অভিশপ্ত আয়না ও নিষিদ্ধ ঘর

গল্প সংক্ষেপ
উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সের জঙ্গলে এক ঝড়ের রাতে ফটোগ্রাফার অনির্বাণ আশ্রয় নেয় রহস্যময় ‘রায়চৌধুরী ভিলা’য়। কেয়ারটেকার হরেখুড়োর কঠোর বারণ সত্ত্বেও কৌতূহলবশত সে প্রবেশ করে দোতলার নিষিদ্ধ ঘরে। সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল এক অভিশপ্ত আয়না এবং এক অতৃপ্ত আত্মা।
উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সের জঙ্গল তখন ঘন কুয়াশায় ঢাকা। অনির্বাণ জানত না যে এই পথেই তার জন্য অপেক্ষা করছে অভিশপ্ত আয়না ও নিষিদ্ধ ঘর-এর এক হাড়হিম করা অভিজ্ঞতা। রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। অনির্বাণের গাড়ির হেডলাইট সেই কুয়াশার চাদর ভেদ করতে হিমশিম খাচ্ছে। গুগল ম্যাপে সিগন্যাল উধাও হয়ে গেছে আধঘন্টা আগেই। অনির্বাণ পেশায় একজন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার, পুরনো জমিদার বাড়ি আর ধ্বংসাবশেষের ছবি তোলাই তার নেশা। খবর পেয়েছিল, এই জঙ্গলের গভীরে ‘নিঝুমগড়’ নামে এক পরিত্যক্ত রাজবাড়ি আছে, যার স্থাপত্যশৈলী দেখবার মতো।
হঠাৎ ইঞ্জিনে একটা অদ্ভুত শব্দ হলো, আর তারপরই গাড়িটা কয়েকবার হেঁচকি দিয়ে মাঝ রাস্তায় থেমে গেল। অনির্বাণ বেশ কয়েকবার ইগনিশন চাবি ঘোরাল, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। চারপাশ শুনশান, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরের কোনো পাহাড়ি ঝর্ণার আওয়াজ। বাধ্য হয়ে গাড়ি থেকে নামল সে। মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে বনেট খুলে দেখল, ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আজ রাতে এই গাড়ি আর নড়বে না।
দূরে জঙ্গলের আড়ালে একটা ক্ষীণ আলো জ্বলতে দেখা গেল। কোনো উপায় না দেখে অনির্বাণ সেদিকেই হাঁটা শুরু করল। পায়ে চলা পথটা ভিজে স্যাঁতসেঁতে, দুপাশে বড় বড় শাল আর সেগুন গাছগুলো যেন অন্ধকারের প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় পনেরো মিনিট হাঁটার পর সে এসে পৌঁছাল এক বিশাল লোহার গেটের সামনে। গেটটা মরচে ধরে প্রায় ভেঙে পড়েছে, তার ওপর লেখা— “রায়চৌধুরী ভিলা”।
ভিতরে ঢুকতেই নজরে এল এক বিশাল পুরনো আমলের বাড়ি। দেওয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে, বটগাছের শিকড় গেড়ে বসেছে ছাদের কার্নিশে। কিন্তু দোতলার একটা ঘরে টিমটিম করে আলো জ্বলছে। অনির্বাণ সাহস সঞ্চয় করে প্রধান দরজায় কড়া নাড়ল।
বেশ কিছুক্ষণ পর, ভারী কাঠের দরজাটা ক্যাঁক করে আওয়াজ তুলে খুলে গেল। সামনে এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। হাতে হ্যারিকেন। গায়ের চামড়া কুঁচকে গেছে, কোটরাগত চোখ দুটো ঘোলাটে।
“কে?”— বৃদ্ধের গলার স্বর যেন পাতাল থেকে উঠে এল।
অনির্বাণ নিজের পরিস্থিতির কথা জানাল। বৃদ্ধ কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, “ভিতরে এসো। আজ অমাবস্যা, এই রাতে বাইরে থাকা নিরাপদ নয়।”
অনির্বাণ ভিতরে ঢুকল। বাড়ির ভিতরটা বাইরের চেয়েও বেশি ঠান্ডা। বাতাসে কেমন একটা পুরনো বই আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধের সাথে কপুরের গন্ধ মেশানো। বৃদ্ধ তাকে নিচতলার একটা ঘরে নিয়ে গেল। ঘরটা বেশ পরিষ্কার, তবে আসবাবপত্র সব পুরনো আমলের।
“আমি হরেখুড়ো, এ বাড়ির কেয়ারটেকার,” বৃদ্ধ বলল। “তুমি এই ঘরে বিশ্রাম নাও। কিন্তু সাবধান, দোতলায় যেও না। ওটা নিষিদ্ধ।”
“কেন?” অনির্বাণের কৌতূহলী প্রশ্ন।
হরেখুড়ো হ্যারিকেনটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বলল, “কারণ ওখানে যারা যায়, তারা আর ফেরে না। রায়চৌধুরীদের ছোট গিন্নির ঘর ওটা। পঞ্চাশ বছর আগে আজকের এই তিথিতেই…” কথা শেষ না করেই হরেখুড়ো থামল। তার চোখে আতঙ্কের ছাপ। “শুয়ে পড়ো, আর দরজা খুলো না।”
বৃদ্ধ চলে যাওয়ার পর অনির্বাণ দরজাটা ভালো করে ছিটকিনি দিয়ে বন্ধ করল। ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিতেই ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল। কিন্তু সেই ঘুম বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
রাত তখন সম্ভবত দুটো। একটা নুপূরের আওয়াজে অনির্বাণের ঘুম ভেঙে গেল। রুনঝুন… রুনঝুন… শব্দটা খুব কাছে নয়, আবার খুব দূরেও নয়। মনে হচ্ছে দোতলা থেকে আসছে। অনির্বাণের যুক্তিবাদী মন বলল, হয়তো বাতাসের শব্দ। কিন্তু তারপরেই শোনা গেল এক অস্ফুট কান্নার আওয়াজ। কোনো নারীর কান্না, যা ক্রমশ হাহাকারে পরিণত হচ্ছে।
অনির্বাণ বিছানা থেকে উঠল। হরেখুড়োর বারণ সত্ত্বেও কৌতূহল তাকে পেয়ে বসল। সে টর্চটা নিয়ে সন্তর্পণে দরজা খুলল। করিডোর অন্ধকার, শুধু জানলা দিয়ে আসা চাঁদের নীলাভ আভায় ধুলোবালিগুলো ভাসতে দেখা যাচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ওঠার সময় কাঠের ধাপগুলো করুণ আর্তনাদ করে উঠল।
দোতলায় উঠতেই এক হিমশীতল হাওয়া তাকে ধাক্কা দিল। এখানকার বাতাস অনেক বেশি ভারী। সামনে লম্বা করিডোর, তার শেষ প্রান্তে একটা বড় দরজা। কান্নার আওয়াজটা ওখান থেকেই আসছে। অনির্বাণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে গেল। দরজার হাতল ঘোরাতেই সেটা খুলে গেল।
ঘরটা বিশাল। মাঝখানে এক বিশাল পালঙ্ক, যার মশারিটা ছিঁড়ে ঝুলে আছে। ঘরের এক কোণে একটা মানুষ সমান বড় আয়না। আর সেই আয়নার সামনে বসে আছে এক নারী। তার পরনে লাল বেনারসি, পিঠভর্তি খোলা চুল। সে আয়নার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
“কে? কে আপনি?”— তার গলা দিয়ে স্বর বেরোতে চাইল না।
মহিলাটি কান্না থামাল। ধীরে ধীরে সে অনির্বাণের দিকে না ঘুরে, আয়নার ভিতর দিয়ে অনির্বাণের দিকে তাকাল। কিন্তু আয়নায় যা দেখা গেল, তা দেখে অনির্বাণের রক্ত হিম হয়ে গেল। আয়নায় মহিলাটির মুখ দেখা যাচ্ছে না, দেখা যাচ্ছে এক পচা-গলা কঙ্কালসার মুখ, যার চোখের কোটরে আগুনের মতো লাল দুটো বিন্দু জ্বলছে!
অনির্বাণ চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু পারল না। হঠাৎ দড়াম করে দরজাটা তার পিছনে বন্ধ হয়ে গেল। ঘরের মোমবাতিগুলো দপ করে জ্বলে উঠল। মহিলাটি এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সে ঘুরল। বাস্তবে তার মুখ অসম্ভব সুন্দর, কিন্তু তার গলার কাছে এক গভীর ক্ষতের দাগ, যেখান থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে।
“তুমি এসেছ?” মহিলাটি ফিসফিস করে বলল। “হরেখুড়ো কি তোমাকে বলেনি? আজ আমার জাগরণ।”
অনির্বাণ পেছাতে পেছাতে দরজায় ধাক্কা খেল। দরজা খুলছে না। মহিলাটি হাওয়ায় ভাসার মতো করে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
“আমাকে মুক্ত করো,” সে বলল। “ওই আয়নাটা… ওটাই আমার নরক। ওটাকে ভাঙো!”
অনির্বাণ বুঝতে পারল না সে কী করবে। মহিলাটি হঠাৎ বিকট চিৎকার করে উঠল, আর তার সুন্দর মুখটা পাল্টে গিয়ে সেই আয়নার কঙ্কালসার রূপ ধারণ করল। সে হাত বাড়িয়ে অনির্বাণের গলা টিপে ধরতে চাইল। অনির্বাণ প্রাণভয়ে হাতের টর্চটা ছুড়ে মারল আয়নাটার দিকে।
ঝনঝন!
বিশাল আয়নাটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সাথে সাথে এক বিকট আর্তনাদ শোনা গেল, যা মানুষের গলার নয়। ঘরটা কাঁপতে শুরু করল। মনে হলো ভূমিকম্প হচ্ছে। ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়তে লাগল। ওই ছায়ামূর্তিটা কালো ধোঁয়ায় পরিণত হয়ে মেঝের ফাটল দিয়ে নিচে ঢুকে গেল।
অনির্বাণ কোনোক্রমে দরজাটা ভেঙে বাইরে বেরিয়ে এল। কিন্তু করিডোর দিয়ে দৌড়াতে গিয়ে সে দেখল, সিঁড়িটা আর নেই! সেখানে শুধু শূন্যতা। নিচে তাকালে মনে হচ্ছে অনন্ত গভীর এক খাদ। সে বুঝল, বাড়িটা তার ভৌতিক রূপ ধারণ করেছে।
হঠাৎ তার কাঁধে কারোর হাত পড়ল। অনির্বাণ চমকে ঘুরে দেখল হরেখুড়ো। কিন্তু হরেখুড়োর চেহারা এখন আর সেই দুর্বল বৃদ্ধের মতো নয়। তার শরীর থেকে মাংস খসে পড়ছে, হাড় বেরিয়ে আছে।
“তোমাকে বারণ করেছিলাম, তাই না?” হরেখুড়ো শয়তানের মতো হেসে উঠল। “আয়নাটা ভেঙে তুমি ছোট গিন্নিকে মুক্তি দিলে ঠিকই, কিন্তু এখন তার জায়গায় এই আয়নায় বন্দি হওয়ার জন্য নতুন আত্মার প্রয়োজন। আর সেটা তুমি!”
অনির্বাণ বুঝতে পারল, হরেখুড়ো কোনো সাধারণ মানুষ নয়, সে-ও এই অভিশপ্ত বাড়িরই এক অংশ। অনির্বাণ প্রাণপণে হরেখুড়োকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল এবং পাশের একটা জানলা দিয়ে সোজা নিচে লাফ দিল। নিচে ঝোপঝাড় ছিল বলে হাড় ভাঙল না, কিন্তু শরীর ছড়ে গেল। সে আর পিছনে তাকাল না। অন্ধকারের মধ্যেই জঙ্গলের পথ ধরে দৌড়াতে শুরু করল। পিছনে শোনা যাচ্ছে হরেখুড়োর অমানবিক হাসি আর বাড়ির ইট খসে পড়ার আওয়াজ।
কতক্ষণ দৌড়েছিল তার মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন ভোর হয়েছে। সে রাস্তার ধারে পড়ে আছে। দূরে কিছু লোক জটলা করছে। একজন লরি ড্রাইভার তাকে জল খাওয়াল।
“বাবু, আপনি ঠিক আছেন? এই জঙ্গলের রাস্তায় রাতে একা কী করছিলেন?”
অনির্বাণ কাঁপতে কাঁপতে আঙুল তুলে জঙ্গলের দিকে দেখাল। “ওই… ওই ভিলা… রায়চৌধুরী ভিলা…”
ড্রাইভার আর স্থানীয় লোকেরা একে অপরের দিকে তাকাল। একজন বয়স্ক লোক বলল, “রায়চৌধুরী ভিলা? বাবু, ও বাড়ি তো পঞ্চাশ বছর আগেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ওখানে তো এখন শুধু জঙ্গল আর ইটের পাঁজা। কেউ ওখানে যায় না।”
অনির্বাণ বিশ্বাস করতে পারল না। সে উঠে দাঁড়াল। “কিন্তু… কিন্তু আমার গাড়ি? হরেখুড়ো?”
লোকেরা তাকে নিয়ে গেল সেই জায়গায়। অনির্বাণের গাড়িটা সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কাল রাতে খারাপ হয়েছিল। কিন্তু গেটটা? সেই ‘রায়চৌধুরী ভিলা’র গেট? সেখানে শুধু দুটো ভাঙা থাম দাঁড়িয়ে আছে। আর তার পিছনে ঘন জঙ্গল। কোনো বাড়ির অস্তিত্ব নেই।
অনির্বাণ স্তম্ভিত হয়ে ধ্বংসস্তূপের দিকে এগিয়ে গেল। জঙ্গলের ঝোপঝাড়ের মধ্যে পড়ে আছে একটা ভাঙা আয়নার ফ্রেম। আর তার ঠিক পাশেই পড়ে আছে একটা পুরনো আমলের হ্যারিকেন, যেটা দেখে মনে হচ্ছে যেন বহু বছর ধরে ওখানেই পড়ে আছে। কিন্তু হ্যারিকেনের কাঁচটা অদ্ভুতভাবে পরিষ্কার, আর তাতে এখনো সামান্য তেলের গন্ধ লেগে আছে।
সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, অনির্বাণ যখন গাড়ির রিয়ার-ভিউ মিররে নিজের মুখ দেখল, সে শিউরে উঠল। তার গলার কাছে আবছা লাল আঙুলের ছাপ, যেন কেউ খুব জোরে তার গলা টিপে ধরেছিল। আর সেই ছাপগুলো মানুষের আঙুলের মতো নয়, বরং অস্বাভাবিক লম্বা আর হাড়সার।
অনির্বাণ আর এক মুহূর্ত দেরি না করে গাড়িতে স্টার্ট দিল। এবার এক চান্সেই ইঞ্জিন চালু হলো। সে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু তার মনে হলো, গাড়ির পেছনের সিটে যেন একটা ঠান্ডা নিশ্বাস পড়ছে।
সে রিয়ার-ভিউ মিররে তাকাল না। সে জানে, তাকালেই হয়তো সে দেখতে পাবে সেই লাল বেনারসি পরা ছায়ামূর্তি বা হরেখুড়োর সেই মাংসহীন মুখ। কারণ, অভিশপ্ত আয়নাটা ভাঙলেও, সেটার টুকরোগুলো হয়তো এখনো তার আত্মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
— সমাপ্ত —