
কুয়োর নিচে যে এখনো বাঁচে
ভূমিকা
গ্রাম বাংলার রাত মানেই নিস্তব্ধতা। ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক, দূরের বাঁশঝাড়ে হাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দ আর অদৃশ্য অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা অজানা ভয়। শহরের মানুষ যাকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেয়, গ্রামের মানুষ জানে— সব ভয় গল্প নয়।
চরবাকপুর তেমনই এক গ্রাম। মানচিত্রে নাম আছে, কিন্তু সন্ধ্যার পর সেখানে ঢোকার সাহস খুব কম লোকেরই হয়। কারণ গ্রামের এক প্রান্তে আছে একটা কুয়ো— যার জল কখনো শুকোয় না, অথচ কেউ সেই জল ব্যবহার করে না।
লোকেরা বলে, ওই কুয়োর নিচে কেউ এখনো বাঁচে।
গল্প
চরবাকপুরে পা রাখার প্রথম দিন থেকেই অমলের বুকটা অকারণে ভারী লাগছিল। বাতাসে কেমন একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, যেন বহু পুরোনো কিছুর পচন।
স্কুলের হেডমাস্টার তাকে বলেছিলেন, “রাতে বেশি বাইরে বেরোবেন না। গ্রামটা… একটু আলাদা।”
অমল হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। সে বিশ্বাস করত—ভয় মানুষের মনের তৈরি।
প্রথম অদ্ভুত ঘটনা ঘটে তৃতীয় রাতে।
ঘুমের মধ্যে হঠাৎ তার মনে হয়, কেউ তার নাম ধরে ডাকছে।
“অমল দাদা…”
গলাটা নারীর। কর্কশ, ভাঙা, যেন গলা শুকিয়ে ফেটে গেছে।
চোখ খুলে দেখে—ঘরের কোণে কেউ দাঁড়িয়ে।
অন্ধকারে শুধু ভেজা চুলের ঝাঁক আর শাড়ির আঁচল ঝুলছে।
অমল চিৎকার করতে গিয়েও পারে না। বুকের ভেতর শ্বাস আটকে আসে। মুহূর্তের মধ্যেই ছায়াটা মিলিয়ে যায়।
পরদিন সে গ্রামের লোকদের জিজ্ঞেস করলে সবাই একসঙ্গে কথা বন্ধ করে দেয়। কেউ কেউ চোখ এড়ায়, কেউ কেউ ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরে।
শেষে ধনেশ্বরী দিদা ধীরে বলে ওঠে, “ও তোমাকে দেখেছে।”
“কে?” অমল জিজ্ঞেস করে।
“কমলা।”
এই নাম শুনেই যেন বাতাস ভারী হয়ে যায়।
কমলা ছিল গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে। খরার সময় জল আনতে গিয়ে কুয়োতে পড়ে যায়।
লোকজন দূরে দাঁড়িয়ে দেখে, কেউ এগোয় না। কারণ তখন বিশ্বাস ছিল—দেবীর কোপ পড়েছে, জল অপবিত্র।
কমলা সারারাত বাঁচার জন্য কেঁদেছিল। কেউ শোনেনি।
“যে আমাকে জল দিল না, আমি তার ঘুম কেড়ে নেব।”
সেই রাত থেকেই অমলের ঘুম আর হয় না।
রাত বাড়লেই কুয়োর দিক থেকে শব্দ আসে—
ঢং… ঢং…
দড়ি টানার শব্দ। জল পড়ার শব্দ। আর মাঝে মাঝে, হাসি।
এক রাতে অমল সাহস করে জানালা দিয়ে তাকায়।
দেখে—কুয়োর পাশে একজন বসে আছে। চুল মাটিতে ছড়ানো, হাতে বালতি।
হঠাৎ সে মুখ তোলে।
চোখ দুটো নেই। শুধু কালো গর্ত।
অমল চিৎকার করে দরজা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু শব্দ থামে না।
তারপর শুরু হয় দুঃস্বপ্ন।
স্বপ্নে সে কুয়োর ভেতর পড়ে যাচ্ছে। দেয়ালে আঁচড়ের দাগ, রক্তাক্ত নখ।
নিচে জল নয়— হাড়, চুল, ছেঁড়া কাপড়।
আর জলের ভেতর থেকে ভেসে আসে কমলার মুখ। এইবার স্পষ্ট। এইবার খুব কাছে।
“তুমি জল দেবে?”
তার গলা থেকে পচা গন্ধ বেরোয়।
এক সকালে অমল দেখে তার গলায় নখের দাগ। সত্যিকারের দাগ।
গ্রামের পুরোহিত বলে, “ও এখন একা নেই।”
জানা যায়, কমলার পর আরও তিনজন নিখোঁজ হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। সবাই রাতের বেলা কুয়োর কাছে গিয়েছিল।
কুয়োটা শুধু আত্মা ধরে রাখে না। সে ভয় তৈরি করে।
অমাবস্যার রাতে সিদ্ধান্ত হয়—শেষ চেষ্টা।
কুয়োর নিচে নেমে যা আছে, তাকে মুখোমুখি হতে হবে।
অমল জানে, ওটাই তার ডাক।
রাত। চারদিক নিস্তব্ধ। দড়ি বেঁধে নামানো হয় তাকে।
নিচে নামতে নামতে সে শোনে— কান্না। হাসি। ফিসফাস।
দেয়ালে হাত রাখতেই মনে হয়—দেয়াল নড়ছে। জীবন্ত।
কুয়োর তলায় পৌঁছে সে দেখে—
শুধু একটামাত্র কঙ্কাল নয়।
অনেকগুলো।
সবাই একই দিকে মুখ করে। উপরে তাকানো।
হঠাৎ পেছন থেকে কেউ জড়িয়ে ধরে।
ঠান্ডা হাত। ভেজা শাড়ি।
“আমরা সবাই জল চাই,”
একসঙ্গে অনেকগুলো গলা বলে ওঠে।
দড়ি নিজে থেকেই ছিঁড়ে যায়।
উপরে যারা ছিল, তারা শুধু শোনে— হাসির শব্দ। আর হাড় ভাঙার আওয়াজ।
পরদিন সকালে কুয়োর জল কালো।
আর গ্রামের তালিকায় আরেকটা নাম যোগ হয়— অমল চক্রবর্তী, নিখোঁজ।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।
আজও চরবাকপুরে নতুন কেউ এলে, রাতে তার দরজায় টোকা পড়ে।
ঠক… ঠক…
আর ভেতর থেকে শোনা যায়,
“একটু জল দেবেন?”