পবিত্র নরক
একটি ক্রাইম থ্রিলার

অধ্যায় ১: প্রথম সূত্র
কলকাতার উপকণ্ঠে তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। ব্যারাকপুর হাইওয়ের ধারে এক পরিত্যক্ত কারখানার পেছনে ঝোপের আড়ালে আবছা অন্ধকারে নীলবাতি লাগানো জিপের ভিড়। ইন্সপেক্টর অনির্বাণ সেন রেইনকোটের কলারটা তুলে দিয়ে লাশের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
দৃশ্যটা বীভৎস। একটি বছর কুড়ির মেয়ে। তার শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মেয়েটির পরনে কোনো আধুনিক পোশাক নেই। তাকে জোর করে একটি লাল বেনারসি শাড়ি পরানো হয়েছে। শাড়িটা নিখুঁতভাবে জড়ানো, যেন কোনো পুতুলকে সাজানো হয়েছে। কিন্তু শাড়ির নিচ থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্তই বলে দিচ্ছে, ভেতরে কী নারকীয় অত্যাচার চালানো হয়েছে।
ফরেনসিক এক্সপার্ট ডা. লাহিড়ী অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন। “স্যার, শরীরে অন্তত ত্রিশটা সেলাইয়ের দাগ। মেয়েটিকে মারা হয়েছে খুব ধীরে। মৃত্যুর কারণ অত্যধিক রক্তক্ষরণ নয়, বরং যন্ত্রণার শক। আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, খুনী মেয়েটির হাতের মুঠোয় একটা চিরকুট গুঁজে দিয়েছে।”
অনির্বাণ গ্লাভস পরা হাতে রক্তমাখা চিরকুটটা নিলেন। তাতে গোটা গোটা অক্ষরে, লাল কালিতে লেখা প্রাচীন পুঁথির মতো একটি শ্লোক:
অনির্বাণ দাঁতে দাঁত চাপলেন। গত দুই মাসে এটি তৃতীয় খুন। প্যাটার্ন এক। টিনেজার বা কলেজ পড়ুয়া মেয়ে, যারা জিন্স বা স্কার্ট পরে বাইরে বেরিয়েছিল। খুনী তাদের অপহরণ করে, তারপর দিনের পর দিন আটকে রেখে ‘শুদ্ধিকরণ’-এর নামে নরক যন্ত্রণা দেয়।
অধ্যায় ২: ছায়ামানব
শহরের এক অন্ধকার গলির শেষ প্রান্তে, মাটির তলার এক স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে বসে ছিল সোমনাথ। ঘরের চারদেয়ালে টাঙানো অজস্র ছবি। সব ছবিই কমবয়েসী মেয়েদের, যারা স্লিভলেস টপ বা শর্ট ড্রেস পরে রাস্তায় হাঁটছে। সোমনাথের চোখে এই ছবিগুলো কোনো সাধারণ ছবি নয়, এগুলো তার কাছে পাপের দলিল।
সোমনাথের বয়স পঁয়তাল্লিশের কোঠায়। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কপালে সর্বদা একটা চন্দন বা তিলকের ফোঁটা। সে পেশায় দর্জি ছিল একসময়, কিন্তু এখন সে নিজেকে মনে করে ‘ধর্মের রক্ষক’। তার ছোটবেলায় দেখা এক ট্রমা তাকে এই বিকৃত পথে নামিয়েছে।
টেবিলের ওপর রাখা একটা ম্যানিকুইন। সোমনাথ খুব যত্ন করে একটা সালোয়ার কামিজ সেলাই করছে। তার বিড়বিড় করা আওয়াজ ঘরের নিস্তব্ধতা ভাঙছে।
“তোমরা বোঝো না… তোমরা অবুঝ। শরীর দেখিয়ে তোমরা শয়তানকে আমন্ত্রণ জানাও। আমি তোমাদের বাঁচাই। একটু কষ্ট হয়, কিন্তু শেষে তোমরা পবিত্র হয়ে স্বর্গে যাও।”
তার ঘরের কোণায় একটা লোহার খাঁচা। সেখানে গুটিসুটি মেরে বসে আছে আজকের শিকার—শ্রেয়া। বছর উনিশের মেয়েটা কলেজ থেকে ফিরছিল। পরনে ছিল একটা ডেনিম শর্টস আর টি-শার্ট। এখন তার সেই পোশাক ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে মাটিতে ফেলা। তার শরীরে নতুন কাপড়ের মতো করে সুতোর সেলাই দেওয়া হয়েছে। মেয়েটা যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে, গলার স্বর আর বেরোচ্ছে না।
সোমনাথ ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। হাতে একটা পুরনো ধর্মগ্রন্থ। সে মোলায়েম গলায় বলল, “মা, কাঁদছ কেন? আমি তো তোমাকে শেখাচ্ছি। এই যে দেখছ শ্লোকে কী লেখা আছে—’অঙ্গ আবৃত না রাখিলে দৃষ্টি হয় কলুষিত’। আমি তোমার সেই কলুষতা দূর করছি। কাল তোমার মুক্তি।”
অধ্যায় ৩: ধাওয়া
লালবাজারে অনির্বাণের টেবিলে ফাইলের স্তূপ। সে এবং তার জুনিয়র অফিসার রাকেশ দিনরাত এক করে ফেলছে।
“স্যার, সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে আমরা একটা প্যাটার্ন পেয়েছি,” রাকেশ উত্তেজিত হয়ে ল্যাপটপ ঘুরিয়ে দেখাল। “প্রতিটা অপহরণের স্পট থেকে কিছুটা দূরে একটা পুরনো মডেলের মারুতি ভ্যান দেখা গেছে। গাড়ির নম্বর প্লেট ফেক, কিন্তু পেছনের কাঁচে একটা স্টিকার আছে—’মায়ের আশীর্বাদ’।”
অনির্বাণ জুম করে দেখলেন। “গুড। আর ওই শ্লোকগুলো? ওগুলো কি কোনো নির্দিষ্ট বইয়ের?”
“না স্যার,” রাকেশ বলল, “আমরা সংস্কৃত বিশারদদের দেখিয়েছি। ওগুলো আসলে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের লাইন বিকৃত করে নিজের মতো বানানো। খুনী খুব সম্ভবত কোনো উগ্র মতবাদে বিশ্বাসী, যে নিজেকে কোনো কাল্পনিক মিশনের অংশ মনে করে।”
ঠিক তখনই অনির্বাণের ফোন বেজে উঠল। খবর এল, সল্টলেকের কাছে এক কলেজ ছাত্রী নিখোঁজ। নাম শ্রেয়া। অনির্বাণের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। সে জানে, এই খুনী মেয়েদের মেরে ফেলার আগে ৪৮ ঘণ্টা সময় নেয়। হাতে খুব কম সময়।
অধ্যায় ৪: পবিত্রতার নামে পৈশাচিকতা
সোমনাথের ডেরায় তখন এক ভয়াবহ দৃশ্য। সে একটা বড় কাঁচি গরম করছে আগুনের শিখায়। শ্রেয়া জ্ঞান হারানোর উপক্রম। সোমনাথ তাকে বোঝাচ্ছে, “শরীর নশ্বর, মা। কিন্তু সংস্কার অবিনশ্বর। তুমি যে ছোট জামাটা পরেছিলে, ওটা তোমার আত্মার লজ্জা। আমি তোমাকে এখন এমন পোশাক পরাব যা তুমি কখনো খুলতে পারবে না।”
সে গরম কাঁচিটা নিয়ে এগিয়ে আসতেই শ্রেয়া চিৎকার করে উঠল। কিন্তু এই সাউন্ডপ্রুফ বেসমেন্টে সেই চিৎকার শোনার কেউ নেই। সোমনাথ শান্ত গলায় শ্লোক আওড়াতে লাগল, “অগ্নি যেমন স্বর্ণকে খাদমুক্ত করে, যন্ত্রণাও আত্মাকে শুদ্ধ করে…”
অধ্যায় ৫: সূত্র এবং সন্ধান
রাকেশের টিম একটা বড় লিড পেল। উত্তর কলকাতার এক পুরনো দর্জি, নাম সোমনাথ চ্যাটার্জি, তিন বছর আগে তার নিজের স্ত্রীকে খুন করার চেষ্টা করেছিল কারণ স্ত্রী স্লিভলেস ব্লাউজ পরেছিল। তারপর থেকে সে পলাতক। তার পুরনো দোকানের নাম ছিল ‘মায়ের আশীর্বাদ টেলার্স’!
অনির্বাণ টেবিলে ঘুষি মারলেন। “গাড়িটা! গাড়ির পেছনে ওই স্টিকারটা ছিল। লোকেশন ট্রেস করো। সোমনাথের কোনো পুরনো আস্তানা বা পৈতৃক বাড়ি?”
“স্যার, গঙ্গার ধারে কাশীপুর এরিয়ায় ওদের একটা পরিত্যক্ত গোডাউন আছে। জায়গাটা নির্জন,” রাকেশ জানাল।
“ফোর্স রেডি করো। এখনই বেরোবো। সাইলেন্ট অপারেশন। শ্রেয়াকে জীবিত চাই।”
অধ্যায় ৬: অপারেশন মোক্ষ
কাশীপুরের সেই পুরনো গোডাউনটা জঙ্গল আর আগাছায় ঢাকা। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। অনির্বাণ ও তার স্পেশাল ফোর্স নিঃশব্দে ঘিরে ফেলল বাড়িটা। বৃষ্টির রাত, তাই পায়ের শব্দ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
অনির্বাণ ইশারায় দরজা ভাঙার নির্দেশ দিলেন। দরজা ভাঙতেই ভ্যাপসা গন্ধ আর ধূপের গন্ধ নাকে এল। তারা টর্চ জ্বেলে ভেতরে ঢুকল। ওপরের তলা ফাঁকা। কিন্তু মাটির নিচ থেকে একটা গোঙানির শব্দ আসছে।
সিঁড়ি দিয়ে নামতেই দৃশ্যটা দেখে পুলিশদেরও হাত কেঁপে উঠল। ঘরের মাঝখানে একটা যজ্ঞকুণ্ড সাজানো। শ্রেয়াকে একটা কাঠের ফ্রেমে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার সারা শরীরে কাটাছেঁড়া, রক্তে ভেসে যাচ্ছে। আর সোমনাথ তার সামনে বসে মন্ত্র পড়ছে, হাতে একটা বড় ছুরি।
“পুলিশ!” সোমনাথ চিৎকার করে উঠল। তার মুখে ভয়ের বদলে এক অদ্ভুত হাসি। “তোমরা এসেছ? তোমরাও কি পাপের অংশীদার হতে চাও? আমি ওকে মুক্তি দিচ্ছি!”
সে ছুরিটা তুলে শ্রেয়ার গলার দিকে এগিয়ে গেল।
“সোমনাথ! থামো!” অনির্বাণ বন্দুক তাক করে গর্জন করলেন। “ওকে ছেড়ে দাও। তোমার খেলা শেষ।”
সোমনাথ হাসল। “খেলা? এটা খেলা নয় ইন্সপেক্টর। এটা ধর্মযুদ্ধ। কলিযুগে তোমরা নারীদের পণ্য বানিয়েছ, আমি তাদের দেবী বানাচ্ছি।”
এই বলে সে ছুরিটা নামাতে গেল। গুড়ুম!
অনির্বাণের বন্দুক থেকে গুলি বেরোল। গুলিটা সোমনাথের হাতে লাগল। ছুরিটা ছিটকে পড়ে গেল। কিন্তু সোমনাথ থামল না। সে পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল শ্রেয়ার ওপর। দ্বিতীয় গুলিটা তার পায়ে লাগল। সোমনাথ হুমড়ি খেয়ে পড়ল যজ্ঞকুণ্ডের ছাইয়ের ওপর।
অধ্যায় ৭: শেষ বিচার
শ্রেয়াকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো। তার অবস্থা সংকটজনক, কিন্তু ডাক্তাররা জানালেন সে বেঁচে যাবে। তবে তার শরীরের ক্ষতের চেয়ে মনের ক্ষত শুকাতে সময় লাগবে অনেক বেশি।
পুলিশ ভ্যানে তোলার সময় সোমনাথ অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে হাসছিল। তার চোখে কোনো অনুশোচনা নেই। সে বিড়বিড় করে বলছিল, “আমি তো শুধু কাপড় পরাতে চেয়েছিলাম… সমাজ উলঙ্গ হয়ে যাচ্ছে… আমি শুধু ঢাকতে চেয়েছিলাম…”
অনির্বাণ ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তিনি জানেন, আদালত একে ফাঁসি দেবে বা আজীবন জেলে রাখবে। কিন্তু এই বিকৃত মানসিকতার মানুষগুলো সমাজের যে কোনো কোণায় লুকিয়ে থাকতে পারে।
পরদিন খবরের কাগজের হেডলাইন হলো— “শর্ট ড্রেস পরলেই মৃত্যু! সিরিয়াল কিলার ‘টেলার’ অবশেষে জালে।”
অনির্বাণ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কফিতে চুমুক দিলেন। বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশ পরিষ্কার। কিন্তু তিনি জানেন, যতদিন মানুষের মনে এই অন্ধকার থাকবে, ততদিন তার কাজ শেষ হবে না। সোমনাথরা বারবার ফিরে আসবে নতুন রূপে। আর অনির্বাণদেরও তৈরি থাকতে হবে।
~ সমাপ্ত ~