মায়াবনের কালো ছায়া
লেখক: সঙ্গীত দত্ত

১ প্রথম পরিচ্ছেদ: ঝড়ের রাত ও একটি মৃত্যু
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ চিরে মাঝে মাঝে দপ করে জ্বলে উঠছে বিজলি, আর তার পরেই কান ফাটানো মেঘের গর্জন। পুরুলিয়ার রুক্ষ মাটির বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ‘মায়াবন’ রাজবাড়িটাকে আজ যেন আরও বেশি ভুতুড়ে মনে হচ্ছে। চারপাশ গ্রাস করেছে এক রহস্যময় মায়াবনের কালো ছায়া, যা আজ রাতের অন্ধকারকে আরও গভীর করে তুলেছে।
রাত তখন আড়াইটে। রাজবাড়ির প্রকাণ্ড লাইব্রেরি ঘরের দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল না, কিন্তু বাইরের বারান্দায় যে আর্তনাদটা শোনা গেল, তাতেই বাড়ির সকলে সচকিত হয়ে উঠল।
মায়াবনের বর্তমান মালিক, সত্তর বছর বয়সী আদিত্যনারায়ণ চৌধুরী তাঁর আরামকেদারায় এলিয়ে পড়ে আছেন। তাঁর চোখ দুটো বড় বড় করে খোলা, যেন মৃত্যুর মুহূর্তে কোনো বিভীষিকা দেখেছিলেন তিনি। ঠোঁটের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া সাদা ফেনা এখন শুকিয়ে গেছে। সামনে মেহগনি কাঠের টেবিলে রাখা এক গ্লাস দুধ, যার অর্ধেকটা খাওয়া।
বাড়ির কাজের লোক বিমল প্রথম লাশটা দেখেছিল। তার চিৎকারের শব্দেই ছুটে এসেছিলেন আদিত্যনারায়ণের ছোট স্ত্রী নন্দিনী এবং তাঁর প্রথম পক্ষের ছেলে কৌশিক।
ঘন্টাখানেকের মধ্যেই পুলিশ এল, আর তাদের সঙ্গেই এলেন রুদ্রপ্রতাপ। রুদ্রপ্রতাপ রায়—শহরের বিখ্যাত প্রাইভেট ডিটেকটিভ। আদিত্যনারায়ণ যেন জানতেন তাঁর বিপদ আসন্ন, তাই দুদিন আগেই তিনি রুদ্রকে চিঠি লিখে তলব করেছিলেন। কিন্তু রুদ্র পৌঁছতে একটু দেরি করে ফেললেন।
ইন্সপেক্টর সমীরণ হালদার লাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মিস্টার রায়, মনে হচ্ছে হার্ট অ্যাটাক। ওনার তো হার্টের ব্যামো ছিলই।”
রুদ্রপ্রতাপ ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন লাশের দিকে। তিনি নিচু হয়ে মৃতদেহের মুখের কাছে নাক নিয়ে গিয়ে শুঁকলেন। তারপর টেবিলের ওপর রাখা দুধের গ্লাসটা হাতে তুলে নিলেন।
“না ইন্সপেক্টর, এটা হার্ট অ্যাটাক নয়,” রুদ্রর গম্ভীর গলার স্বরে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। “দুধের গ্লাস থেকে এবং ওনার মুখ থেকে হালকা তেতো কাজুবাদামের গন্ধ আসছে। এটা সায়ানাইড পয়জনিং। পটাশিয়াম সায়ানাইড।”
ঘরের মধ্যে উপস্থিত সকলের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। নন্দিনী দেবী শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। কৌশিক জানলার দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রুদ্রপ্রতাপ পকেট থেকে নিজের নোটবুক বের করে বললেন, “ইন্সপেক্টর, বডি পোস্টমর্টেমে পাঠান। আর আমি এখন এই বাড়ির প্রত্যেককে জেরা করতে চাই। কেউ যেন বাড়ি ছেড়ে বের না হয়।”
২ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: সন্দেহভাজনদের তালিকা
লাইব্রেরি সংলগ্ন ড্রয়িংরুমে রুদ্রপ্রতাপ সোফায় বসে আছেন। বাইরে ঝড় তখনো থামেনি। একে একে তিনি সবাইকে ডাকলেন।
১. নন্দিনী চৌধুরী (৩৫)
আদিত্যনারায়ণের দ্বিতীয় স্ত্রী। সুন্দরী, কিন্তু চোখেমুখে একটা কঠোর ছাপ।
নন্দিনী সোফায় বসে বললেন, “আমি জানতাম ওনার অনেক শত্রু, কিন্তু তাই বলে কেউ ওনাকে মেরে ফেলবে?”
রুদ্র প্রশ্ন করলেন, “মিসেস চৌধুরী, রাত দশটার পর আপনি কোথায় ছিলেন?”
“আমি আমার ঘরে ছিলাম। মাইগ্রেনের ব্যথা ছিল খুব, তাই ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। বিমলের চিৎকার শুনে আমার ঘুম ভাঙ্গে।”
“আপনার স্বামীর সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?”
নন্দিনী একটু হাসলেন, মলিন হাসি। “খুব একটা ভালো ছিল না। উনি আমাকে সন্দেহ করতেন। আর বয়সের এত তফাত… তাছাড়া উনি ওনার সমস্ত সম্পত্তি ট্রাস্টকে দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, সেটা নিয়ে আমাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছিল কাল রাতে।”
২. কৌশিক চৌধুরী (৩২)
প্রথম পক্ষের ছেলে। জুয়ায় আসক্ত এবং প্রচুর দেনায় ডুবে আছে।
কৌশিক ঘরে ঢুকেই বলল, “দেখুন মিস্টার ডিটেকটিভ, আমি বাবাকে মারিনি। হ্যাঁ, আমি টাকার জন্য এসেছিলাম, কিন্তু খুন আমি করিনি।”
রুদ্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। “কাল রাতে আপনার বাবার সাথে আপনার কী কথা হয়েছিল?”
“বাবা আমাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তিনি আমাকে কানাকড়িও দেবেন না। উল্টে উইল পরিবর্তন করে সব সম্পত্তি ওই নতুন ট্রাস্ট আর ওনার ওই ‘সাধ্বী’ স্ত্রী নন্দিনীকে দেওয়ার প্ল্যান করছিলেন। আমার রাগ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আমি লাউঞ্জে বসে মদ খাচ্ছিলাম। বাবার ঘরে যাইনি।”
“কেউ কি আপনাকে লাউঞ্জে দেখেছিল?”
“না, সবাই তখন যে যার ঘরে।”
৩. বিমল (৫০)
গত পঁচিশ বছর ধরে এই বাড়ির ম্যানেজারের কাজ করছে। বিশ্বস্ত কিন্তু ভীতু প্রকৃতির।
বিমল কামপা কাঁপা গলায় বলল, “স্যার, আমি রাত দশটায় ছোটবাবু মানে আদিত্য স্যারের জন্য দুধ নিয়ে গিয়েছিলাম। উনি রোজ রাতে দুধ খান। আমি দুধটা টেবিলে রেখে বেরিয়ে আসি। উনি তখনো বেঁচে ছিলেন, উইল-এর খসড়া পড়ছিলেন।”
“দুধটা কে তৈরি করেছিল?”
“রান্নাঘরে রাধুনি মাসি তৈরি করে রেখে গিয়েছিল। আমি শুধু গরম করে গ্লাসে ঢেলে নিয়ে গিয়েছিলাম।”
“গ্লাসটা কি আপনার চোখের আড়ালে ছিল কখনো?”
বিমল একটু ভাবল। “হ্যাঁ, দুধ গরম করার সময় ফোন এসেছিল। আমি মিনিট দুয়েকের জন্য কিচেন থেকে বেরিয়ে হলের ল্যান্ডলাইনটা ধরতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি দুধ ফুটে গেছে।”
৪. ডঃ সান্যাল (৫৫)
ফ্যামিলি ডাক্তার এবং আদিত্যনারায়ণের পুরনো বন্ধু।
ডঃ সান্যাল চশমাটা মুছতে মুছতে বললেন, “আদিত্য আমার বন্ধু ছিল। আমি কেন তাকে মারব? তবে হ্যাঁ, ও ইদানীং খুব প্যারানয়েড হয়ে গিয়েছিল। কাউকে বিশ্বাস করত না।”
৩ তৃতীয় পরিচ্ছেদ: অদৃশ্যের চাবি
জেরা শেষ করে রুদ্র আবার ক্রাইম সিন অর্থাৎ লাইব্রেরিতে ফিরে গেলেন। ইন্সপেক্টর সমীরণ তখনো সেখানে।
“কিছু পেলেন রুদ্রবাবু?”
“অনেক কিছুই, আবার কিছুই না। মোটিভ সবার আছে। নন্দিনী দেবী সম্পত্তি চান, কৌশিক দেনার দায়ে জর্জরিত, সে চায় উইল সই হওয়ার আগেই বাবার মৃত্যু হোক যাতে পুরনো উইল অনুযায়ী সে কিছু পায়। আর বিমল…”
“বিমলের কী মোটিভ?”
“সেটাই এখনো পরিষ্কার নয়,” রুদ্র লাইব্রেরির চারপাশটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু কাগজপত্র। একটা দামী ফাউন্টেন পেন খোলা অবস্থায় পড়ে আছে। আর আছে সেই অভিশপ্ত দুধের গ্লাস। রুদ্র জানলার কাছে গেলেন। জানলাগুলো ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগানো। অর্থাৎ খুনি দরজা দিয়েই এসেছে। কিন্তু বিমল দুধ দিয়ে যাওয়ার পর আদিত্যনারায়ণ কি দরজা বন্ধ করেছিলেন?
বিমলকে আবার ডাকা হলো।
“বিমল, তুমি যখন দুধ দিয়ে বেরোলে, দরজা কি লক করেছিলে?”
“না স্যার, আমি শুধু ভিড়িয়ে দিয়েছিলাম। স্যার বলেছিলেন উনি একটু পরে শুতে যাবেন।”
রুদ্র টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়লেন। “ইন্সপেক্টর, এই কাগজটা দেখুন। এটা একটা নতুন উইল-এর খসড়া। কিন্তু এতে সই নেই। কলমটা খোলা, কিন্তু কালির নিবটা শুকনো।” রুদ্র কলমটা তুলে নাকের কাছে নিলেন। তারপর পকেট থেকে একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস বের করে কার্পেটের ওপর কি যেন খুঁজতে লাগলেন। হঠাৎ তাঁর চোখ চকচক করে উঠল। টেবিলের ঠিক নিচে, কার্পেটের ওপর খুব সূক্ষ্ম, প্রায় অদৃশ্য কিছু গুঁড়ো পড়ে আছে। সাদা গুঁড়ো।
রুদ্র আঙুলের ডগায় একটু গুঁড়ো নিয়ে জিভে ছোঁয়ালেন না, শুধু গ্লাসের নিচে ভালো করে দেখলেন।
“ট্যাবলেটের গুঁড়ো,” রুদ্র বিড়বিড় করে বললেন। “কিন্তু সায়ানাইড তো লিকুইড বা ক্যাপসুল ফর্মে পাওয়া যায় না সচরাচর… যদি না…”
তিনি দ্রুত পায়ে ডঃ সান্যালের গেস্ট রুমের দিকে এগোলেন। ডঃ সান্যাল তখনো ঘুমাননি।
“ডাক্তারবাবু, আদিত্যবাবু কি নিয়মিত কোনো ওষুধ খেতেন?”
“হ্যাঁ, ব্লাড প্রেসার আর হার্টের জন্য। রোজ রাতে দুধের সাথে খেতেন।”
“ওষুধগুলো কে দিত?”
“বিমলই দেখাশোনা করত। ওষুধের বাক্স ওনার ড্রয়ারেই থাকত।”
রুদ্র আবার লাইব্রেরিতে ফিরে এলেন। ড্রয়ার খুললেন। ওষুধের একটা স্ট্রিপ। তাতে ক্যাপসুল। তিনি একটা ক্যাপসুল বের করে আলোর সামনে ধরলেন। খুব সাবধানে ক্যাপসুলটা খুললেন। ভিতরে সাদা পাউডার। “ইন্সপেক্টর, এই ক্যাপসুলগুলো ল্যাবে পাঠাতে হবে। আমার ধারণা, এর মধ্যে আসল ওষুধ নেই। কেউ আসল ওষুধ বের করে সায়ানাইড ভরে দিয়েছে।”
“কিন্তু রুদ্রবাবু,” ইন্সপেক্টর বললেন, “যদি ওষুধেই বিষ থাকে, তবে দুধের গ্লাসে বিষের গন্ধ এল কী করে?”
রুদ্র হাসলেন। “চমৎকার প্রশ্ন। সেটাই তো ধাঁধা। খুনি চেয়েছিল আমরা ভাবি বিষটা দুধে মেশানো ছিল। যাতে সন্দেহটা সরাসরি বিমলের ওপর পড়ে যে দুধটা এনেছিল। কিন্তু আদিত্যবাবু দুধ খাওয়ার আগেই বা দুধ খেতে খেতেই ওষুধটা খেয়েছিলেন। হয়তো ওষুধের তেতো ভাব কাটানোর জন্যই দুধটা খাচ্ছিলেন।”
৪ চতুর্থ পরিচ্ছেদ: নিখোঁজ লিঙ্ক
পরদিন সকাল। বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু মায়াবনের পরিবেশ থমথমে। রুদ্রপ্রতাপ সবাইকে ড্রয়িংরুমে ডেকে পাঠালেন। তিনি সবার মুখের দিকে একবার তাকালেন। “আদিত্যনারায়ণ চৌধুরীকে খুব ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে,” রুদ্র শুরু করলেন। “খুনি জানত যে আজ রাতেই আদিত্যবাবু নতুন উইলে সই করবেন। আর সেটা হলে খুনির অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেত।”
নন্দিনী দেবী বলে উঠলেন, “আপনি কী বলতে চাইছেন? কৌশিক এটা করেছে?”
কৌশিক চিৎকার করে উঠল, “মুখ সামলে কথা বলো! আমি টাকা চেয়েছি, কিন্তু বাবাকে মারিনি।”
রুদ্র হাত তুললেন। “শান্ত হন। বিষটা দুধে ছিল না, ছিল ক্যাপসুলে। কেউ অত্যন্ত নিপুণ হাতে ক্যাপসুলের ভেতর সায়ানাইড ভরে রেখেছিল। আর এই কাজটা করতে গেলে ওষুধের বাক্সে অ্যাক্সেস থাকা দরকার।”
সবাই বিমলের দিকে তাকাল। বিমল ভয়ে কাঁপছে। “না স্যার, আমি করিনি! বিশ্বাস করুন!”
“বিমল ওষুধের বাক্স দেখাশোনা করত ঠিকই,” রুদ্র বললেন, “কিন্তু গতকাল বিকেলে বিমল যখন বাজারে গিয়েছিল, তখন বাড়িতে কে কে ছিল?”
নন্দিনী বললেন, “আমি আর কৌশিক ছিলাম। আর ডঃ সান্যাল বিকেলে একবার এসেছিলেন আদিত্যর সাথে দেখা করতে।”
রুদ্র ডঃ সান্যালের দিকে ফিরলেন। “ডাক্তারবাবু, আপনি কাল বিকেলে এসেছিলেন?”
“হ্যাঁ, আদিত্যর চেকআপের জন্য। মিনিট পনেরো ছিলাম।”
“তখন কি আপনি ওষুধের বাক্সটা চেক করেছিলেন?”
“রুটিন চেকআপ হিসেবে দেখেছিলাম ওষুধ ঠিকমতো আছে কি না। তাতে কী হয়েছে?”
রুদ্র পকেট থেকে একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের প্যাকেট বের করলেন। তার মধ্যে একটা পোড়া কাগজের টুকরো। “এটা আমি লাইব্রেরির ফায়ারপ্লেসের ছাই থেকে উদ্ধার করেছি। এটা একটা কেমিক্যাল ল্যাবরেটরির রসিদ। পটাশিয়াম সায়ানাইড কেনার রসিদ। তারিখ—তিন দিন আগের। আর নাম…”
সারা ঘরে পিনপতন নিস্তব্ধতা।
রুদ্র প্যাকেটটা টেবিলের ওপর রাখলেন। “নামটা পুড়ে গেছে, কিন্তু ল্যাবের নামটা স্পষ্ট। ‘কেমিস্ট কর্নার’। আমি আজ সকালে সেখানে ফোন করেছিলাম। ওরা ডেসক্রিপশন দিয়েছে যে লোকটা সায়ানাইড কিনেছিল ‘ইঁদুর মারা’র নাম করে।”
রুদ্র এবার সোজাসুজি তাকালেন কৌশিকের দিকে।
“কৌশিকবাবু, আপনার দেনা মেটানোর জন্য আপনি কি এতটা নিচে নামতে পারেন?”
কৌশিক ঘামতে শুরু করল। “আমি… আমি কিনিনি… ওটা…”
“মিথ্যা বলবেন না!” রুদ্র ধমক দিলেন। “দোকানদার আপনাকে আইডেন্টিফাই করবে। কিন্তু…”
রুদ্র থামলেন। ঘুরে দাঁড়ালেন ডঃ সান্যালের দিকে।
“কিন্তু কৌশিকবাবু বিষটা কিনলেও, সেটা ক্যাপসুলে ভরার মতো সূক্ষ্ম হাত ওনার নেই। আর ওনার পক্ষে বাবার বেডরুমে ঢুকে ওষুধের বাক্স ঘাঁটাঘাটি করাও সম্ভব ছিল না কারণ আদিত্যবাবু ছেলেকে ঘরেই ঢুকতে দিতেন না। এই কাজটা এমন কেউ করেছে যাকে আদিত্যবাবু বিশ্বাস করতেন।”
ডঃ সান্যালের মুখটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল।
“ডাক্তারবাবু,” রুদ্র শান্ত গলায় বললেন, “কৌশিক আপনাকে ব্ল্যাকমেল করছিল, তাই না? পুরনো কোনো ভুলের সুযোগ নিয়ে? নাকি আপনি নিজেই ঋণের দায়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন কৌশিকের সাথে জুয়া খেলতে গিয়ে?”
সবাই চমকে উঠল। ডঃ সান্যাল জুয়া খেলেন?
কৌশিক এবার ভেঙে পড়ল। “হ্যাঁ! ডাক্তারকাকু আমার পার্টনার ছিল। আমরা দুজনেই প্রচুর টাকা হেরেছিলাম। বাবা উইল চেঞ্জ করে ট্রাস্ট করে দিলে আমরা পথে বসতাম। তাই…”
“তাই প্ল্যানটা আপনারা দুজনে মিলে করেছিলেন,” রুদ্রর গলায় জয়ের আভাস। “কৌশিক বিষ জোগাড় করে। আর আপনি, ডাক্তার হিসেবে ওষুধের বাক্সে হাত দেওয়ার সুযোগ নিয়ে ক্যাপসুলটা বদলে দেন। গতকাল বিকেলে চেকআপের নাম করে আপনি এই কাজটা করেন। আপনারা ভেবেছিলেন পুলিশ ভাববে হার্ট অ্যাটাক। আর যদি বিষ ধরাও পড়ে, দোষটা যাবে বিমলের ওপর কারণ ও দুধ দিত। কিন্তু আপনারা একটা ভুল করেছেন।”
“ভুল?” ডঃ সান্যাল এতক্ষণে মুখ খুললেন।
“হ্যাঁ। ক্যাপসুলটা বদলানোর সময় আপনি তাড়াহুড়োয় আপনার চশমার একটা ছোট্ট স্ক্রু কার্পেটে ফেলে দিয়েছিলেন। খুব নগণ্য জিনিস, কিন্তু সেটা ওষুধের ড্রয়ারের ঠিক নিচেই ছিল। আর আপনার চশমার ফ্রেমের দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে—ডানদিকের ডাঁটিটা আলগা হয়ে আছে।”
ডঃ সান্যাল হাত দিয়ে নিজের চশমাটা ধরলেন। তাঁর হাত কাঁপছে।
উপসংহার
পুলিশ ইন্সপেক্টর সমীরণ হালদার এগিয়ে এসে ডঃ সান্যাল এবং কৌশিককে হাতকড়া পরালেন। রুদ্রপ্রতাপ জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বৃষ্টি থেমে রোদ উঠেছে। মায়াবনের রহস্যের কালো ছায়া সরে গেছে।
নন্দিনী দেবী এগিয়ে এলেন। “আপনাকে কীভাবে ধন্যবাদ দেব জানি না মিস্টার রায়।”
“ধন্যবাদের প্রয়োজন নেই। সত্যটা সামনে আসা দরকার ছিল,” রুদ্র হাসলেন। “তবে একটা উপদেশ, এবার সম্পত্তির দেখাশোনাটা একটু সাবধানে করবেন। টাকার গন্ধ মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়।”
রুদ্রপ্রতাপ তাঁর হ্যাটটা মাথায় দিয়ে রাজবাড়ির বিশাল দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। মায়াবন এখন শান্ত, কিন্তু এই দেয়ালগুলো সাক্ষী হয়ে রইল এক জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতার।
আরও পড়ুন রোমহর্ষক গল্প:
সমাপ্ত