রুদ্রনীল লজ
শহরের মানচিত্রে ব্রাত্য হয়ে পড়া এক পুরনো পাড়ায় নিঃসঙ্গভাবে দাঁড়িয়ে ছিল “রুদ্রনীল লজ”। একটি পরিত্যক্ত বাড়ি, যার প্রতিটি ইটে জড়িয়ে ছিল নিঃশব্দ আতঙ্ক। রাত নামলেই স্থানীয়রা বলত, ওই বাড়ির অন্দরে কেউ হাঁটে, কেউ ফিসফিস করে কথা বলে, কখনও বা ভেসে আসে রক্তের লোনা গন্ধ। কিন্তু কেউ জানত না, এই অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নৃশংস খুনের ইতিহাস—এমন এক রহস্য, যা জানলে শহরের শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাবে হিমশীতল স্রোত।
ঘটনার সূত্রপাত সেই রাতে, যেদিন সাহসী সাংবাদিক অরিন্দম সেন প্রথম পা রাখল রুদ্রনীল লজে। তার হাতে সম্বল বলতে একটি পুরনো ডায়েরি—ত্রিশ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া পুলিশ অফিসার সমীর দত্তের। ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা একটি মাত্র লাইনই অরিন্দমকে এখানে টেনে এনেছে—
“খুনি এখনো এখানেই আছে।”
অরিন্দম জানত, এটি কোনো সাধারণ প্রলাপ নয়।

বাড়ির ড্রয়িং রুমে ঢুকতেই তার চোখে পড়ল একটি শুকনো রক্তের দাগ। দাগটি গোলাকার, যেন কেউ দীর্ঘক্ষণ সেখানে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বহুবার পরিষ্কার করা সত্ত্বেও ওই দাগ মুছে যায়নি। অরিন্দম ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা তাক করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল এক অতিরিক্ত ছায়া—যা কোনো জীবিত মানুষের নয়।
রহস্যের জট আরও পাকাল যখন লজের কেয়ারটেকার হরিপদ ঘোষের লাশ আবিষ্কৃত হলো। সিঁড়ির নিচে গলা কাটা অবস্থায় পড়ে ছিলেন তিনি, চোখেমুখে জমাট বাঁধা আতঙ্ক। পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী খুনটি হয়েছে রাত তিনটেয়, অথচ সেই সময় লজ ছিল সম্পূর্ণ জনমানবহীন। অরিন্দম বুঝতে পারল, এই খুনের ধরন ত্রিশ বছর আগের সেই অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডগুলোর হুবহু নকল। শোনা যায়, প্রতিটি মৃত্যুর আগে ভুক্তভোগীরা এক নারীর কান্না শুনতে পেত।
রুদ্রনীল লজের ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে অরিন্দম জানতে পারল বাড়িটির আসল মালকিন ছিলেন কমলিনী দেবী। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এই নারীর বিরুদ্ধে স্বামী হত্যার অভিযোগ উঠেছিল একসময়। কিন্তু প্রমাণের অভাবে তিনি আইনের চোখে নির্দোষ প্রমাণিত হন। লোকের মুখে মুখে তিনি হয়ে ওঠেন ‘ডাইনি’। তবে প্রকৃত সত্য লুকিয়ে ছিল বাড়ির লাইব্রেরির পেছনে থাকা এক গোপন সুড়ঙ্গে।
সেই সুড়ঙ্গে ঢুকে অরিন্দম আবিষ্কার করল মানুষের হাড়, ছেঁড়া শাড়ির টুকরো এবং একটি কঙ্কালের পাশে পড়ে থাকা একটি পুলিশ ব্যাজ—যা নিঃসন্দেহে অফিসার সমীর দত্তের। ডায়েরির বাকি পাতাগুলো পড়তেই অরিন্দমের সামনে খুলে গেল ভয়ংকর সত্য।
কমলিনী দেবী নির্দোষ ছিলেন। প্রকৃত খুনি ছিল তার ভাই শৈলেন্দ্র। সম্পত্তির লোভে সে নিজের বোন ও দুলাভাইকে হত্যা করেছিল। ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে সমীর দত্ত সত্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাই শৈলেন্দ্র তাকেও খুন করে এই লজের অন্ধকারে চিরতরে লুকিয়ে রাখে।
হঠাৎ অরিন্দমের মনে হলো—সে একা নয়। পেছনে ভারী পায়ের শব্দ। ঘাড়ে এসে পড়ছে ঠান্ডা নিঃশ্বাস। বুক কেঁপে উঠল। আয়নায় তাকাতেই সে দেখল—এক বৃদ্ধ মানুষ, চোখে উন্মাদনা, মুখে বিকৃত হাসি, হাতে চকচকে ছুরি। শৈলেন্দ্র! কিন্তু সে তো বহু বছর আগেই মারা গেছে! তবে কি শৈলেন্দ্রর অতৃপ্ত আত্মা আজও নিজের অপরাধ ঢাকতে এই লজ পাহারা দিচ্ছে?
প্রাণভয়ে অরিন্দম ডায়েরি আর প্রমাণ বুকে চেপে ধরে দৌড়ে লজ থেকে বেরিয়ে এল। বাইরে ঘন কুয়াশা। হাঁপাতে হাঁপাতে সে একবার পেছনে তাকাল। দোতলার জানালায় দাঁড়িয়ে ছিল শৈলেন্দ্র—অবিকল জীবিত মানুষের মতো। তার হাসি ছিল নরকের দরজার মতো ভয়ংকর।
পরদিন শহরের সংবাদপত্রে বড় শিরোনাম ছাপা হলো— “সাংবাদিক অরিন্দম সেন নিখোঁজ।”
পুলিশ রুদ্রনীল লজ তল্লাশি করে কিছুই পেল না। শুধু পাওয়া গেল একটি পুরনো ডায়েরি—সমীর দত্তের।
রুদ্রনীল লজ আজও দাঁড়িয়ে আছে, তার বুকভরা অন্ধকার আর অতৃপ্ত রহস্য নিয়ে। রাত গভীর হলেই শোনা যায় কলমের খসখস শব্দ, যেন কেউ শিকারের তালিকায় নতুন কোনো নাম যোগ করছে।