটা ছায়ামূর্তি ঘরের ভেতরে ঢুকল। সোজা এগিয়ে গেল পিয়ানোর দিকে। পিয়ানোর ঢাকনা তুলে তার ভেতর থেকে কিছু একটা বের করল। ঠিক সেই মুহূর্তে সঙ্গীত টর্চ জ্বালাল। “হ্যান্ডস আপ!”

আলোর তীব্র ঝলকানিতে লোকটা থতমত খেয়ে গেল। তার হাতে সেই চুরি যাওয়া রেকর্ড আর ডায়েরি। কিন্তু লোকটা অলোকেশ নয়! এ তো প্রতাপবাবুর ভাইপো, ঋক!

সঙ্গীত রেকর্ডটা প্রতাপবাবুর হাতে দিয়ে বলল, “মিস্টার চৌধুরী, আপনার ভাইপো মোটেও বোকা নন। বরং তিনি একজন জিনিয়াস সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। পিয়ানো টিউনার অলোকেশ আসলে ওঁরই বন্ধু। ওরা দুজনে মিলে প্ল্যানটা করেছিল।”

***

পরদিন সকালে। বৃষ্টি থেমে গেছে। আমরা আবার কফি হাউসে। আমি মুগ্ধ হয়ে বললাম, “তুই সত্যিই একটা জিনিয়াস। তোকে ‘সত্যান্বেষী’ নামটা দেওয়াই সার্থক।”

সঙ্গীত জানলার বাইরে তাকাল। রোদ উঠেছে। “বাদ দে ওসব। এখন বল, এই কেসটা নিয়ে গল্পটা কবে লিখছিস? নামটা কিন্তু আমিই ঠিক করে দেব—’পঞ্চম সুরের রহস্য’।”

আমি খাতা কলম বের করলাম। “এখনই শুরু করছি।”

Scroll to Top